ফ্যাসিবাদের অগ্রদূত, সাবেক ফ্যাসিস্ট ও পলাতক শেখ হাসিনার রাজনৈতিক জীবন যেমন বিতর্কে ঘেরা এক মহাকাব্যিক ও কালো উপাখ্যান, তেমনই তাঁর বৈবাহিক ও ব্যক্তিজীবনও যেন আরও বেশি অন্ধকারাচ্ছন্ন এক কালো অধ্যায়। সমালোচকদের নানা বক্তব্য ও বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত বর্ণনায় দাবি করা হয়েছে, ব্যক্তিজীবনে শেখ হাসিনার একাধিক পুরুষের সঙ্গে অবৈধ সম্পর্ক ছিল। এসব অভিযোগকে ঘিরে বিভিন্ন সময়ে সৃষ্টি হয়েছে নানা বিতর্ক। আর শেখ হাসিনার একাধিক পুরুষের সঙ্গে অবৈধ সম্পর্কের এসব সমালোচনার মধ্যেও বিতর্কের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল এক হিন্দু যুবক, মৃণাল কান্তি দাসের সঙ্গে শারীরিক সম্পর্কের গুঞ্জন।
বীর মুক্তিযোদ্ধা মতিউর রহমান রেন্টুর বইয়ের বর্ণনা
বীর মুক্তিযোদ্ধা মতিউর রহমান রেন্টুর আমার ফাঁসি চাই বইয়ে এমনই এক অন্ধকারাচ্ছন্ন ও চাঞ্চল্যকর অধ্যায়ের বর্ণনা পাওয়া যায়। বইটির বর্ণনা অনুযায়ী, ১৯৮৭ সালের দিকে শেখ হাসিনা প্রতিদিনই সন্ধ্যার ঠিক এক ঘণ্টা আগে, পাউডার ও পারফিউম দিয়ে, লম্বা চুল বেণির আবরণে আবৃত করে বেশ সজ্জিত হয়ে কাউকে সঙ্গে না নিয়েই, শুধু গাড়িচালক জালালকে সঙ্গে নিয়ে অজ্ঞাত কোনো স্থানের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে যেতেন এবং প্রায় ঘণ্টা দুয়েক পর ফিরে আসতেন বলে দাবি করা হয় ওই বইয়ে।
নববধূর মতো, সাজে সজ্জিত হয়ে একা একা নির্জনে শেখ হাসিনা কোথায় যেতেন, সে প্রশ্নের উত্তর কেউ জানতেন না বলেই বইটিতে দাবি করা হয়েছে। কোথায় ছিল সেই অজ্ঞাত ঠিকানা? কার উদ্দেশে ছিল সেই সাজ? কার জন্য ছিল সেই অপেক্ষা? কার কাছে গিয়ে রাতের অন্ধকারে মিলিয়ে যেতেন তিনি? এসব প্রশ্নের কোনো সুস্পষ্ট উত্তর এখনও প্রকাশ্যে আসেনি। ফলে সমালোচকদের ভাষ্যে, এ যেন ছিল তাঁর জীবনের এক গোপন ও অদৃশ্য অধ্যায়—যার পাতাগুলো অন্ধকারে ঢাকা, অথচ যার ছায়া আজও রাজনৈতিক অঙ্গনে ঘুরে বেড়ায়।
মৃণাল কান্তি দাসের আগমন
এরপরই, আমার ফাঁসি চাই বইয়ের বর্ণনা অনুযায়ী, শেখ হাসিনার জীবনে আগমন ঘটে এক নতুন চরিত্র মৃণাল কান্তি দাসের। যেন অন্ধকারের পর্দা সরিয়ে তাঁর জীবনের বিতর্কিত প্রেমকাহিনীতে প্রবেশ করে আরেক অধ্যায়। ১৯৮৭ সালে মুন্সীগঞ্জ হরগঙ্গা কলেজ ছাত্র সংসদের তৎকালীন ভিপি, তরুণ যুবক মৃণাল কান্তি দাসের সঙ্গে শেখ হাসিনার পরিচয় হয়। বইটির বর্ণনা অনুযায়ী, পরিচয়ের পর থেকেই ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের শেখ মুজিবুর রহমানের বাড়িতে রাত-দিন একাকার করে প্রতিটি মুহূর্ত তাঁর সঙ্গে কাটাতে থাকেন শেখ হাসিনা।
মৃণাল কান্তি দাসের সঙ্গে পরিচয় হওয়ার পর থেকেই শেখ হাসিনা ধীরে ধীরে তাঁর সেই অদৃশ্য প্রেমের রূপকাহিনীর ইতি টানতে শুরু করেন এবং নিয়মিত রুটিনমাফিক সন্ধ্যার আগে অজ্ঞাত স্থানে যাওয়াও ছেড়ে দেন বলে তার বইয়ে দাবি করেছেন মতিউর রহমান রেন্টু। বইটিতে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, গভীর রাত পর্যন্ত ধানমন্ডি বত্রিশের শেখ মুজিবুর রহমানের ভবনের লাইব্রেরি কক্ষের ভেতর থেকে দরজা লাগিয়ে মৃণাল কান্তি দাস ও শেখ হাসিনা চুপিসারে কথা বলতেন এবং খিলখিল করে হাসাহাসি করতেন। বাইরে তখন হয়তো নিস্তব্ধ রাত; অথচ বন্ধ দরজার ওপারে চলত দীর্ঘ আলাপ, হাসি আর এক অদৃশ্য ঘনিষ্ঠতার পর্ব, যার ব্যাখ্যা নিয়ে পরবর্তীকালে নানা আলোচনা ও সমালোচনা তৈরি হয়।
মৃণাল কান্তি দাসের প্রভাব
শেখ হাসিনার কাছে মৃণাল কান্তি দাসের গ্রহণযোগ্যতা এতটাই বেড়ে গিয়েছিল যে, আওয়ামী লীগের অন্যদের কাছে তিনি হয়ে উঠেছিলেন ঈর্ষার পাত্র। এমনকি শেখ হাসিনার কথিত ঘনিষ্ঠতার কারণে মৃণালকে তাঁর রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে বিশেষ ক্ষমতাধর বলেও সমালোচনা করা হয়েছে। তাঁর প্রভাবকে রূপক অর্থে শেখ হাসিনার ‘রাজ্যের এক সম্রাট’ হিসেবেও বর্ণনা করা হয়েছে আমার ফাসি চাই বইয়ে।
মৃণালের সেই কথিত প্রভাব কতটা বিস্তৃত হয়েছিল, তার একটি উদাহরণ হিসেবেও বইটিতে ১৯৯০ সালের একটি ঘটনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে দাবি করা হয়, আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক সৈয়দা সাজেদা চৌধুরীকে মৃণাল কান্তি দাস অপমান-অপদস্ত করে বঙ্গবন্ধু ভবন থেকে বের করে দিয়েছিলেন।
কথিত এই সম্পর্কের গভীরতা নিয়ে আরও একটি ঘটনা বর্ণনা করেছেন মতিউর রহমান রেন্টু। তাঁর বর্ণনা অনুযায়ী, একদিন মৃণাল কান্তি দাস রাগ করে ধানমন্ডি ৩২ নম্বর থেকে চলে গেলে শেখ হাসিনা নিজেই গিয়ে তাঁর রাগ ভাঙিয়ে তাঁকে ফিরিয়ে নিয়ে আসেন। একজন রাজনৈতিক নেত্রীর জীবনে একজন তরুণ রাজনৈতিক কর্মীর এমন কথিত প্রভাব ও ঘনিষ্ঠতা স্বাভাবিকভাবেই নানা প্রশ্নের জন্ম দেয়।
স্বামীর সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি
অথচ সেই সময়েও শেখ হাসিনার স্বামী ড. এম. এ. ওয়াজেদ মিয়া জীবিত ছিলেন। সমালোচকদের ভাষ্যে, তাঁর জীবদ্দশাতেই শেখ হাসিনার ব্যক্তিজীবনকে ঘিরে এসব কথিত পরকীয়ার কালো উপাখ্যান রচিত হয়। এখানেই যেন গল্পটি আরও অস্বস্তিকর হয়ে ওঠে—একদিকে বৈবাহিক বন্ধন, অন্যদিকে কথিত এক নতুন সম্পর্কের টান। সমালোচকদের ভাষায়, এ যেন ঘরের বাঁধন হাতে, অথচ মন অন্য ঘাটে।
এর আগে, ১৯৮১ সালে শেখ হাসিনা দেশে ফেরার পর তাঁর সঙ্গে স্বামী ড. ওয়াজেদ মিয়ার সম্পর্কের অবনতি হয়েছিল—এমন দাবিও মতিউর রহমান রেন্টুর বইয়ের বর্ণনায় পাওয়া যায়। বইয়ের লেখা অনুযায়ী, দেশে ফেরার পর শেখ হাসিনা তাঁর স্বামী ড. ওয়াজেদ মিয়ার মহাখালীর সরকারি কোয়ার্টারে ওঠেন। সে সময় ড. ওয়াজেদও সেখানে থাকতেন বলে বর্ণনা করা হয়েছে। অর্থাৎ একই ভবন, একই ছাদ, একই ঠিকানা—কিন্তু কথিতভাবে দুজনের জীবন চলত যেন দুই ভিন্ন জগতে। মতিউর রহমান রেন্টুর দাবিতে, একই ভবনে থেকেও শেখ হাসিনা তাঁর স্বামীর দিকে ফিরেও তাকাতেন না। স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের এই কথিত দূরত্বের বর্ণনা থেকেই সমালোচকেরা প্রশ্ন তুলেছেন—একই ছাদের নিচে থেকেও যদি দুটি জীবন দুই মেরুতে অবস্থান করে, তবে সেই দূরত্বের নেপথ্যে কী ছিল?
সব মিলিয়ে, ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার রাজনৈতিক জীবন যেমন নানা বিতর্ক, অভিযোগ ও অন্ধকার অধ্যায়ে ঘেরা, তেমনি তাঁর ব্যক্তিজীবন নিয়েও রয়েছে বহু প্রশ্ন, বহু গুঞ্জন এবং বহু অমীমাংসিত বর্ণনা। ইতিহাসের পাতায় সব সত্য সমানভাবে লেখা থাকে না; কিছু সত্য দলিল হয়ে আসে, কিছু আসে সাক্ষ্য হয়ে, আর কিছু থেকে যায় প্রশ্নের মতো—উত্তরহীন, অথচ সময়ের দরজায় বারবার কড়া নাড়া এক দীর্ঘ ছায়া হয়ে।
আরও পড়ুন:








