১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী সময় থেকে এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছেন ১৮ জন। তাদের মধ্যে কেউ কেউ একাধিকবারও রাষ্ট্রপতি হয়েছেন। বর্তমানে সংসদ সদস্যদের দ্বারা পরোক্ষ নির্বাচন পদ্ধতিতে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হলেও ১৯৯১ সালের আগে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হতেন সরাসরি জনগণের ভোটে।
মুজিবনগর সরকারের রাষ্ট্রপতি
যুদ্ধ চলাকালীন ১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল শেখ মুজিবুর রহমানকে রাষ্ট্রপতি করে গঠিত হয় মুজিবনগর সরকার। তিনিই ছিলেন বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি।
২৫ মার্চ গভীর রাতে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাই তার অনুপস্থিতিতে ১৯৭২ সালের ১২ জানুয়ারি পর্যন্ত মুজিবনগর সরকারের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন সৈয়দ নজরুল ইসলাম।
১৯৭২ সালের ১২ জানুয়ারি থেকে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী। তিনিই স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি। বিচারপতি হওয়ার পাশাপাশি তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশের হাইকমিশনার হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন।
মোহাম্মদউল্লাহ ও খন্দকার মোশতাক
১৯৭৩ সালের ২৪ ডিসেম্বর রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী পদত্যাগ করলে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি নিযুক্ত হন মোহাম্মদউল্লাহ। তিনি ১৯৭৪ সালের ২৪ জানুয়ারি অস্থায়ী থেকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়ে ২৭ জানুয়ারি শপথ গ্রহণ করেন। ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি পর্যন্ত তিনি বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন।
শেখ মুজিবুর রহমানের মন্ত্রিসভায় ১৯৭৫ সালের জানুয়ারি মাসে ভূমি প্রশাসন ও ভূমি সংস্কার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব লাভ করেন মোহাম্মদউল্লাহ। শেখ মুজিব নিহত হওয়ার পর তাকে প্রজাতন্ত্রের উপরাষ্ট্রপতি করা হয়।
শেখ মুজিবের মৃত্যুর পর রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন খন্দকার মোশতাক আহমেদ। তিনি ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট থেকে ৬ নভেম্বর পর্যন্ত মাত্র ৮৩ দিন রাষ্ট্রপতি পদে ছিলেন। তিনি ছিলেন অঘোষিত রাষ্ট্রপতি এবং নিজেই নিজেকে রাষ্ট্রপতি হিসেবে ঘোষণা করেন।
আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম ও জিয়াউর রহমান
খন্দকার মোশতাক আহমেদকে ক্ষমতাচ্যুত করার পর আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম ১৯৭৫ সালের ৬ নভেম্বর থেকে রাষ্ট্রপতির আসনে বসেন। ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বরের সামরিক অভ্যুত্থানের পর খালেদ মোশাররফ, শাফায়াত জামিল এবং অভ্যুত্থানকারী কতিপয় সেনা কর্মকর্তার অনুরোধে ৬ নভেম্বর বিচারপতি সায়েমকে দেশের ৬ষ্ঠ রাষ্ট্রপতি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।
রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণের পরই তিনি সংসদ ও মন্ত্রিপরিষদ ভেঙে দিয়ে সারা দেশে সামরিক আইন জারি করেন এবং নিজেকে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক ঘোষণা করেন।
১৯৭৬ সালের ২৯ নভেম্বর তিনি প্রধান সামরিক আইন প্রশাসকের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি নিয়ে সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমানকে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক নিয়োগ করেন। ১৯৭৭ সালের ২১ এপ্রিল তিনি সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমানের হাতে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব দিয়ে অবসর গ্রহণ করেন।
জিয়াউর রহমান ১৯৭৭ সালের ২১ এপ্রিল তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েমের পদত্যাগের পর বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হন। মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি ছিলেন ১ নম্বর সেক্টরের সেক্টর কমান্ডার এবং ব্রিগেড জেড ফোর্সের অধিনায়ক। স্বাধীনতা যুদ্ধে বীরত্বের জন্য তাকে বীর উত্তম উপাধিতে ভূষিত করা হয়।
বিচারপতি আব্দুস সাত্তার ও এরশাদ
জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর বিচারপতি আব্দুস সাত্তার প্রথমে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। সেই সময় তার বয়স ছিল ৭৬ বছর। পরে তিনি ১৯৮১ সালের ১৫ নভেম্বর দেশব্যাপী অনুষ্ঠিত রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ৬৬ শতাংশ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন।
১৯৮২ সালে তিনি শারীরিক অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালনে অপারগতা প্রকাশ করেন। ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ এক সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে জেনারেল এরশাদ রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে তাকে ক্ষমতা থেকে পদচ্যুত করেন এবং নিজেকে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হিসেবে ঘোষণা করেন।
মাত্র কয়েকদিন পরে, তথা ২৭ মার্চ, জেনারেল এরশাদ আ ফ ম আহসান উদ্দিন চৌধুরীকে রাষ্ট্রপতি পদে অভিষিক্ত করেন। তার পুরো নাম আবুল ফজল মোহাম্মদ আহসানউদ্দিন চৌধুরী। তিনি ছিলেন হাইকোর্টের অতিরিক্ত বিচারপতি ও সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের বিচারপতি। ১৯৮৩ সালের ১১ ডিসেম্বর এরশাদের চাপে পদত্যাগ করেন এবং রাষ্ট্রপতি পদে অধিষ্ঠিত হন সামরিক শাসক এরশাদ।
রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব নেন সাবেক সেনাপ্রধান হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ এবং সামরিক শাসন জারির মাধ্যমে দেশ শাসন করেন। ১৯৮৬ সালে তিনি জাতীয় পার্টি প্রতিষ্ঠা করেন এবং এই দলের মনোনয়ন নিয়ে ১৯৮৬ সালে পাঁচ বছরের জন্য দেশের রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। বিরোধী দলের আন্দোলনের মুখে রাষ্ট্রপতি ১৯৮৭ সালের ৭ ডিসেম্বর এই সংসদ বাতিল করেন।
১৯৮৮ সালের সাধারণ নির্বাচন সব দল বয়কট করে। এরশাদের স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে দেশের জনগণকে সঙ্গে নিয়ে সব বিরোধী দল সম্মিলিতভাবে আন্দোলনের মাধ্যমে তাকে ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর ক্ষমতা থেকে অপসারণ করা হয়।
সাহাবুদ্দিন আহমেদ থেকে ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ
আন্দোলনের মুখে এইচ এম এরশাদ পদত্যাগ করার পর ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর থেকে ১৯৯১ সালের ৯ অক্টোবর পর্যন্ত বাংলাদেশের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন তৎকালীন প্রধান বিচারপতি সাহাবুদ্দিন আহমেদ। তিনি একটি নির্বাচনের মাধ্যমে জয়ী রাজনৈতিক দল বিএনপির কাছে রাষ্ট্রক্ষমতা হস্তান্তর করে ১৯৯১ সালে আবার প্রধান বিচারপতির দায়িত্বে ফিরে যান।
১৯৯১ সালের ১০ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশের ষোড়শ রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন জিয়াউর রহমানের মন্ত্রিসভার সদস্য আবদুর রহমান বিশ্বাস। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের কয়েক মাস পর ৮ অক্টোবর তার দায়িত্বের মেয়াদ শেষ হয়।
১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করার পর সাবেক রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন আহমেদকে আবারও রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করে। সে বছরের ৯ অক্টোবর থেকে ২০০১ সালের ১৪ নভেম্বর পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন বিচারপতি আহমেদ।
২০০১ সালের ১৪ নভেম্বর বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন অধ্যাপক একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরী, যিনি বি. চৌধুরী নামেই সমধিক পরিচিত। ২০০২ সালের ২১ জুন সৃষ্ট এক বিতর্কিত ঘটনার জের ধরে তিনি রাষ্ট্রপতির পদ থেকে পদত্যাগ করতে বাধ্য হন এবং পরবর্তীকালে আরেকটি রাজনৈতিক দল বিকল্প ধারা বাংলাদেশ গঠন করেন।
বি. চৌধুরী পদত্যাগ করার পর নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত, অর্থাৎ ২০০২ সালের ৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত জমির উদ্দিন সরকার ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি পেশায় একজন আইনজীবী ছিলেন এবং দুই দফা বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের স্পিকার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
২০০২ সালের ৬ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা নিয়োগে রাজনৈতিক অচলাবস্থার প্রেক্ষাপটে ২০০৬ সালের ২৯ অক্টোবর রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ প্রধান উপদেষ্টার অতিরিক্ত দায়িত্ব গ্রহণ করেন। কিন্তু সংসদীয় নির্বাচন নিয়ে অব্যাহত রাজনৈতিক অচলাবস্থার প্রেক্ষাপটে তিনি ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি উপদেষ্টার পদ থেকে ইস্তফা দেন এবং দেশে জরুরি অবস্থা জারি করেন।
আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর ২০০৯ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ রাষ্ট্রপতির পদ থেকে বিদায় নেন।
জিল্লুর রহমান ও আবদুল হামিদ
২০০৯ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি জিল্লুর রহমান গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের ১৯তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন। ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি দেশে জরুরি আইন জারির পর ১৬ জুলাই রাতে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভানেত্রী শেখ হাসিনা গ্রেপ্তার হন। সেই সময়ে দলের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হিসেবে জিল্লুর রহমান দল পরিচালনা করেন।
সিঙ্গাপুরে মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ২০১৩ সালের ২০ মার্চ তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমানের অসুস্থতাজনিত কারণে তার মৃত্যুর ছয় দিন পূর্বেই ২০১৩ সালের ১৪ মার্চ তৎকালীন স্পিকার আবদুল হামিদ বাংলাদেশের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হিসেবে ২০তম রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তিনি দ্বিতীয়বারের মতো বাংলাদেশের ২১তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন
দেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিনকে মনোনয়ন দেয় আওয়ামী লীগ। বঙ্গভবনে ২০২৩ সালের ২৪ এপ্রিল তাকে শপথবাক্য পাঠ করান জাতীয় সংসদের স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী।
২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন ব্যাপক চাপের মধ্যে পড়েন। ২০২৬ সালের ২৪ জুলাই তিনি পদত্যাগ করেন।
আরও পড়ুন:








