গণমাধ্যমকে বলা হয় সমাজের দর্পণ। একটি জাতির চিন্তা, চেতনা, মূল্যবোধ ও নৈতিক অবস্থানের প্রতিফলন ঘটে গণমাধ্যমের সঠিক লেখনি, দায়িত্বশীল উপস্থাপনা এবং সত্যনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশনের মধ্য দিয়ে।
কিন্তু সেই গণমাধ্যমই যখন সংবাদ পরিবেশনের নামে জাতির চিন্তা-চেতনা, মূল্যবোধ এবং ধর্মীয় নৈতিকতার বিপরীতে গিয়ে সমকামিতার মতো ধর্মীয় ও সামাজিকভাবে স্পর্শকাতর বিষয়গুলোকে স্বাভাবিক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার অপপ্রয়াস চালায়, তখন সেই গণমাধ্যমের সত্যনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশন নিয়ে প্রশ্ন ওঠাই স্বাভাবিক।
প্রতিবেদন ঘিরে তুমুল বিতর্ক
সম্প্রতি দেশের একটি জাতীয় গণমাধ্যমের প্রকাশিত এক প্রতিবেদনকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে সৃষ্টি হয়েছে তুমুল বিতর্কের ঢেউ। সমালোচকদের অভিযোগ, দেশের জাতীয় অনলাইন গণমাধ্যম বিডিনিউজ২৪.কম তাদের প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনের মাধ্যমে সমকামিতার বিষয়গুলোকে স্বাভাবিক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার অপপ্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছে।
রবিবার (১৬ আগস্ট) বিডিনিউজ২৪-এর অফিসিয়াল ফেসবুক পেজে ‘ব্যক্তিগত যৌন অভিমুখিতা ও সামাজিক উগ্রতা: আমাদের মোরাল পুলিশিং থামবে কবে?’ শিরোনামে একটি ফটোকার্ড প্রকাশ করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, সেই ফটোকার্ডের আড়ালে থাকা বিডিনিউজের অনলাইন প্রতিবেদনে উঠে আসে সমকামিতাকে স্বাভাবিক হিসেবে উপস্থাপনের এক বিতর্কিত অপচেষ্টা।
সমকামিতাকে স্বাভাবিক হিসেবে উপস্থাপনের অভিযোগ
বিডিনিউজের ওই প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, সমকামিতা কোনো রোগ বা বিকৃতি নয়; বরং এটি মানুষের জন্য অত্যন্ত স্বাভাবিক একটি প্রাকৃতিক ভিন্নতা। একই সঙ্গে সেখানে বলা হয়, সমলিঙ্গের প্রতি মানুষের আকর্ষণ সম্পূর্ণ স্বাভাবিক।
প্রতিবেদনে সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন হলে ‘সমকামিতার’ অভিযোগে কিছু শিক্ষার্থীর হলের আসন বাতিলের বিষয়টি তুলে ধরে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ও তাওহিদী জনতার তীব্র সমালোচনা করা হয়।
একইসঙ্গে কিছুদিন আগে শাহবাগ এলাকায় সমকামীদের আনাগোনা বেড়ে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে সচেতন সাংবাদিকদের গড়ে তোলা প্রতিরোধমূলক অবস্থানকেও সমালোচনার মুখে ফেলা হয়। এমনকি তাঁদের ‘নামধারী মোজো সাংবাদিক’ বলেও আখ্যায়িত করা হয়।
শুধু তাই নয়, ২০২৪ সালে সপ্তম শ্রেণির সরকারি পাঠ্যপুস্তকে ‘শরীফ থেকে শরীফা’ গল্পকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট বিতর্ককেও প্রতিবেদনে ‘অন্ধ বিদ্বেষ’ হিসেবে আখ্যা দেয়া হয়। এ নিয়ে দেশের সচেতন জনগণের মানসিকতা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয় বিডিনিউজের প্রতিবেদনে।
জেন্ডার পরিচয় ও আইনি ব্যাখ্যা
এ ছাড়া সমকামিতাকে জেন্ডার পরিচয়ের আলোকে স্বাভাবিক হিসেবে ব্যাখ্যা করতে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, কোনো মানুষ নারী নাকি পুরুষ—তার সঙ্গে শারীরিক গঠনের সরাসরি কোনো সম্পর্ক নেই; বরং এটি একটি মনস্তাত্ত্বিক বিষয়। কেউ যদি নিজেকে পুরুষ মনে করেন, তাহলে তিনি পুরুষ; আর নিজেকে নারী মনে করলে তিনি নারী। তাঁর মনস্তাত্ত্বিক লিঙ্গ জন্মগত লিঙ্গের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হোক কিংবা তার বিপরীত হোক, সেটিই তাঁর পরিচয়।
প্রতিবেদনে সমকামিতার এই বিষয়টিকে বাস্তবতার বিপরীতে গিয়ে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বাস্তবতার অংশ হিসেবেও উল্লেখ করা হয় বলেও, উঠে আসে। এছাড়া, বাংলাদেশের আইনে সমকামিতাকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়নি, প্রতিবেদনে এমন তথ্য তুলে ধরে বিডিনিউজ২৪।
সেখানে, ১৮৬০ সালের একটি দণ্ডবিধির ৩৭৭ ধারা উল্লেখ করে বলা হয়, যে ব্যক্তি স্বেচ্ছায় কোনো পুরুষ, নারী কিংবা পশুর সঙ্গে প্রকৃতির নিয়মের বাইরে গিয়ে শারীরিক সম্পর্কে লিপ্ত হবে, তাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড অথবা সর্বোচ্চ ১০ বছরের সশ্রম বা বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেয়া যেতে পারে এবং একই সঙ্গে অর্থদণ্ডেও দণ্ডিত করা যেতে পারে।
প্রতিবেদনের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই ধারায় কোথাও ‘সমকামী’ শব্দটির উল্লেখ নেই। বরং নারী, পুরুষ কিংবা পশুর সঙ্গে প্রকৃতির নিয়মের বাইরে গিয়ে শারীরিক সম্পর্কে লিপ্ত হওয়ার বিষয়টিই সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে।
সচেতন মহলের প্রশ্ন ও উদ্বেগ
কিন্তু, সচেতন বিশ্লেষকদের প্রশ্ন এখানেই এসে থমকে যায়। বাস্তবেই যদি আইনের ১৮৬০ সালের দণ্ডবিধির ৩৭৭ ধারায় সমকামিতার উল্লেখ না থাকে, তাহলে নারী বা পুরুষের সঙ্গে প্রকৃতির নিয়মের বাইরে গিয়ে শারীরিক সম্পর্কে লিপ্ত হওয়ার বিষয়টি কী অর্থ বহন করে?
এ ছাড়া, প্রতিবেদনে সমকামিতাকে সমর্থন করার জন্য বিভিন্ন অসম্পূর্ণ দলিল ও বিতর্কিত ঘটনার উল্লেখ করা হয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। অন্যদিকে, ইসলামপন্থী ও সামাজিকভাবে সচেতন মহলের সমকামিতা নিয়ে তাদের চিন্তা-চেতনা ও ধর্মীয় মূল্যবোধকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য এবং হেয় করার প্রবণতাও সেখানে লক্ষ করা গেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
যেখানে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সমকামিতার বিস্তার নিয়ে উদ্বিগ্ন দেশের সচেতন মহল ও ইসলামিক স্কলাররা, সেখানে দেশের একটি জাতীয় গণমাধ্যমের এমন উপস্থাপনাকে কতটা সত্যনিষ্ঠ সাংবাদিকতার পরিচয় বলা যায়, সেই প্রশ্ন এখন সামাজিক পরিসরে ক্রমেই জোরালো হয়ে উঠছে।
তথ্য বলছে, সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে সমকামিতার বিস্তৃতি নিয়ে নানা ধরনের আলোচনা ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু করে সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষার্থীও এ ধরনের কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে বলে বিভিন্ন সময়ে আলোচনায় উঠে এসেছে।
সমকামী প্রেমিকের হাতে হত্যাকাণ্ড, যৌন সম্পর্ককে কেন্দ্র করে সংঘাত কিংবা আরেক প্রেমিকের পুরুষাঙ্গ কেটে ফেলার মতো ঘটনাও বিভিন্ন সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।
অন্যদিকে, কিছুদিন আগে ঢাকেশ্বরী মন্দিরে এক ট্রান্সজেন্ডারের বিয়াকে কেন্দ্র করে নতুন বিতর্কের সৃষ্টি হয়। অভিযোগ ওঠে, এই ঘটনার মাধ্যমে মন্দিরের পুরোহিতরা সমকামিতার জন্য একটি উন্মুক্ত পথ তৈরি করে দিয়েছে।
পরবর্তীতে এই ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়ে দেশের শীর্ষস্থানীয় আলেম, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, ব্যবসায়ী এবং বিভিন্ন পেশাজীবীসহ ১২৩০ জন নাগরিক বিবৃতিতে স্বাক্ষর করে।
এভাবেই প্রতিনিয়ত দেশে সমকামিতার ব্যাপক বিস্তার নিয়ে বিভিন্ন সময় দেশের নানা অঙ্গনের সচেতন মহল উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছে। তার ওপর বিডিনিউজ২৪.কমের প্রকাশিত এই প্রতিবেদনকে অনেকেই সমকামিতার ওপেন সার্টিফিকেট দেয়ার একটি অপচেষ্টা হিসেবে দেখছে। বিশ্লেষকদের মতে, এটি কেবল সমকামিতাকে স্বাভাবিক করার প্রচেষ্টাই নয়; বরং এ নিয়ে সামাজিক অস্থিরতা তৈরিরও একটি অপপ্রয়াস।
তাঁদের দাবি, সংবাদের নামে কোনো নির্দিষ্ট মতাদর্শ বা জীবনাচারকে প্রতিষ্ঠা করার প্রচেষ্টা কখনোই নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার উদাহরণ হতে পারে না। কারণ, গণমাধ্যমের দায়িত্ব সমাজে অস্থিরতার জন্ম দেয়া নয়; বরং তথ্যের নির্ভুল উপস্থাপনার মাধ্যমে সচেতনতা বৃদ্ধি করা।
সময়ের দাবি, দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা ও মতাদর্শিক অবস্থানের মধ্যকার সীমারেখাকে স্পষ্ট করা। কারণ, সংবাদ যদি তথ্যের পরিবর্তে অবস্থানের বাহক হয়ে ওঠে, তাহলে সমাজের দর্পণ হিসেবে গণমাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতাই সবচেয়ে বড় প্রশ্নের মুখে পড়বে।
আরও পড়ুন:








