বুধবার

১৯ আগস্ট, ২০২৬ ৪ ভাদ্র, ১৪৩৩

গন্ধর্ব্যপুর পানি শোধনাগারে আর্থিক জটিলতা, পরামর্শক নিয়োগ

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ১৯ আগস্ট, ২০২৬ ১০:৪৩

শেয়ার

গন্ধর্ব্যপুর পানি শোধনাগারে আর্থিক জটিলতা, পরামর্শক নিয়োগ
ছবি সংগৃহীত

ঢাকার পানি সরবরাহে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা কমাতে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে বাস্তবায়নাধীন গন্ধর্ব্যপুর পানি শোধনাগার প্রকল্পে আর্থিক ও প্রশাসনিক জটিলতা দেখা দিয়েছে। এক বছর কাজ বন্ধ থাকার পর ফরাসি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সুয়েজ ও ওটিভি ভিওলিয়া সীমিত পরিসরে কাজ শুরু করলেও বকেয়া বিল, ক্ষতিপূরণ দাবি, প্রকল্প ব্যয় বৃদ্ধি ও প্রশাসনিক সমন্বয় নিয়ে তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্ন। এ পরিস্থিতিতে প্রকল্পের বিভিন্ন বিষয় যাচাই ও চূড়ান্ত করতে পরামর্শক নিয়োগ দিয়েছে ঢাকা ওয়াসা।

ঢাকার পুরান ঢাকা, মতিঝিল, পুরান পল্টন, ফকিরাপুল, গুলশান, বনানী, নিকুঞ্জ, খিলক্ষেত, বাড্ডা, মিরপুর ও আশপাশের এলাকায় দীর্ঘদিন ধরেই চাহিদার তুলনায় পানি সরবরাহ কম। নগরবাসীর জন্য ২৪ ঘণ্টা পানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে ভূ-উপরিস্থ উৎস থেকে পানি সরবরাহের উদ্যোগের অংশ হিসেবে প্রকল্পটি নেওয়া হয়।

এনভায়রনমেন্টালি সাসটেইনেবল ওয়াটার সাপ্লাই প্রজেক্টের (ডিইএসডব্লিউএসপি) আওতায় মেঘনা নদী থেকে পানি সংগ্রহ করে শোধনের পর ঢাকায় সরবরাহের ব্যবস্থা করা হয়েছে। প্রকল্পের প্রথম ধাপে প্রতিদিন ৫০ কোটি লিটার পানি সরবরাহের সক্ষমতা তৈরির কথা রয়েছে। প্রকল্প বাস্তবায়নে মূল ব্যয় ধরা হয়েছিল প্রায় ৩ হাজার ৬ কোটি ৪ লাখ টাকা।

প্রকল্প সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, এরই মধ্যে প্রকল্পের প্রায় ৯৭ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। তবে কাজ শেষ পর্যায়ে থাকলেও ব্যয় ও সময় বৃদ্ধি নিয়ে নতুন করে জটিলতা তৈরি হয়েছে।

কাজ বন্ধ, পরে আবার শুরু

নথিপত্র অনুযায়ী, বকেয়া বিল পরিশোধ না হওয়ায় গত বছরের ১৬ জুন থেকে ঠিকাদারি যৌথ প্রতিষ্ঠান সুয়েজ ও ওটিভি ভিওলিয়া প্রকল্পের কাজ পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়। পরে বিপুল পরিমাণ বকেয়া পরিশোধের পর চলতি বছরের ২১ জুন থেকে নিজস্ব জনবল দিয়ে আবার কাজ শুরু করে প্রতিষ্ঠানটি। ২৭ জুন থেকে উপ-ঠিকাদারদের যুক্ত করে কাজ আরও সচল করার উদ্যোগ নেওয়া হয়।

তবে এক বছর কাজ বন্ধ থাকায় প্রকল্পের সময়সীমা ও পরিচালন ব্যয় বেড়েছে বলে দাবি করেছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। স্থগিত সময়ের ক্ষতিপূরণ, অতিরিক্ত সময় এবং পরিচালন ব্যয়ের জন্য শিগগিরই ঢাকা ওয়াসার কাছে পূর্ণাঙ্গ দাবি উপস্থাপনের কথা জানিয়েছে সুয়েজ।

প্রায় ৫০ শতাংশ ব্যয় বৃদ্ধির প্রস্তাব

প্রকল্পের কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে থাকলেও বিভিন্ন কারণ দেখিয়ে ব্যয় ১ হাজার ৫০১ কোটি ৯৬ লাখ টাকা বাড়ানোর একটি প্রস্তাব তৈরি করা হয়েছে বলে প্রকল্প সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। এতে মূল প্রকল্প ব্যয় ৩ হাজার ৬ কোটি ৪ লাখ টাকা থেকে বেড়ে ৪ হাজার ৫০৮ কোটি ১ লাখ টাকায় দাঁড়াবে। অর্থাৎ ব্যয় বাড়বে প্রায় ৪৯ দশমিক ৯৭ শতাংশ।

প্রস্তাবে দর সমন্বয়ের জন্য ৬৬৭ কোটি ১৪ লাখ, কর ও শুল্ক বাবদ ৩৪০ কোটি ৩২ লাখ, ডিজাইন পরিবর্তনে ৮৩ কোটি ৮২ লাখ, পুকুর অতিক্রমে ৭১ কোটি ৮৩ লাখ, নকশা পরিবর্তনে ৬০ কোটি ৬১ লাখ, জমি অধিগ্রহণের জটিলতায় ৫৪ কোটি ৪ লাখ এবং দুটি কালভার্ট নির্মাণে ৪৬ কোটি ৮৯ লাখ টাকা অতিরিক্ত ব্যয়ের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

এ ছাড়া ডলারের মূল্যবৃদ্ধি, অনাকাঙ্ক্ষিত কবরস্থান অপসারণ এবং সাইট হস্তান্তরে বিলম্বকেও ব্যয় বৃদ্ধির কারণ হিসেবে দেখানো হয়েছে। তবে ব্যয় ও মেয়াদ বাড়ানোর প্রস্তাব এখনো অনুমোদন হয়নি। সংশ্লিষ্ট ফাইল মন্ত্রণালয়ে রয়েছে বলে জানা গেছে।

ঠিকাদারকে বিল পরিশোধ নিয়ে বিতর্ক

ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে বিল পরিশোধ ও ক্ষতিপূরণ দেওয়ার বিষয়েও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। ঢাকা ওয়াসার সূত্র অনুযায়ী, চলতি বছরের জুনে তিন দফায় সুয়েজকে প্রায় ১২৬ কোটি টাকা পরিশোধ করা হয়।

নথি অনুযায়ী, ৩ জুন ৩৬ কোটি ৯ লাখ ৮৯ হাজার ৯০৬ টাকা, ১০ জুন প্রায় ৪৯ কোটি ৯৮ লাখ ৫৮ হাজার ৮৮৯ টাকা এবং ১৫ জুন প্রায় ৪০ কোটি ৩৫ লাখ ২৩ হাজার ৯১৯ টাকা পরিশোধ করা হয়।

এর আগেও কোনো চুক্তি বা অনুমোদন ছাড়া সুয়েজকে প্রায় ৬০০ কোটি টাকা বিল পরিশোধের অভিযোগ উঠেছিল। এ নিয়ে প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের মধ্যে প্রশ্ন তৈরি হয়।

তবে অনুমোদন ছাড়া ১২৬ কোটি টাকা পরিশোধের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন প্রকল্প পরিচালক মো. ওয়াহিদুল ইসলাম মুরাদ। তিনি এসব অভিযোগকে মনগড়া ও ভিত্তিহীন বলে দাবি করেছেন।

পরামর্শক নিয়োগ দিয়ে চলছে যাচাই

প্রকল্প পরিচালক মো. ওয়াহিদুল ইসলাম মুরাদ জানান, প্রকল্পের মাঝপথে কোনো কনসালট্যান্ট বা পরামর্শক না থাকায় প্রকল্পের বিভিন্ন বিষয় চূড়ান্ত করা সম্ভব হয়নি। বর্তমানে প্রকল্পে পরামর্শক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান নিজেদের মতো করে বিভিন্ন দাবি করলেও প্রকল্পের ত্রুটি-বিচ্যুতি, কাজের হিসাব ও বিল পরিশোধের বিষয়গুলো পরামর্শক যাচাই করে চূড়ান্ত করবেন।

তিনি জানান, প্রকল্পটি নিয়ে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় ও ঢাকা ওয়াসার বোর্ড সভাতেও আলোচনা হবে।

প্রশাসনিক ও আইনি জটিলতা

প্রকল্পটিতে আর্থিক জটিলতার পাশাপাশি প্রশাসনিক সমন্বয়হীনতা ও আইনি জটিলতার অভিযোগও রয়েছে। ২৩ কিলোমিটার এলাকায় পাইপলাইন স্থাপনের ক্ষেত্রে অননুমোদিত চীনা কোম্পানি থেকে পাইপ কেনার অভিযোগে সুয়েজের বিরুদ্ধে চীনের আদালতে মামলা চলমান থাকলেও এ বিষয়ে ওয়াসার পক্ষ থেকে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।

অন্যদিকে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের সংস্কারকাজ চলাকালে ৯৫০ মিটার পাইপলাইন ও দুটি কালভার্ট নির্মাণের জন্য সড়ক ও জনপথ বিভাগ বারবার তাগিদ দিলেও সময়মতো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। এতে ভবিষ্যতে সদ্য সংস্কার করা সড়ক আবার খনন করতে হতে পারে, যা অতিরিক্ত সময় ও অর্থ অপচয়ের ঝুঁকি তৈরি করছে।

গন্ধর্ব্যপুর প্রকল্প নিয়ে সরকারি কর্মকর্তাদের বক্তব্যেও কিছুটা ভিন্নতা দেখা গেছে। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের এক অতিরিক্ত সচিব বলেন, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ক্ষতিপূরণ দাবি করতেই পারে। তবে তাদের দাবি কতটা যৌক্তিক, তা যাচাই-বাছাই করে দেখা হচ্ছে। অনুমোদন ছাড়া প্রকল্প পরিচালক অর্থ পরিশোধ করতে পারবেন না বলেও জানান তিনি।

স্থানীয় সরকার বিভাগের যুগ্ম সচিব (পানি সরবরাহ অধিশাখা) হোসনা আফরোজ জানান, প্রকল্পটি ২০২৭ সালের জুনে শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। প্রকল্প বাস্তবায়নে মহাসড়ক খননসহ বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়েছে। এসব সমস্যা সমাধানের মাধ্যমে নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ করা সম্ভব হবে বলে আশা করেন তিনি। তবে প্রকল্পের ব্যয় ও মেয়াদ বৃদ্ধির কোনো প্রস্তাব মন্ত্রণালয়ে আসেনি বলেও জানান তিনি।

প্রকল্প পরিচালক মো. ওয়াহিদুল ইসলাম মুরাদ বলেন, ঠিকাদারের অনেক বিল বাকি রয়েছে। বর্তমানে পরামর্শক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে এবং প্রকল্পের বিভিন্ন বিষয় চূড়ান্ত করার কাজ চলছে। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান নানা দাবি করলেও সেগুলো যাচাই করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানোর কোনো সুযোগ নেই বলেও দাবি করেন তিনি।

প্রকল্পের কাজে ভোগান্তিতে নগরবাসী

এদিকে প্রকল্পের বিভিন্ন কাজের কারণে নগরবাসীর দুর্ভোগও বাড়ছে। বিশেষ করে উত্তরা আবাসিক এলাকায় রাতের বেলায় সড়ক খনন ও ভারী যন্ত্রপাতি ব্যবহারের কারণে তীব্র শব্দদূষণের অভিযোগ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

গভীর রাতে হ্যামার, এক্সকাভেটর ও অন্যান্য ভারী যন্ত্রপাতির শব্দে শিশুদের পড়াশোনা, বয়স্কদের বিশ্রাম এবং স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ভাঙাচোরা ও খোঁড়াখুঁড়ি করা সড়কের কারণে কোথাও কোথাও যানজটও সৃষ্টি হচ্ছে।

স্থানীয় বাসিন্দারা নির্দিষ্ট সময়ের বাইরে, বিশেষ করে গভীর রাতে, ভারী যন্ত্রপাতি ব্যবহার বন্ধ এবং সড়ক খননের কাজে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন।

প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে ঢাকার পানি সরবরাহ ব্যবস্থায় ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে বলে আশা করা হচ্ছে। তবে আর্থিক ও প্রশাসনিক জটিলতা কাটিয়ে নির্ধারিত সময়ে প্রকল্পটি শেষ করা এবং ব্যয় বৃদ্ধির যৌক্তিকতা নিশ্চিত করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।



banner close
banner close