শুক্রবার

১৪ আগস্ট, ২০২৬ ৩০ শ্রাবণ, ১৪৩৩

কেনো অনিবার্য হয়ে পড়েছিলো ১৫-ই আগস্ট?

নিউজ ডেস্ক বাংলা এডিশন

প্রকাশিত: ১৪ আগস্ট, ২০২৬ ২০:৫৬

আপডেট: ১৪ আগস্ট, ২০২৬ ২০:৫৭

শেয়ার

কেনো অনিবার্য হয়ে পড়েছিলো ১৫-ই আগস্ট?
ছবি বাংলা এডিশন

স্বৈরাচার’ মুজিবের পতন; অজানা যা জানিয়েছেন মেজর ডালিম-রাশেদ চৌধুরী। মুজিবের পুরো পরিবারকে উৎখাতের আসল ইতিহাস ৫০ বছর পর সামনে এনেছেন দুই বিপ্লবী।

১৯৭১ সালে স্বাধীনতার, মাত্র সাড়ে তিন বছরের ব্যবধানে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট, শেখ মুজিবের পতন ও মৃত্যুতে দেশের মানুষ কেন রাস্তায় নেমে উল্লাস করেছিল? তা গভীরভাবে অনুধাবনের বিষয়।

অনেকেরই প্রশ্ন, ১৫ই আগস্ট কেন ঘটেছিল? শেখ মুজিবের পুরো পরিবারকে কেন উৎখাত করা হয়েছিলো?

অনুসন্ধানী সাংবাদিকের আলোচনায় অজানা ইতিহাস

অনুসন্ধানী সাংবাদিক ইলিয়াস হোসাইনের এক বিশেষ আলোচনায় প্রথমবারের মতো সেই অজানা ইতিহাস, চরম রাজনৈতিক দেউলিয়াত্ব, গুম-খুন-ধর্ষণ এবং ১৫ই আগস্টের পেছনের আসল সত্য তুলে ধরেছেন সেই ঐতিহাসিক ঘটনার দুই প্রত্যক্ষ রূপকার, বীর মুক্তিযোদ্ধা মেজর শরিফুল হক ডালিম এবং বীর প্রতীক রাশেদ চৌধুরী।

বিশ্লেষকদের মতে, মোহভঙ্গের শুরুটা হয়েছিল ১৯৭১ সাল থেকেই। সাংবাদিক ইলিয়াস হোসাইনের আলোচনায় রাশেদ চৌধুরী দাবি করেন, শেখ মুজিব প্রকৃতপক্ষে কখনোই বাংলাদেশের স্বাধীনতা চাননি। বরং তিনি পাকিস্তানের সাথেই আপস করতে চেয়েছিলেন।

রাশেদ চৌধুরী, সাবেক সেনা কর্মকর্তা ও মুক্তিযোদ্ধা (বীর প্রতীক)।
বিজয়ের দিনে রেসকোর্স ময়দানে কোনো বাংলাদেশি বা মুক্তিযোদ্ধাকে রাখা হয়নি। মেজর ডালিমের অভিযোগ, এর পেছনে মূল কারণ ছিল ভারতের সাথে করা ৭ দফার এক গোপন দাসত্ব চুক্তি। এই চুক্তির শর্ত শুনে খোদ তাজউদ্দীন আহমদ হতবাক হয়ে গিয়েছিলেন।

যুদ্ধ পরবর্তী লুটপাট ও দমন

শরিফুল হক ডালিম, সাবেক সেনা কর্মকর্তা ও মুক্তিযোদ্ধা (বীর উত্তম)।
যুদ্ধের পর ভারতীয় বাহিনী দেশের শিল্পকারখানা ও অস্ত্রশস্ত্র লুট করে নিয়ে যায়। মেজর ডালিমের মতে, শেখ মুজিব নিজেই এই লুটপাটের সুযোগ করে দিয়েছিলেন। আর এর প্রতিবাদ করায় দেশপ্রেমিক সেনা কর্মকর্তাদের কারাগারে বন্দি করা হয়।

ক্ষমতা পাকাপোক্ত করতে শুরু হয় চরম বর্বরতা। মেজর ডালিমের অভিযোগ, রক্ষীবাহিনীর মাধ্যমে দেশজুড়ে খুন, চোখ বেঁধে তুলে নেয়া এবং নারীদের সম্মানহানির মহোৎসব চলছিল।

স্বাধীন দেশে ভিন্নমতের কোনো স্থান ছিল না। রাশেদ চৌধুরীর দাবি, রক্ষীবাহিনীর হাতে হাজার হাজার দেশপ্রেমিককে হত্যা করে লাশের পাহাড় গড়া হয়েছিল। নির্মমভাবে খুন করা হয় দেশপ্রেমিক নেতা সিরাজ শিকদারকে।

সব রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করে একদলীয় 'বাকশাল' কায়েম করেন শেখ মুজিব। কেড়ে নেয়া হয় মানুষের বাকস্বাধীনতা, নির্দিষ্টের বাইরে বন্ধ করে দেয়া হয় সংবাদপত্র।

দুর্ভিক্ষ ও আইনের শাসনের প্রহসন

১৯৭৪ সালে দেশে যখন মানবসৃষ্ট ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ চলছে, পথে-ঘাটে মানুষ না খেয়ে মারা যাচ্ছে, তখন শাসকগোষ্ঠীর চিত্র ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন।

আইনের শাসন তখন প্রহসনে পরিণত হয়েছিলো। তখনকার ঢাকা শহর আওয়ামী লীগের সভাপতি গাজী গোলাম মোস্তফা, মেজর ডালিম ও তাঁর স্ত্রীকে অপহরণ করার পরও, মুজিব কোনো বিচার করেননি। উল্টো মেজর ডালিমকে চাকরিচ্যুত করে তার ভাইয়ের সাথে ব্যবসার প্রস্তাব দেন।

১৫ আগস্টের পরিকল্পনা ও পরিণতি

এতসব অনাচার আর স্বৈরাচারের অনিবার্য পরিণতি ছিল ১৫ই আগস্ট। রাশেদ চৌধুরী জানান, সেনা কর্মকর্তাদের মূল পরিকল্পনা ছিলো মুজিবকে আটক করে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে 'কোর্ট মার্শাল' করা। কিন্তু সেদিন রাতে প্রথম গুলি এসেছিল শেখ কামাল ও সুলতানা কামালের দিক থেকে। এরপরই, পরিস্থিতি পাল্টে যায়।

শেখ মুজিবের মৃত্যুর পর কোনো প্রতিরোধ তো দূরের কথা, উল্টো সবাই স্বস্তি প্রকাশ করেছিল। রাশেদ চৌধুরীর ভাষ্যমতে, রক্ষীবাহিনী বিনা বাধায় আত্মসমর্পণ করে এবং সেনা ও পুলিশ প্রধানরা রেডিও স্টেশনে এসে, নতুন সরকারের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করে।

কারফিউ ওঠার পর সাধারণ মানুষের বাধভাঙা উল্লাস প্রমাণ করেছিল, তারা কতটা অতিষ্ঠ ছিল। এমনকি সেনাবাহিনীর ভেতরেও ছিল ব্যাপক সমর্থন।

মেজর ডালিমের দাবি, ভারতীয় আগ্রাসনের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে তৎকালীন সেনা কর্মকর্তাদের নিয়ে গড়া 'সেনা পরিষদ'-এর সাথে কোরআন ছুঁয়ে শপথ নিয়েছিলেন শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান।

১৫ই আগস্টের পটপরিবর্তনের দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও আওয়ামী লীগের স্বৈরতান্ত্রিক মানসিকতার কোনো পরিবর্তন হয়নি। বরং শেখ হাসিনার আমলে তা আরও ভয়ংকর রূপ নিয়েছিল বলে দাবি করেন মেজর ডালিম।

অনুসন্ধানী সাংবাদিক ইলিয়াস হোসাইনের দুটি পৃথক আলচোনায় এই দীর্ঘ বর্ণনা থেকে জানা যায়, ১৫ই আগস্ট কেবল কয়েকজন বিপথগামী সেনাসদস্যের আকস্মিক কোনো কাজ ছিল না। বরং এটি ছিল ভারতীয় আধিপত্যবাদ, রক্ষীবাহিনীর গুম-খুন-ধর্ষণ, ১৫ লাখ মানুষের দুর্ভিক্ষে মৃত্যু, ব্যাংক ডাকাতি এবং একদলীয় বাকশালের চরম স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে দেশপ্রেমিক সেনাসদস্য ও সাধারণ মানুষের এক অনিবার্য প্রতিরোধ। জনগণের অধিকার হরণ করে এবং আইনের শাসন ভূলুণ্ঠিত করে কোনো শাসকই যে শেষ পর্যন্ত টিকতে পারে না, ১৯৭৫ থেকে ২০২৪ সালের ইতিহাস যেন তারই অকাট্য প্রমাণ।



banner close
banner close