শুক্রবার

১৪ আগস্ট, ২০২৬ ৩০ শ্রাবণ, ১৪৩৩

১৭ বছরে ভারতের যতো বর্বরতা

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ১৪ আগস্ট, ২০২৬ ০৬:৩৮

আপডেট: ১৪ আগস্ট, ২০২৬ ১১:২৫

শেয়ার

১৭ বছরে ভারতের যতো বর্বরতা
ছবি সংগৃহীত

২০২১ সালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ঢাকা সফরের প্রতিবাদে, তীব্র ক্ষোভে ফেটে পড়ে দেশের মানুষ। ওই সময়ই প্রতিবাদী মানুষের ওপর নারকীয় হত্যাকাণ্ড চালায় হাসিনার বাহিনী। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি হত্যাযজ্ঞ হয়, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়। সংঘটিত ওই নারকীয় গণহত্যার ৫ বছর পাড় হয়েছে। বিগত স্বৈরাচারী হাসিনা সরকারের আমলে এই হত্যাকাণ্ডের কোনো বিচার তো হয়ইনি, উল্টো সাধারণ মানুষের ওপর চাপিয়ে দেয়া হয়েছিল শত শত মিথ্যা মামলা।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ

চব্বিশের পটপরিবর্তনের পর অবশেষে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে শেখ হাসিনাসহ ১৬ জনকে আসামি করে অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে। তবে, সম্প্রতি ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’-এর প্রধান পরাগ জৈনের রহস্যময় ঢাকা সফর এবং ভারতীয় হাইকমিশনারের বক্তব্যে দেশবাসীর মনে, নতুন করে সন্দেহ দানা বেঁধেছে।

গত বছর মঙ্গলবার (৭ জানুয়ারি) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে শেখ হাসিনা, ফ্যাসিস্ট সরকারের সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল এবং ওই সরকারের ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সাবেক এমপি ওবায়দুল মুক্তাদিরসহ ১৬ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করেছেন ‘জাতীয় নাগরিক পার্টির’র সদস্য সচিব আখতার হোসেন।

বর্তমানে ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা এই মামলার তদন্ত চালাচ্ছে। পাশাপাশি, গত রবিবার (৯ আগস্ট) প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাথে সাক্ষাৎ করে এই গণহত্যাসহ, ৯ দফা দাবি জানিয়েছে হেফাজতে ইসলাম। প্রধানমন্ত্রীও ন্যায়বিচার নিশ্চিতে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।

হাসিনার শাসনামলের হত্যাকাণ্ড ও ভারতীয় ইন্ধন

অভিযোগ রয়েছে, হাসিনার শাসনামলের প্রতিটি বড় হত্যাকাণ্ডের পেছনেই ছিল ভারতের ইন্ধন। জানা যায়, ২০০৬ সালের শনিবার (২৮ অক্টোবর) লগি-বৈঠার তাণ্ডবের পর ফখরুদ্দিন-মঈন ইউ আহমেদ সরকারকে ব্যবহার করে, হাসিনাকে ক্ষমতায় বসাতে মাঠে নেমেছিলেন তৎকালীন ভারতীয় হাইকমিশনার পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তী। ক্ষমতায় বসেই ২০০৯ সালের ২৫-২৬ ফেব্রুয়ারি বিডিআর বিদ্রোহের নামে হত্যা করা হয় ৫৭ জন চৌকস সেনা কর্মকর্তাকে।

একইভাবে অভিযোগ উঠেছে, প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ধ্বংসের পর টার্গেট করা হয় আলেম-ওলামা ও ধর্মপ্রাণ মানুষকে। টুপি-দাড়ি-পাঞ্জাবি বা হিজাব দেখলেই ‘জঙ্গি’ তকমা দিয়ে আয়নাঘরে অকথ্য নির্যাতন চালানো হতো। অনেক মসজিদের ইমামকে চাকরিচ্যুত করা হয়। নজরদারি বাড়ানো হয় কওমি মাদ্রাসায়। এর ফাঁকে অভিশপ্ত ফারাক্কা বাঁধ, ৫৪টি নদীর উজানে বাঁধ, ট্রানজিট, রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করে বাংলাদেশের ওপর আধিপত্য কায়েম করে ভারত।

সীমান্তে বিএসএফের হাতে প্রাণ যায় ৫৮৮ জন বাংলাদেশির, যার মূর্ত প্রতীক ২০১১ সালে কাঁটাতারে ঝুলে থাকা কিশোরী ফেলানী খাতুন।

এছাড়া, ২০১৩ সালে শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশে বর্বর গণহত্যা চালান শেখ হাসিনা, যেখানে ৬১ জন শহীদ হন। এরপর ২০১৪ সালের ভোটারবিহীন ও ২০১৮ সালের রাতের ভোটের মাধ্যমে ক্ষমতা পাকাপোক্ত করেন হাসিনা। ২০১৯ সালে ভারতের সাথে অসম চুক্তির প্রতিবাদ করায় বুয়েট ছাত্র আবরার ফাহাদকে পিটিয়ে মারে ছাত্রলীগ।

২০২১ সালের মার্চের হত্যাকাণ্ড

সব ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটে ২০২১ সালের মার্চে। হাজারো মুসলমানের রক্তে রঞ্জিত নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশ সফরের প্রতিবাদে রাজপথে নামে ছাত্র-জনতা। পুলিশের গুলিতে দেশজুড়ে বহু মানুষ হতাহত হয়। চট্টগ্রামের হাটহাজারীতে ৪ জন এবং নারায়ণগঞ্জে ১ জন নিহত হন। আর সবচেয়ে বড় বিভীষিকা নেমে আসে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়, সেখানে ঝরে যায় ১৫টি তাজা প্রাণ।

ওই বছরের, শুক্রবার (২৬ মার্চ) ঢাকার বায়তুল মোকাররমে হামলার খবরে উত্তাল ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় প্রথম বুলেটের আঘাতে শহীদ হন ১৭ বছরের কিশোর আশিক মিয়া। পরদিন শনিবার (২৭ মার্চ) সাবেক এমপি উবায়দুল মুক্তাদির চৌধুরী ও এসপি আনিসুর রহমানের নির্দেশে শহর পরিণত হয় রণক্ষেত্রে।

ওইদিন থানা ব্রিজ এলাকায় পুলিশের গুলিতে শহীদ হন ২২ বছরের মাদ্রাসা ছাত্র মাওলানা হুসাইন আহমাদ ও ১৪ বছরের কিশোর হাফেজ জুবায়ের। টিএ রোডে প্রবাসী যুবক মুশাহিদ এবং সুহিলপুরে ১৬ বছরের কিশোর ফয়সাল মিয়া শহীদ হন। সবচেয়ে নারকীয় হত্যাযজ্ঞ ঘটে নন্দনপুরে।

সেখানে নির্বিচার গুলিতে প্রাণ হারান ২২ বছরের প্লাম্বার কাউসার মিয়া, শ্রমিক বাদল মিয়া, ৩৫ বছরের জহিরুল আলম জুরু এবং ২৩ বছরের হাফেজ কাউছার উদ্দিন। এরমধ্যে, হাফেজ কাউছারের গোপনাঙ্গে গুলি করে বীভৎসভাবে মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়।

আর জহিরুল আলমের লাশ গুমের চেষ্টা চালায় প্রশাসন। সুহিলপুরে নিহত যুবক কামাল উদ্দিনের লাশ কুমিল্লায় গুম করে রাখা হয়েছিল, যা তিন দিন পর ৮০ হাজার টাকার বিনিময়ে ফেরত পায় পরিবার।

সেবছরের, রবিবার (২৮ মার্চ) দক্ষিণ পৈরতলায় ২৮ বছরের আশিকুল ইসলাম এবং বিশ্বরোড মোড়ে ১৫ বছরের ছাত্র আল আমিন, ২৪ বছরের কালন মিয়া ও ২৭ বছরের অটোরিকশা চালক লিটন মিয়া গুলিবিদ্ধ হয়ে প্রাণ হারান। সবশেষ মঙ্গলবার (৩০ মার্চ) সুহিলপুরে ১৭ বছরের কিশোর ছাত্র আসাদুল্লাহ রাতিনকে পুলিশ বন্দুকের বাট দিয়ে পিটিয়ে গুরুতর আহত করে। পরবর্তীতে চিকিৎসকদের চরম অবহেলায় বিনা চিকিৎসায় মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন রাতিন।

বিচারের দাবি

স্থানীয় নিহতদের পরিবার স্বৈরাচার শেখ হাসিনা ও তৎকালীন এমপি, এবং যারা এসব নারকীয়তার সাথে যুক্ত, সবার বিচার দেখতে চায় খুব দ্রুত।

অন্যদিকে, হত্যাকাণ্ডের পর উল্টো ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ৭ হাজার নিরীহ মানুষকে আসামি করে ৫৪টি মিথ্যা মামলা দিয়েছিল হাসিনা সরকার। তবে, পটপরিবর্তনের পর সেই মাস্টারমাইন্ডদের বিচার চাইছে স্থানীয়রা।

এ বিষয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার এম এম রকীব উর রাজা জানিয়েছেন, ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর দায়ের করা মামলার আইনি প্রক্রিয়া বর্তমানে চলমান রয়েছে।

বিগত স্বৈরাচারের আমলে ভারতীয় আধিপত্যবাদের কাছে জিম্মি ছিল দেশের প্রতিরক্ষা ও সাধারণ মানুষের জীবন। ৫ বছর আগের সেই বিভীষিকাময় দিনগুলো এখনো ভোলেনি তারা। শুধু এখন ন্যায়বিচারের অপেক্ষা।



banner close
banner close