গ্যাসের চাপ কম কিংবা সাময়িক লোডশেডিং, দেশের বর্তমান জ্বালানি পরিস্থিতি এখন আর কেবল এই শব্দগুলোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। বরং এটি সরাসরি শিল্প, কর্মসংস্থান, রপ্তানি ও সামগ্রিক অর্থনীতির জন্য এক অস্তিত্বের সংকট।
সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ‘ফাহিম ভাই’ নামের একটি আইডি থেকে দেয়া এক দীর্ঘ, তথ্যবহুল ও বিশ্লেষণধর্মী পোস্টে দেশের এই বাস্তবতার চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। ওই পোস্টে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে সতর্ক করে বলা হয়েছে, ‘শিল্প বন্ধ রেখে বিদ্যুৎ বাঁচানো যায়, কিন্তু অর্থনীতি বাঁচানো যায় না।‘
গ্যাস সরবরাহের ঘাটতি ও অবকাঠামোর দুর্বলতা
ফাহিম ভাইয়ের ওই পোস্টে উঠে এসেছে সংকটের পরিসংখ্যান ও জ্বালানি অবকাঠামোর দুর্বলতার চিত্র। দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদার বিপরীতে এলএনজি সরবরাহ ৩০০-এর নিচে নেমে যাওয়ায় মোট সরবরাহ দাঁড়িয়েছে মাত্র ১,৯৩০ এমএমসিএফডিতে, যা চাহিদার প্রায় অর্ধেক। এর প্রভাবে গ্রামে ৮ থেকে ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং হচ্ছে। মঙ্গলবার (২১ জুলাই) মহেশখালীতে এক্সিলারেট এনার্জির এফএসআরইউ টার্মিনালে আগুন ও ত্রুটির পর বৃহস্পতিবার (৬ আগস্ট) আংশিক চালু হলেও, পুনরায় তা বন্ধ হয়ে যায়। অন্যদিকে বৈরী আবহাওয়ায় সামিটের টার্মিনালটিও বন্ধ থাকায় দেশের আপৎকালীন পরিকল্পনার চরম দুর্বলতা ফুটে উঠেছে।
শিল্পকারখানায় উৎপাদন ব্যাহত
পোস্টে উল্লেখ করা হয়, টেক্সটাইল, স্পিনিং, সিরামিকস কিংবা স্টিল কারখানায় গ্যাস-বিদ্যুৎ হঠাৎ বন্ধ হলে চুল্লির তাপমাত্রা কমে পুরো ব্যাচ এবং কাঁচামাল নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। নরসিংদী-মাধবদীর প্রায় ৮০ শতাংশ টেক্সটাইল ও ডাইং মিলের উৎপাদন বন্ধ থাকায় দৈনিক ক্ষতি হচ্ছে ৪০০ থেকে ৫০০ কোটি টাকা। প্লাস্টিক খাতের প্রায় ৩০০ কারখানা কাঁচামাল ও মূলধন সংকটে স্থগিত। বিএসআরএম-এর ১০টি এবং মেঘনা গ্রুপের ৫৭টি কারখানা জ্বালানির অভাবে বন্ধ। অন্যদিকে উৎপাদন সচল রাখতে গিয়ে এপেক্স ফুটওয়্যারের ডিজেল ব্যবহার ৩৯০ শতাংশ এবং স্নোটেক্সের জ্বালানি ব্যয় ১৫০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে।
সামষ্টিক অর্থনীতিতে প্রভাব
এর প্রভাব সামষ্টিক অর্থনীতিতে কতটা ভয়াবহ, তারও বিশদ ব্যাখ্যা দেয়া হয়েছে ফাহিম ভাইয়ের পোস্টে। যেখানে দেশের সামগ্রিক জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক এক চার শতাংশ, সেখানে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে শিল্পখাতের প্রবৃদ্ধি নেমেছে এক দশকের সর্বনিম্ন মাত্র ২ দশমিক আট ছয় শতাংশে। মে মাসের শেষে বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি ৫ শতাংশে নেমে যাওয়ায় বাংলাদেশ ব্যাংকের ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজও জ্বালানি সংকটের কারণে দুর্বল হয়ে পড়ছে।
পোস্টে আরো উল্লেখ করা হয়, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশের ৪৮ বিলিয়ন ডলার রপ্তানি আয়ের ৩৮ দশমিক সাত শূন্য বিলিয়ন ডলারই এসেছে তৈরি পোশাক খাত থেকে। জ্বালানির কারণে আন্তর্জাতিক ক্রেতারা একবার ভিয়েতনাম বা ভারতে চলে গেলে তাদের আস্থা ফেরানো কঠিন হবে।
জরুরি ব্যবস্থাপনার অভাব
পোস্টে জরুরি ব্যবস্থাপনার অভাবকে কঠোরভাবে সমালোচনা করা হয়। গত মে মাসে জ্বালানি উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফওজুল কবির খান শিল্পের জন্য অতিরিক্ত ২৫০ এমএমসিএফডি গ্যাস দেয়ার যে সুনির্দিষ্ট রেশনিং পরিকল্পনা করেছিলেন, বর্তমানে তার চরম অভাব রয়েছে। ঘোড়াশাল-পলাশ সার কারখানাকে অগ্রাধিকার দিতে গিয়ে, অন্যান্য শিল্পকে বঞ্চিত করার বিষয়ে পোস্টে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। যেখানে দেশে ৬৬ লাখ টন সারের চাহিদার বিপরীতে, রাষ্ট্রায়ত্ত কারখানাগুলো মাত্র ১১ দশমিক শূন্য ছয় লাখ টন উৎপাদন করে, সেখানে কোনো স্বচ্ছ 'কস্ট-বেনিফিট অ্যানালাইসিস' ছাড়া, রপ্তানিমুখী শিল্পকে অচল করা যৌক্তিক কি না? উঠেছে সেই প্রশ্ন। একটি কারখানা বন্ধ হওয়া মানে শুধু ফটকে তালা পড়া নয়, বরং প্রায় ৬ হাজার মানুষের অর্থনৈতিক ইকোসিস্টেম ধ্বংস হওয়া।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বর্তমান ঘাটতির জন্য ব্যাটারিচালিত রিকশার রাতের চার্জিংকে দায়ী করে একে 'গরিবের টেসলা' আখ্যা দিয়েছেন। পোস্টে এর সমালোচনা করে বলা হয়, এফএসআরইউ-এর ত্রুটি ও কাঠামোগত সমস্যা আড়াল করে রিকশাকে দুষলে সমস্যার প্রকৃত মাত্রা ছোট হয়ে যায়।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান শিল্পের জন্য তৃতীয় এফএসআরইউ নির্দিষ্ট করার কথা বলেছেন এবং সরকার ২০২৯ সালের মধ্যে পায়রা, মোংলা ও হিরণ পয়েন্টে আরও তিনটি টার্মিনাল স্থাপনের পরিকল্পনা করেছে। তবে উদ্যোক্তাদের দাবি, আগামী সপ্তাহের রপ্তানি চালান বা চলতি মাসের বেতন ২০২৯ সাল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে পারবে না।
সমাধানের ছয়টি প্রস্তাব
বর্তমান সংকট সমাধানে ফাহিম ভাইয়ের পোস্টে সুনির্দিষ্ট ৬টি পদক্ষেপের কথা বলা হয়েছে। এসবের মধ্যে জাতীয় জ্বালানি-শিল্প জরুরি টাস্কফোর্স গঠন, ক্লাস্টারভিত্তিক ২৪ থেকে ৭২ ঘণ্টার পূর্বাভাসযোগ্য শিডিউল, গ্যাস বরাদ্দের স্বচ্ছ অগ্রাধিকার তালিকা প্রকাশ, তাৎক্ষণিক বিকল্প জ্বালানি সক্ষমতা বৃদ্ধি, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার টাইমলাইন প্রকাশ এবং শিল্পের জন্য আর্থিক সুরক্ষা বা ঋণ পরিশোধের সাময়িক পুনর্বিন্যাস।
বিশেষজ্ঞরা এই সংকট কাটিয়ে উঠতে দিয়েছেন, পরামর্শ।
শিল্পকে বাঁচানো কোনো নির্দিষ্ট ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর দাবি নয়, এটি বাংলাদেশের অর্থনীতিকে বাঁচানোর মৌলিক শর্ত। এখন দেখার বিষয়, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এই বাস্তবতাকে অনুধাবন করে, কতটা দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করে।
আরও পড়ুন:



.jpg)




