১৫ আগস্টকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে হঠাৎ করেই তীব্র বিতর্কের জন্ম দিয়েছেন সাবেক উপদেষ্টা আসিফ নজরুল। শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা জানিয়ে দেয়া তার দেয়া, একটি দীর্ঘ ফেসবুক পোস্ট ঘিরেই শুরু হয়েছে এই সমালোচনা। পোস্টে আসিফ নজরুল দাবি করেন, শেখ মুজিব না থাকলে ১৯৭১ সালে দেশ স্বাধীন হতো না। আবার, পোস্টের একাংশে তিনি শেখ হাসিনার ফ্যাসিবাদের সমালোচনা করেছেন। তবে জুলাই অভ্যুত্থানের পর তার এই প্রকাশ্য ‘মুজিব বন্দনা’ স্বাভাবিকভাবে নেয়নি নেটিজেনরা।
পিনাকী ভট্টাচার্যের প্রতিক্রিয়া
আসিফ নজরুলের এমন মন্তব্যের পর কড়া প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন অ্যাক্টিভিস্ট ও লেখক পিনাকী ভট্টাচার্য। তিনি সরাসরি আসিফ নজরুলকে গ্রেপ্তারের দাবি তুলেছেন। পিনাকীর মতে, আওয়ামী লীগের রাজনীতি নিষিদ্ধ হওয়ার অর্থ হলো তাদের সব রাজনৈতিক ‘রিচুয়াল’ বা প্রথাও নিষিদ্ধ হওয়া। ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে শ্রদ্ধা জানানোকে সেই প্রথারই অংশ আখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, একজন মুজিব প্রেমী হয়ে হাসিনা-পরবর্তী সরকারে আসিফ নজরুলের যোগ দেয়াই উচিত হয়নি। রাষ্ট্র এই ফ্যাসিবাদের চিহ্ন মুছে ফেলতে ব্যর্থ হলে, জনতা সেই দায়িত্ব তুলে নেবে বলেও হুঁশিয়ারি দেন পিনাকী।
সাংবাদিক মীনা রশিদের অভিযোগ
একই সুরে ক্ষোভ ঝেড়েছেন সাংবাদিক মীনা রশিদ। তার স্পষ্ট অভিযোগ, শেখ মুজিবের প্রতি এই তথাকথিত ভালোবাসা দেখিয়ে আসিফ নজরুল মূলত শেখ হাসিনা এবং আওয়ামী লীগকেই আবার রাজনীতিতে পুনর্বাসনের ষড়যন্ত্র করছেন। মীনা রশিদের মতে, শেখ মুজিবের রাজনৈতিক ওস্তাদ মাওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে দেশ স্বাধীন হলে, বাংলাদেশকে ভারতের একটি 'ভ্যাসাল স্টেট' বা পদানত রাষ্ট্রে পরিণত হতে হতো না। এই পতিত স্বৈরাচারকে ফেরানোর চেষ্টায় আসিফ নজরুলকে পতুল হিসেবেও আখ্যা দেন তিনি।
দুর্নীতির অভিযোগ
আদর্শিক এই বিতর্কের বাইরেও, ক্ষমতায় থাকাকালে আসিফ নজরুলের বিরুদ্ধে রয়েছে পাহাড়সম দুর্নীতির অভিযোগ। ২৪-এর গণঅভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে আইন উপদেষ্টাসহ একাধিক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পাওয়ার পর, তার আশা অনুযায়ী দেশের সেবা করার সুযোগও পেয়ে যান অধ্যাপক আসিফ। তবে, এই সময়ে, আগের ব্যক্তি ইমেজ ধরে রাখতে পারেননি তিনি। দায়িত্ব পালনকালে, নানা কারণে বিতর্কিত হয়ে ছাত্র জনতার রোষানলে পড়েছেন আসিফ নজরুল।
অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর, আসিফ নজরুলের বিরুদ্ধে উঠেছে দুর্নীতির ভয়াবহ অভিযোগ।
সম্প্রতি, একটি জাতীয় দৈনিকের এক অনুসন্ধানে দাবি করা হয়, আসিফ নজরুলের আত্মীয়স্বজনের সম্পদের পরিমাণ বেড়েছে কয়েকগুণ। এমনকি, তার সাবেক স্ত্রী রোকেয়া প্রাচীর দুই কন্যাও এখন বিপুল সম্পদের মালিক। ওই সন্তানের মধ্যে একজনের নামে, ঢাকার নিউ ইস্কাটনে একটি বাড়ি কেনা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, আসিফ নজরুলের দেড় বছরের রাজত্বে সবচেয়ে আলোচিত দুর্নীতির একটি ছিলো সাব-রেজিস্ট্রার বদলি। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলের ১৮ মাসে আইন মন্ত্রণালয়ে শুধু সাব-রেজিস্ট্রার বদলিতেই ঘুষ লেনদেন হয়েছে শতকোটি টাকা। বদলির থেকে জনপ্রতি ৫০ থেকে ৬০ লাখ টাকা নেয়ার অভিযোগ উঠেছে। অতীতে, কখনো মাত্র আট মাসে এত বিপুলসংখ্যক বদলির ঘটনা ঘটেনি সাব-রেজিস্ট্রার পদে।
বদলির বিধান অনুযায়ী, ‘এ’ গ্রেডের সাব-রেজিস্ট্রারকে ‘এ’ গ্রেডের অফিসে এবং ‘সি’ গ্রেডের কর্মকর্তাকে ‘সি’ গ্রেডের অফিসে বদলি করতে হয়। অভিযোগ রয়েছে, আসিফ নজরুল এসব নিয়মের কোনো তোয়াক্কা না করেই বদলি বাণিজ্য করেছেন।
আইন মন্ত্রণালয় থেকে পাওয়া তথ্য অনুসারে, আসিফ নজরুল ২০২৪ সালের আগস্টে আইন উপদেষ্টার দায়িত্ব নেয়ার পর, জেলা রেজিস্ট্রার ও সাব-রেজিস্ট্রার বদলি সংক্রান্ত অন্তত ১৬টি আদেশ জারি হয়েছে। এর মধ্যে, ২০২৪ সালের ৪ সেপ্টেম্বর থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত পাঁচটি আদেশে ৮৭ জনকে বদলি করা হয়। ১১টি আদেশে ১৯৫ জনকে বদলি করা হয়, ২০২৫ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ২৭ এপ্রিল পর্যন্ত।
প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, ২০২৫ সালে সবচেয়ে বেশিসংখ্যক সাব-রেজিস্ট্রার বদলি করা হয়। এর মধ্যে অন্তত ২০০ জনের কাছ থেকে জনপ্রতি ৫০ থেকে ৬০ লাখ টাকার বিনিময়ে তাদের পছন্দের সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে বদলি করা হয়েছে বলে, সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
একইভাবে, বিচারক বদলি নিয়েও অধ্যাপক আসিফের বিরুদ্ধে তথ্য উঠে আসে, ওই অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে। ২০২৫ সালের ২ জুন, সারা দেশের বিভিন্ন আদালতের ২৫২ জন বিচারককে একযোগে বদলি করা হয়। আইন মন্ত্রণালয়ের আইন ও বিচার বিভাগ থেকে এ বিষয়ে পৃথক পাঁচটি প্রজ্ঞাপন জারি করা হলে সারা দেশে হইচই পড়ে যায় সেসময়। অভিযোগ উঠেছে, এই বদলি বাণিজ্য করে আসিফ নজরুল হাতিয়ে নেন কয়েকশো কোটি টাকা।
সেইসাথে, জামিন বাণিজ্য নিয়েও, কয়েকশো কোটি টাকা আত্মসাতের তথ্য রয়েছে সাবেক এই উপদেষ্টার বিরুদ্ধে। জানা গেছে, সেসময় আলোচিত জামিনের মধ্যে ছিল, শেয়ার জালিয়াতি ও ভাই হত্যার মামলায় ট্রান্সকম গ্রুপের সিইও সিমিন রহমানের জামিন। একদিনে তিনটি মামলায় তাকে জামিন দেয়া হয়। বাংলাদেশের বিচার বিভাগের ইতিহাসে এটি একটি নজিরবিহীন ঘটনা। এমনকি, যে আদালত তাকে জামিন দিয়েছে, তার জামিন দেয়ার এখতিয়ারও সেই আদালতের ছিল না বলে জানা গেছে।
অন্যদিকে, গান বাংলার তাপসের জামিন ও বিদেশে যাওয়ার অনুমতি দেয়া হয়েছিল টাকার বিনিময়ে, এই দাবিও করা হয় প্রতিবেদনে। আরো জানা যায়, অন্তত দুই ডজন ব্যক্তিকে আসিফ নজরুল অর্থের বিনিময়ে জামিন দেয়ার ব্যবস্থা করেন। এদের মধ্যে রয়েছেন ব্যবসায়ী, সাবেক আমলা এবং আওয়ামী লীগ নেতা।
আইন মন্ত্রণালয়ের পাশাপাশি, আসিফ নজরুল প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টাও ছিলেন। সেখানেও তার বিরুদ্ধে রয়েছে দুর্নীতির অভিযোগ। আসিফ নজরুল ওই মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নিয়ে নতুন করে রিক্রুটিং এজেন্সির লাইসেন্স দেয়া শুরু করেন। এর মাধ্যমে তিনি শত কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন বলে, অভিযোগ রয়েছে।
আসিফ নজরুলের ‘মুজিব বন্দনা’ ও জুলাইয়ের চেতনা নিয়ে বিতর্কের মধ্যেই সামনে এসেছে তার মন্ত্রণালয়ের আমলের পাহাড়সম দুর্নীতির চিত্র। বদলি বাণিজ্য, জামিন বাণিজ্য আর আত্মীয়স্বজনের ফুলেফেঁপে ওঠা সম্পদের পাহাড়, সবমিলিয়ে জনসেবার আড়ালে তার প্রকৃত রূপ আজ জনগণের কাঠগড়ায়।
আরও পড়ুন:








