রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় একটি ভাড়া ফ্ল্যাটে জন্মদিনের অনুষ্ঠানের আড়ালে ১৫ আগস্ট ঘিরে নাশকতার পরিকল্পনার অভিযোগে ৫৪ জনকে গ্রেপ্তার করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। গ্রেপ্তারদের মধ্যে ৫২ জনকে আদালতের নির্দেশে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। অপ্রাপ্তবয়স্ক হওয়ায় দুজনকে গাজীপুরের টঙ্গী শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে পাঠানো হয়েছে।
বৃহস্পতিবার গভীর রাতে বসুন্ধরা এম ব্লকের ২৮ নম্বর সড়কের ২১৭৩ নম্বর ভবনের দ্বিতীয় তলার একটি ফ্ল্যাটে অভিযান চালানো হয়। পুলিশের দাবি, সেখানে ১৫ আগস্টকে কেন্দ্র করে রাজধানীর বিভিন্ন পয়েন্টে অগ্নিকাণ্ড ও নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডের পরিকল্পনা নিয়ে নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা গোপন বৈঠকে মিলিত হয়েছিলেন।
অভিযানে মেহজাবিন আক্তার মালা ও তার স্বামী মোতালেব হোসেনসহ ৫৩ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে আরও একজনকে আটক করা হয়। তল্লাশি চালিয়ে প্ররোচনামূলক ব্যানার, প্ল্যাকার্ড, ফেসমাস্ক ও নাশকতার সরঞ্জাম জব্দ করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
স্বামী-স্ত্রীকে ঘিরে তদন্ত
গোয়েন্দা সূত্র ও সরেজমিন অনুসন্ধান অনুযায়ী, নিরিবিলি পরিবেশের ওই সড়কটি গোপন বৈঠকের জন্য বেছে নেওয়া হয়েছিল। ঘটনার দিন সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার পর পাঁচটি মোটরসাইকেলসহ বিভিন্ন যানবাহনে করে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের লোকজন সেখানে আসেন। মোতালেব ও তার স্ত্রী মালা ভবনের মূল ফটকে তাদের অভ্যর্থনা জানান।
নিরাপত্তারক্ষী ও প্রতিবেশীদের জানানো হয়েছিল, ফ্ল্যাটে জন্মদিনের ঘরোয়া আয়োজন চলছে। পরে অচেনা ব্যক্তিদের আনাগোনা নিয়ে সন্দেহ তৈরি হলে রাত ৯টার দিকে ভাটারা থানা পুলিশ ফ্ল্যাটটি ঘেরাও করে।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ভাটারা থানার এসআই হাফিজুর রহমান জানান, গ্রেপ্তারদের জিজ্ঞাসাবাদে ১৫ আগস্টের আগেই রাজধানীতে বড় ধরনের বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির পরিকল্পনার তথ্য পাওয়া গেছে। এখন তাদের যোগাযোগ, অর্থের উৎস, কার নির্দেশে বৈঠক হয়েছে এবং পরবর্তী কর্মসূচি কী ছিল, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
মেহজাবিন আক্তার মালা ও মোতালেব হোসেনকে ঘিরে তদন্তে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, তারা ফ্ল্যাটটি ব্যবহার করে গোপনে দলীয় তৎপরতা চালাচ্ছিলেন।
আগস্টজুড়ে অভিযান
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বলছে, বসুন্ধরার ঘটনাটি বিচ্ছিন্ন নয়। ১৫ আগস্টকে কেন্দ্র করে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের কর্মী-সমর্থকদের বিরুদ্ধে অভিযান চালানো হয়েছে। ৩১ জুলাই থেকে ১৩ আগস্ট পর্যন্ত বিশেষ অভিযানে ৯১ জন গ্রেপ্তার হয়েছেন।
১১ আগস্ট বনানীতে মিছিলের প্রস্তুতির সময় চারজনকে গ্রেপ্তারের কথা জানিয়েছে পুলিশ। সেখানে ককটেল বিস্ফোরণের অভিযোগও রয়েছে। এর আগে ৭ আগস্ট বনানীর আর্মি স্টেডিয়ামসংলগ্ন এলাকায় মশাল মিছিলের প্রস্তুতির অভিযোগে সাতজনকে আটক করা হয়।
বসুন্ধরার পাশাপাশি মিরপুরেও আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় পর্যায়ের এক নেতা ও অঙ্গসংগঠনের এক কর্মীকে গ্রেপ্তারের তথ্য পাওয়া গেছে। পুলিশের অভিযোগ, শেখ হাসিনাকে দেশে ফেরানোর নামে নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডে তাদের সম্পৃক্ততা রয়েছে। এসব অভিযোগের সত্যতা তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নির্ধারিত হবে।
নিরাপত্তায় বাড়তি নজরদারি
১৫ আগস্টকে সামনে রেখে রাজধানীর নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। প্রবেশপথে তল্লাশি, গোয়েন্দা নজরদারি, গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় নিরাপত্তা বৃদ্ধি এবং ডিবি ও সিটিটিসির তৎপরতা বাড়ানো হয়েছে। প্রয়োজনে বিশেষায়িত ইউনিট প্রস্তুত রাখার কথাও জানিয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
মেট্রোরেল স্টেশন, রেলস্টেশন, বাস টার্মিনাল, লঞ্চঘাট, শপিংমলসহ জনসমাগমপূর্ণ এলাকাতেও নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। র্যাবের পক্ষ থেকে সাইবার স্পেসে নজরদারির কথাও বলা হয়েছে।
বসুন্ধরার ফ্ল্যাটে অভিযান শেষ হলেও তদন্ত এখনও চলছে। কে ফ্ল্যাটটি ভাড়া নিয়েছিল, কারা লোকজনকে ডেকেছিল, বৈঠকের অর্থের উৎস কী, কোথায় মিছিল বা নাশকতার পরিকল্পনা ছিল এবং রাজধানীর অন্য এলাকার সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর সঙ্গে এই বৈঠকের কোনো যোগসূত্র আছে কি না, তা খতিয়ে দেখছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
আরও পড়ুন:








