মাঠের সবুজ ফসলকে আগাছার হাত থেকে রক্ষা করার জন্য যে রাসায়নিক একসময় কৃষকের সহায়ক হিসেবে ব্যবহৃত হতো, সময়ের ব্যবধানে সেই রাসায়নিকই যেন পরিণত হয়েছে এক ভয়ংকর মৃত্যুদূতে। কৃষিক্ষেত্রে ব্যবহৃত আগাছানাশক ‘প্যারাকোয়াট’ এখন শুধু জমির আগাছাই নির্মূল করছে না, গ্রাস করছে মানুষের জীবনও।
পরিসংখ্যান বলছে, দেশে বর্তমানে আত্মহত্যার অন্যতম প্রধান হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে জীবনবিধ্বংসী এই রাসায়নিক প্যারাকোয়াট, যা গবেষকদের ভাষায় বাংলাদেশের জন্য একটি বিষবৈজ্ঞানিক সংকট হিসেবে উঠে এসেছে।
ঝিনাইদহে বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত
তথ্য বলছে, ঝিনাইদহ সদর হাসপাতালে গত জুলাই মাসে বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে ১১৭ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। তাঁদের বেশির ভাগই আগাছানাশক বিষক্রিয়ার কারণ হিসেবে প্যারাকোয়াট পান করেছিলেন বলে জানা যায়। চিকিৎসকদের মতে, আত্মহত্যার প্রচেষ্টায় এই রাসায়নিক ব্যবহারের প্রবণতা আশঙ্কাজনকভাবে দিন দিন বেড়েই চলেছে।
গবেষণায় উঠে আসা ভয়াবহ তথ্য
সম্প্রতি প্রকাশিত একটি গবেষণায় উঠে এসেছে আরও ভয়াবহ কিছু তথ্য। ২০১৩ সালে দেশে প্যারাকোয়াট পানে বিষক্রিয়াজনিত মৃত্যুর ঘটনা ছিল মাত্র একটি। অথচ, ২০২৪ সালে এসে সেই সংখ্যাই বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২১২টিতে।
গবেষণার তথ্য বলছে, দেশে গত ১২ বছরে ১ হাজার ৪২০টি প্যারাকোয়াট বিষক্রিয়ার ঘটনা শনাক্ত করেছে গবেষকেরা। আমেরিকান সোসাইটি অব ট্রপিক্যাল মেডিসিন অ্যান্ড হাইজিন সাময়িকীতে, গত মে মাসে ‘ক্লিনিক্যাল অ্যান্ড ল্যাবরেটরি প্রোফাইল অব প্যারাকোয়াট পয়জনিং: এ টক্সিকোলজিক্যাল ক্রাইসিস ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক ওই গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়।
আমদানি বৃদ্ধি ও নির্ভরশীলতা
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্য বলছে, ২০১৩ সালে দেশে যেখানে ৫৩ টনের মতো প্যারাকোয়াট আমদানি হয়েছিল, সেখানে ২০২৩ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার ৬৯৫ টনে। অন্যদিকে আগাছা নির্মূলে কৃষিকাজের সহায়তায় এই রাসায়নিকের ওপর কৃষকরা অতিমাত্রায় নির্ভরশীল হয়ে পড়ায় প্যারাকোয়াটের আমদানি বেড়েছে বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের।
আক্রান্তদের পরিসংখ্যান
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, প্যারাকোয়াট পানে বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের ৭৮ দশমিক ২ শতাংশই হচ্ছে তরুণ, যাঁদের বয়স ১২ থেকে ৩০ বছরের মধ্যে। আর এদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হচ্ছে শিক্ষার্থীরা, যার হার ৩৮ দশমিক ১ শতাংশ। এছাড়াও, আক্রান্তদের মধ্যে ২৪ দশমিক ৫ শতাংশ গৃহিণীও রয়েছে।
বিষক্রিয়ার উপসর্গ
গবেষণায় দেখা গেছে, মাত্র ১০ থেকে ২০ মিলিলিটার প্যারাকোয়াট পানের ফলে ফুসফুস ধীরে ধীরে অকেজো হয়ে যায় এবং কয়েক সপ্তাহ ধরে ধুঁকে ধুঁকে রোগী মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। প্যারাকোয়াটে আক্রান্ত রোগীদের প্রধান উপসর্গগুলোর মধ্যে রয়েছে তীব্র কিডনি বৈকল্য, যার কারণে পা ফুলে যায়, ঘন ঘন বমি হয় এবং তীব্র পেটব্যথা দেখা দেয়। এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের কাছ থেকেও তার সত্যতা পাওয়া গেছে।
অধ্যাপক ড. মো. আবদুল্লাহিল বাকী, চেয়ারম্যান, এগ্রোনোমি বিভাগ, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়। এ ছাড়া, প্যারাকোয়াট ব্যবহারের সময় কৃষকদের সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।
আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট ও পরামর্শ
অন্যদিকে বিশ্লেষণ বলছে, বিশ্বের ৭৭টি দেশে বিষাক্ত এই রাসায়নিক নিষিদ্ধ করা হয়েছে। যে রাসায়নিকের বিষক্রিয়ায় প্রতি বছর শত শত মানুষ মারা যাচ্ছে, বিশ্বের ৭৭টি দেশ যেখানে সেটিকে অবৈধ ঘোষণা করেছে, সেখানে বাংলাদেশে কীভাবে এটি এখনো বৈধতা পেয়ে আসছে? তা এখন দেশের সচেতন মহলের প্রশ্ন।
সময়ের দাবি এখন একটাই—এই মৃত্যুর মিছিল থামাতে প্রয়োজন কার্যকর উদ্যোগ, কঠোর নীতিমালা এবং সচেতনতার বিস্তার। অন্যথায় সবুজ ফসলের আড়ালে লুকিয়ে থাকা এই নীরব ঘাতক আরও কত প্রাণ কেড়ে নেবে, সেই প্রশ্নের উত্তর হয়তো ভবিষ্যতের কাছেই রয়ে যাবে।
আরও পড়ুন:








