কৃষিতে আগাছানাশক হিসেবে ব্যবহৃত অত্যন্ত বিষাক্ত রাসায়নিক প্যারাকোয়াট জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে উঠেছে বলে গবেষণায় উঠে এসেছে। ২০১৩ সালে দেশে প্যারাকোয়াট পানে বিষক্রিয়ায় একটি মৃত্যুর ঘটনা পাওয়া গেলেও ২০২৪ সালে একই রাসায়নিক পানে মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২১২-তে। বর্তমানে বিশ্বের ৭৭টি দেশে রাসায়নিকটি নিষিদ্ধ।
২০১৩ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত দেশের ১০টি হাসপাতালের তথ্য বিশ্লেষণ করে করা এক গবেষণায় ১ হাজার ৪২০টি প্যারাকোয়াট বিষক্রিয়ার ঘটনা শনাক্ত হয়েছে। শুধু ২০২৪ সালেই বিষক্রিয়ার ৪৯৩টি ঘটনায় ৪৩ দশমিক ২ শতাংশ রোগীর মৃত্যু হয়েছে।
‘ক্লিনিক্যাল অ্যান্ড ল্যাবরেটরি প্রোফাইল অব প্যারাকোয়াট পয়জনিং: এ টক্সিকোলজিক্যাল ক্রাইসিস ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক গবেষণাটি গত মে মাসে আমেরিকান সোসাইটি অব ট্রপিক্যাল মেডিসিন অ্যান্ড হাইজিন সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়। এতে ঢাকা মেডিকেল কলেজসহ দেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব এডিনবরার গবেষকেরাও অংশ নেন। গবেষকদের দাবি, বাংলাদেশে প্যারাকোয়াট বিষক্রিয়া নিয়ে এটিই সবচেয়ে বড় গবেষণা।
গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, আক্রান্তদের ৭৮ দশমিক ২ শতাংশের বয়স ১২ থেকে ৩০ বছরের মধ্যে। তাদের মধ্যে শিক্ষার্থী ৩৮ দশমিক ১ শতাংশ, গৃহিণী ২৪ দশমিক ৫ শতাংশ এবং কৃষক ১৪ শতাংশ।
ঝিনাইদহ সদর হাসপাতালে গত জুলাইয়ে বিষক্রিয়া নিয়ে ১১৭ জন ভর্তি হন। হাসপাতাল সূত্র জানায়, তাদের বেশির ভাগই আগাছানাশক পান করেছিলেন। জেলায় আত্মহত্যার প্রবণতা আগে থেকেই বেশি থাকলেও সাম্প্রতিক সময়ে আগাছানাশক পান করে আত্মহত্যার চেষ্টার ঘটনা বেড়েছে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্য বলছে, ২০১৩ সালে বাংলাদেশে ৫৩ টনের বেশি প্যারাকোয়াট আমদানি হয়েছিল। ২০২৩ সালে আমদানির পরিমাণ বেড়ে দাঁড়ায় ৪ হাজার ৬৯৫ টনে।
কৃষি–সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, গ্রামাঞ্চলে শ্রমিক সংকট ও মজুরি বৃদ্ধির কারণে কৃষকেরা হাতে আগাছা পরিষ্কারের পরিবর্তে আগাছানাশকের ওপর বেশি নির্ভর করছেন।
গবেষণায় বলা হয়েছে, মাত্র ১০ থেকে ২০ মিলিলিটার প্যারাকোয়াট পান করলেও ফুসফুস ধীরে ধীরে অকেজো হয়ে যেতে পারে। এ ছাড়া তীব্র কিডনি বৈকল্য, বমি ও পেটব্যথাসহ নানা জটিলতা দেখা দিতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে কয়েক সপ্তাহ ধরে যন্ত্রণার পর রোগীর মৃত্যু হয়।
গবেষণার প্রধান লেখক বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসক ডা. ফজলে রাব্বি চৌধুরী বলেন, প্যারাকোয়াট বিষক্রিয়ার নির্দিষ্ট কোনো প্রতিষেধক নেই। পাকস্থলী পরিষ্কার, স্টেরয়েড, সাইক্লোফসফামাইড, অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট, হেমোডায়ালাইসিস বা হেমোপারফিউশনের মতো চিকিৎসা দেওয়া হলেও কোনোটির কার্যকারিতা নিশ্চিতভাবে প্রমাণিত হয়নি।
তিনি বলেন, প্যারাকোয়াটের সঙ্গে পারকিনসন্স রোগ ও বিভিন্ন ধরনের ক্যানসারের যোগসূত্রও পাওয়া যাচ্ছে। কৃষিনির্ভর বাংলাদেশের বড় জনগোষ্ঠীকে এটি ঝুঁকিতে ফেলছে।
টক্সিকোলজি সোসাইটি অব বাংলাদেশের সভাপতি অধ্যাপক মো. আবুল ফয়েজ বলেন, গবেষণায় প্যারাকোয়াটের মারাত্মক ক্ষতি প্রমাণিত হয়েছে। জনস্বাস্থ্যের কথা বিবেচনায় এটি নিষিদ্ধ করা জরুরি।
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক গোপাল দাশের নেতৃত্বে ২০২৫ সালের এক গবেষণায় দেশে নিবন্ধিত ৩৪৩টি সক্রিয় কীটনাশক উপাদান বিশ্লেষণ করে ২৫টি উচ্চঝুঁকির কীটনাশক শনাক্ত করা হয়। এর মধ্যে পাঁচটি আগাছানাশক। অধ্যাপক গোপাল দাশের মতে, এসব উপাদানের মধ্যে প্রথমেই প্যারাকোয়াট নিষিদ্ধ করা উচিত।
কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ জানিয়েছেন, প্যারাকোয়াটসহ ক্ষতিকর রাসায়নিকের ক্ষতির মাত্রা নিরূপণে পেশাজীবী ও গবেষকদের নিয়ে একটি কমিটি করা হয়েছে। এক থেকে দেড় মাসের মধ্যে প্রতিবেদন পাওয়ার পর নিষিদ্ধের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
গবেষণায় দক্ষিণ কোরিয়ার উদাহরণও তুলে ধরা হয়েছে। দেশটিতে ২০০৬ সালে প্যারাকোয়াট নিষিদ্ধের পর ২০১০ সালে কীটনাশক পান করে আত্মহত্যাজনিত মৃত্যুর হার প্রতি লাখে ৫ দশমিক ২৬ থেকে কমে ২ দশমিক ৬৭-তে নেমে আসে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্যারাকোয়াটের বিকল্পও রয়েছে। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রমিজ উদ্দিনের মতে, যান্ত্রিক আগাছা দমন, ইন্টিগ্রেটেড উইড ম্যানেজমেন্ট এবং তুলনামূলক কম বিষাক্ত কিছু আগাছানাশক ব্যবহার করা সম্ভব। ফলে জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি বিবেচনায় প্যারাকোয়াটের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ বা নিষিদ্ধ করার বিষয়টি দ্রুত বিবেচনা করা প্রয়োজন।
আরও পড়ুন:








