শুক্রবার

১৪ আগস্ট, ২০২৬ ৩০ শ্রাবণ, ১৪৩৩

কীর্তিমানের মৃত্যু নেই; আল্লামা সাঈদী বেঁচে থাকবেন চিরকাল

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ১৪ আগস্ট, ২০২৬ ১৭:১৯

শেয়ার

কীর্তিমানের মৃত্যু নেই; আল্লামা সাঈদী বেঁচে থাকবেন চিরকাল
ফাইল ছবি

কোরআনের পাখি আল্লামা সাঈদীর সংগ্রাম। কীর্তিমানের মৃত্যু নেই। আল্লামা সাঈদী বেঁচে থাকবেন চিরকাল। সাঈদীর শাহাদাত বার্ষিকী। স্বৈরাচার হাসিনার রোষানলে পড়ে ২০২৩ সালের ১৪ আগস্ট মৃত্যুবরণ করেন দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী।

জন্ম ও শিক্ষা

আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী। পঞ্জিকার পাতায় তখন ১৯৪০ সালের ২ ফেব্রুয়ারি। পিরোজপুর জেলার জিয়ানগরনে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে পৃথিবীর আলো দেখেন তিনি। পিতা মাওলানা ইউসুফ সাঈদীর নিবিড় তত্ত্বাবধানে শুরু হয় প্রাথমিক পাঠ। এরপর ছারছীনা দারুচ্ছুন্নাত কামিল মাদরাসা এবং খুলনা আলিয়া মাদরাসার আঙিনায় নিজেকে শাণিত করেন উচ্চতর ইসলামি শিক্ষায়।

ধর্মীয় ব্যাখ্যার চিরাচরিত গণ্ডি ভেঙে তিনি বেছে নিয়েছিলেন বিজ্ঞানভিত্তিক ও যৌক্তিক আলোচনার পথ। আর এই অভিনবত্বই তাঁকে সাধারণ মানুষের কাছে অপ্রতিদ্বন্দ্বী করে তোলে।

প্রচার ও গবেষণা

দীর্ঘ প্রায় অর্ধশতাব্দী যাবত কেবল দেশের সীমানাতেই নয়, বরং যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, সৌদি আরব, কুয়েত ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো রাষ্ট্রগুলোতেও ঐশী গ্রন্থের শাশ্বত বাণী প্রচার করেছেন আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী।

তাঁর অগাধ পাণ্ডিত্যের স্বীকৃতিস্বরূপ এক বিরল সম্মাননা ধরা দেয় তাঁর হাতে, একমাত্র বাংলাদেশি হিসেবে সৌদি বাদশার বিশেষ আমন্ত্রণে পবিত্র কাবা শরীফের অভ্যন্তরে প্রবেশের সুযোগ পান তিনি। সেইসাথে নিজের প্রজ্ঞার স্বাক্ষর রেখে গেছেন ৭৫টির মতো অমূল্য গবেষণামূলক গ্রন্থ রচনার মাধ্যমে।

সামাজিক অবদান

কেবল বয়ানের মিম্বরেই তাঁর বিচরণ সীমাবদ্ধ ছিল না। অবহেলিত জনগোষ্ঠীর ভাগ্য বদলের কারিগর হিসেবে পিরোজপুরের বাইপাস সড়ক সংলগ্ন সুবিশাল এলাকাজুড়ে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন আল্লামা সাঈদী ফাউন্ডেশন। যেখান থেকে পরিচালিত হয়ে থাকে তার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। আর আধুনিক ও নৈতিক শিক্ষার অপূর্ব সমন্বয়ে গড়ে তোলেন ইসলামিয়া টেকনিক্যাল অ্যান্ড বিজনেস ম্যানেজমেন্ট কলেজ এবং আল-কুরআন একাডেমি।

সেইসাথে দুস্থদের জন্য ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্প, অ্যাম্বুলেন্স সেবা, বিধবা-এতিমদের আর্থিক সহায়তা থেকে শুরু করে প্রাকৃতিক দুর্যোগে ত্রাণ নিয়ে ছুটে যাওয়ার এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে এই প্রতিষ্ঠান। প্রতি বছর দুই ঈদে এই ফাউন্ডেশন প্রাঙ্গণেই অনুষ্ঠিত হয় লাখো মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে বিশাল জামাত।

রাজনৈতিক জীবন

রাজনীতির ময়দানেও তিনি ছিলেন সমান দাপুটে। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে-আমীর ছিলেন দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী। ১৯৯৬ এবং ২০০১ সালের জাতীয় নির্বাচনে পিরোজপুর-১ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে নিজ এলাকায় অবিস্মরণীয় অবকাঠামোগত উন্নয়ন সাধন করেন।

তবে, এই আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তা ও দূরদর্শিতাই একসময় তাঁর জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়। আজ থেকে প্রায় ত্রিশ বছর আগে, প্রতিবেশি রাষ্ট্র ভারতের আধিপত্যবাদ ও সুদূরপ্রসারী রাজনৈতিক নীল নকশার বিরুদ্ধে কঠোর সমালোচনা করেছিলেন দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী।

দিল্লির নীতিনির্ধারকরা ঠিকই আঁচ করতে পেরেছিলেন, এই অঞ্চলে তাদের বিস্তারের পথে সবচেয়ে বড় কাঁটা এই অকুতোভয় ব্যক্তিটি।

বিচার ও কারাবাস

অভিযোগ রয়েছে, সরাসরি ভারতের ইশারাতেই তৎকালীন স্বৈরাচারী শেখ হাসিনা সরকার এই কণ্ঠস্বরকে চিরতরে স্তব্ধ করার পরিকল্পনা সাজায়। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় যিনি নিতান্তই একজন ছোট্ট শিক্ষার্থী ছিলেন, রাজনৈতিক প্রতিহিংসার বশবর্তী হয়ে সেই তাঁকেই সম্পূর্ণ বানোয়াট মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় জড়ানো হয়। এক প্রহসনের বিচারিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে তাঁকে আমৃত্যু কারাদণ্ড দিয়ে বন্দি করে রাখা হয় অন্ধ প্রকোষ্ঠে। সেখানেই নিঃসঙ্গ অবস্থায় কেটে যায় তাঁর জীবনের এক দীর্ঘ অধ্যায়।

মৃত্যু

সময়টা ২০২৩ সালের রবিবার (১৩ আগস্ট) বিকেল। কাশিমপুর কারাগারে হঠাৎ বুকে প্রচণ্ড ব্যথা অনুভব করেন বয়োজ্যেষ্ঠ এই কারাবন্দি। প্রথমে গাজীপুরের শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ এবং ওইদিন রাতেই তাঁকে স্থানান্তর করা হয় ঢাকার তৎকালীন শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে। হার্টে আগে থেকেই পাঁচটি স্টেন্ট বা রিং পরানো ছিল তাঁর। চিকিৎসাধীন অবস্থায় পরদিন, সোমবার (১৪ আগস্ট) রাত ৮টা ৪০ মিনিটে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী।

অফিশিয়াল কাগজপত্রে একে কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট বা স্বাভাবিক মৃত্যু বলা হলেও, ঘটনাপ্রবাহ জন্ম দেয় চরম বিতর্কের। বিশেষ করে মেডিকেল টিমের সদস্য ডা. এস এম মোস্তফা জামানের অন্তর্ভুক্তি নিয়ে ক্ষোভে ফেটে পড়ে সাধারণ মানুষ।

মোস্তফা জামান ছিলেন তৎকালীন ক্ষমতাসীন দলের কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য বিষয়ক কমিটির সদস্য, ঢাকা মেডিকেলের সাবেক ছাত্রলীগ নেতা এবং ২০১৩ সালের গণজাগরণ মঞ্চে সাঈদীর ফাঁসির দাবিতে ষড়যন্ত্রের এক মুখ, তাঁর হাতে এই বর্ষীয়ান আলেমের সুচিকিৎসা পাওয়ার সুযোগ কতটুকু, সেই প্রশ্ন ওঠে জোরালোভাবে।

অন্যদিকে, বিগত স্বৈরাচারী সরকারের আমলে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হয়ে মিথ্যা মামলায় ফেঁসে যাওয়ার অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা। তাদের দাবি, আল্লামা সাঈদী কোনো ধরনের যুদ্ধাপরাধের সঙ্গে জড়িত ছিলেন না। এছাড়াও তার সামাজিক অবদান ও বিভিন্ন গুণাবলীর কথা তুলে ধরে তারা।

হিন্দু, ধর্মাবলম্বীদের প্রতিও তাঁর ছিল আলাদা সুনজর। তারা কখনোই তাঁর কাছ থেকে বঞ্চিত হতেন না, যেকোনো প্রয়োজনে সাড়া পেয়ে যেতেন সাথে সাথেই। এমন স্মৃতিচারণ করে স্থানীয় সনাতন ধর্মাবলম্বীরা।

পরিবারের অভিযোগ

সাঈদীর পরিবারের সদস্যদের অভিযোগ, এটি নিছক অসুস্থতা নয় বরং একটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। হাসপাতালে পুরো প্রক্রিয়াটিই ছিল রহস্যে ঘেরা। কোনো স্বজনকে কাছে ঘেঁষতে দেয়া হয়নি ওই মুমূর্ষু সময়েও।

ভারতীয় আগ্রাসনের বিরুদ্ধে বীরোচিত ভূমিকা রাখায়, শেখ হাসিনা পরিকল্পিতভাবে দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীকে হত্যা করেছেন। এমন মন্তব্য করেছেন আল্লামা সাঈদীর ছেলে মাসুদ সাঈদী।

দাফন

এমনকি, মৃত্যুর পরও শান্তিতে শেষ বিদায় জানাতে পারেনি তাঁর স্বজনরা। তৎকালীন স্বৈরাচারী প্রশাসন ঢাকায় কোনো জানাজা অনুষ্ঠিত হতে দেয়নি। কড়া পুলিশি পাহারায় রাতের গভীরেই মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয় পিরোজপুরে। পরদিন, ১৫ আগস্ট নিজ হাতে গড়া সাঈদী ফাউন্ডেশনের মাটিতেই লাখো মানুষের অশ্রুসিক্ত উপস্থিতিতে চিরনিদ্রায় শায়িত হন বিশ্ববরেণ্য এই মুফাসসির।

স্মরণ

মৃত্যুবার্ষিকীতে, আল্লামা দেলোয়ার হোসাইন সাঈদীকে স্মরণ করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বিরোধীদলীয় প্রধান শফিকুর রহমান। ফেসবুক পোস্টে তিনি বলেন, কিছু মানুষ পৃথিবী থেকে চলে গেলেও মানুষের হৃদয়ে বেঁচে থাকেন অনাদিকাল ধরে। আল্লামা দেলোয়ার হোসাইন সাঈদী ছিলেন তেমনই একজন মানুষ।

২০২৪ সালে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর, আল্লামা সাঈদীর মৃত্যুর প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটনে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন তদন্ত কমিটি গঠনের দাবি আবারও জোরালো হয়েছে। স্বৈরাচারের বোনা ধোঁয়াশা আজও কাটেনি। আইনি মারপ্যাঁচ আর চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগের সুরাহা হয়তো একদিন হবে। তবে, রেখে যাওয়া বিজ্ঞানভিত্তিক ইসলামি দর্শন আর মানবসেবার যে অনন্য দৃষ্টান্ত তিনি স্থাপন করে গেছেন, তা শতাব্দীর পর শতাব্দী কোটি মানুষের হৃদয়ে অমলিন হয়ে থাকবে।



banner close
banner close