বুধবার

১২ আগস্ট, ২০২৬ ২৮ শ্রাবণ, ১৪৩৩

সেই পুরোনো বৃত্তেই এখনো ঘুরছে পুলিশ

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ১২ আগস্ট, ২০২৬ ০৮:৪৪

শেয়ার

সেই পুরোনো বৃত্তেই এখনো ঘুরছে পুলিশ
ছবি এআই মাধ্যমে তৈরি

আওয়ামী লীগের শাসনামলে পুলিশের নিয়োগ থেকে শুরু করে পদোন্নতি, বদলি ও মাঠপর্যায়ে দায়িত্ব পালন—সব ক্ষেত্রেই নানা বিতর্ক ছিল। পুলিশের হাতে সাধারণ মানুষ ও বিরোধী দলের অসংখ্য নেতাকর্মী হয়রানির শিকার হওয়ার অভিযোগও ছিল অহরহ। বাহিনীর কিছু সদস্য ডাকাতি, ছিনতাই ও মাদক দিয়ে নির্দোষ মানুষকে ফাঁসানোসহ নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়েছিলেন। সে সময় পুলিশের একটি বড় অংশ ক্ষমতাসীন দলের ক্যাডারের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিল।

ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর পুলিশকে ঢেলে সাজানো হয়েছে এবং নেতৃত্বেও পরিবর্তন আনা হয়েছে। বিভিন্ন অপরাধে অনেক পুলিশ কর্মকর্তাকে গ্রেপ্তারও করা হয়েছে। কিন্তু এত কিছুর পরও প্রশ্ন উঠেছে, কতটা বদলেছে পুলিশ?

অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন, পুলিশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির জায়গাটি আগের মতোই রয়ে গেছে। ফলে সবকিছু হচ্ছে ক্ষমতাসীনদের ইচ্ছায়। অভ্যন্তরীণ প্রশাসনিক বিষয়গুলোতেও কোনো পরিবর্তন আসেনি। এখনো অনেক সদস্যের মধ্যে অপরাধমূলক মানসিকতা রয়ে গেছে।

পুলিশ নিজে নিজে পরিবর্তিত হবে না উল্লেখ করে বিশ্লেষকরা বলছেন, একটি বাহিনী তার কিছু কর্মকর্তা বা সদস্যের জন্য দীর্ঘ সময় ধরে বিতর্কিত হয়েছে। তারা ক্ষমতা ও পরিচয় ব্যবহার করে লাভবান হয়েছেন এবং বাহিনীকে রাজনীতিকরণ করেছেন। এই অবস্থা থেকে তারা নিজে নিজে ভালো হয়ে যাবে—এমন প্রত্যাশা টেকসই নয়। বরং পুলিশকে ভালো করতে হলে প্রয়োজনীয় নীতিগত ও আইনি সংস্কার করতে হবে। কাঠামোগত পরিবর্তনের মধ্য দিয়েই তাদের কর্মকাণ্ডে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি আসবে।

রাজনীতিকরণে মৌলিক পরিবর্তন নেই

মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি বিভাগের অধ্যাপক মো. ওমর ফারুক বলেন, রাজনীতিকরণের জায়গা থেকে পুলিশ ন্যূনতম বদলায়নি। এ বাহিনীতে এখনো কোনো মৌলিক পরিবর্তন দেখতে পাচ্ছি না এবং এ বিষয়ে দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগও নেই।

তিনি আরও বলেন, মামলা ও জিডি নেওয়ার ক্ষেত্রে কিছু কিছু জায়গায় এখনো কিছুটা কঠোর মনোভাব আছে। তবে জনগণের প্রতি তাদের দৃষ্টিভঙ্গি আগের ঔপনিবেশিক মানসিকতার চেয়ে কিছুটা নমনীয় হয়েছে। কিন্তু ভেতরের প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা আগের মতোই চলছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেন, পুলিশ এখনো পুরোনো ধাঁচে চলার মানসিকতায় রয়েছে। জুলাই আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে তাদের কাছ থেকে যে পরিবর্তন বা সংস্কারের প্রত্যাশা ছিল, তা তারা পরিপূর্ণ মাত্রায় দৃশ্যমান করতে পারেনি।

তিনি বলেন, যে আইন বা বিধিমালার মাধ্যমে পুলিশ পরিচালিত হয়, সেটির পরিবর্তন সবার আগে জরুরি। পুলিশ এখনো ১৮৬১ সালের পুরোনো আইন দিয়ে পরিচালিত হচ্ছে। একটি স্বাধীন আইন প্রয়োজন। একটি পেশাদার বাহিনী গড়ে তোলার জন্য চাকরির ধরন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। পুলিশ কখনো সরকারের অন্ধ নির্দেশে কাজ করবে না; বরং সরকারের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করবে। এসব বিষয় নিশ্চিত না করে পুলিশ নিজে নিজে বদলে যাবে—এমন প্রত্যাশা করা ভুল।

দলীয় আনুগত্যে পদায়নের অভিযোগ

সূত্র জানায়, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ছাত্রজীবনে ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকা পুলিশ কর্মকর্তারা বাড়তি সুবিধা পেতেন। পক্ষান্তরে বিএনপি-জামায়াত সমর্থক কর্মকর্তাদের ডাম্পিং পোস্টিং, বছরের পর বছর পদোন্নতি আটকে রাখা কিংবা বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানোর মতো বিতর্কিত কর্মকাণ্ড ছিল ওপেন সিক্রেট। পুলিশের গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়নে ঘুসবাণিজ্য চলত। দলীয় সমর্থক ছাড়া গুরুত্বপূর্ণ ইউনিটে পদায়ন দেওয়া হতো না।

আওয়ামী লীগ আমলে চরম বঞ্চনার শিকার এবং বর্তমানে হাইওয়ে পুলিশের অতিরিক্ত আইজিপি ফারুক আহম্মেদ বলেন, আওয়ামী লীগ আমলে দলীয় অনুগত ছাড়া কোনো পুলিশ কর্মকর্তাকে গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়ন করা হয়নি। ভুলবশত ভেটিং পার হয়ে কেউ চলে গেলেও তাকে সঙ্গে সঙ্গে প্রত্যাহার করে নেওয়া হতো। অথবা মোটা অঙ্কের টাকা দিয়ে কাউকে ভালো পদে যেতে হতো।

তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে পুলিশের একজন এসপি বলেন, আগেও জেলার এসপি, রেঞ্জের ডিআইজিসহ গুরুত্বপূর্ণ ইউনিটে পদায়নে দলীয় আনুগত্যকে প্রাধান্য দেওয়া হতো। এখনো সেভাবেই চলছে। মাঝখান দিয়ে অনেক দক্ষ কর্মকর্তা বঞ্চিত হচ্ছেন।

বদলিবাণিজ্যের অভিযোগ

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এত কিছুর পরও পুলিশের কোনো মৌলিক পরিবর্তন হয়নি; বরং অনেক ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। আগের মতোই চলছে বদলিবাণিজ্য। সম্প্রতি পুলিশ মহাপরিদর্শকের (আইজিপি) নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা এক বডিগার্ডের বদলিবাণিজ্য সংক্রান্ত একটি গোপন অডিও রেকর্ড ফাঁস হওয়ায় ভাবমূর্তি সংকটে পড়েছে পুলিশ। বদলিবাণিজ্যের নানা গল্প এখন পুলিশ সদস্যদের মুখেই ঘুরপাক খাচ্ছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একাধিক অডিও রেকর্ডের তথ্য বলছে, টাকার বিনিময়ে পুলিশে বদলি হচ্ছে এবং এ ক্ষেত্রে সক্রিয় রয়েছে একাধিক সিন্ডিকেট। এছাড়া আগের মতোই রাজনৈতিক বিবেচনায় গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়ন হচ্ছে এবং বিরোধীদের দমনে পুলিশকে ব্যবহার করা হচ্ছে।

দুর্নীতি ও অপরাধে জড়ানোর অভিযোগ

সম্প্রতি পুলিশের বেশ কিছু আর্থিক দুর্নীতির অডিও ফাঁস হওয়া নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা চলছে। এছাড়া ডাকাতির মতো গুরুতর অপরাধেও জড়িয়ে পড়ার অভিযোগ উঠেছে।

খুলনার শিরোমণি এলাকায় ২০২৬ সালের ৬ জুলাই রাত আড়াইটার দিকে একটি ভয়াবহ ডাকাতির ঘটনা ঘটে। সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, ৭-৮ জন মুখোশধারী ব্যক্তি ধারালো অস্ত্র হাতে একটি বাড়িতে ঢুকে বাসিন্দাদের মারধর করে স্বর্ণালংকারসহ মূল্যবান জিনিসপত্র লুট করে নিয়ে যায়। এ ঘটনায় মামলা হওয়ার পর পুলিশ লাইন্সে কর্মরত কনস্টেবল রবিউলকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং বিভিন্ন আলামত জব্দ করা হয়।

২০২৫ সালের শেষের দিকে রাজশাহীতে এক উপপরিদর্শকের (এসআই) ঘুস লেনদেনের অডিও ফাঁস হয়। পরে জানা যায়, তিনি রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশের এসআই মো. মহিউদ্দিন। তার ঘুস লেনদেন ও ভাগাভাগির কয়েকটি অডিও ক্লিপ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। সেখানে তাকে ঘুসের টাকা সিনিয়র কর্মকর্তাদের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়ার কথা স্বীকার করতে শোনা যায়।

২০২৬ সালের মে মাসের শেষ দিকে নেত্রকোনার কলমাকান্দা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আবুল হাশেমের বক্তব্যের একটি অডিও রেকর্ড ছড়িয়ে পড়ার পর ব্যাপক সমালোচনা সৃষ্টি হয়। পরে তাকে প্রত্যাহার করা হয়। অডিওতে পুলিশের চাকরিকে এক ধরনের ব্যবসা হিসেবে উল্লেখ করে কাউকে কাউকে না ঠকানোর কথা বলতে শোনা যায়।

থানায় মামলা না নেওয়ার অভিযোগ

আওয়ামী লীগ আমলের মতো এখনো অনেক ভুক্তভোগী থানায় গিয়ে মামলা করতে পারছেন না বলে অভিযোগ রয়েছে। ২০২৫ সালের ১৮ মে ভোর সাড়ে ৫টার দিকে রাজধানীর মগবাজার গ্রিনওয়ে গলিতে তিন ছিনতাইকারী চাপাতি হাতে প্রকাশ্যে ছিনতাই করে। ভুক্তভোগী মো. আবদুল্লাহ বলেন, ছিনতাইকারীর হামলায় আহত অবস্থায় ভোর ৬টার দিকে হাতিরঝিল থানায় গিয়ে ক্ষতচিহ্ন দেখালেও পুলিশ মামলা নেয়নি। পরবর্তীতে ভিডিওটি ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়লে কয়েক দিন পর থানা পুলিশ মামলা নেয় এবং আসামিদের গ্রেপ্তার করে।

প্রভাবশালীদের সঙ্গে পুলিশের সখ্যতায় অসহায় ভুক্তভোগীরাও ন্যায়বিচার পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ রয়েছে। মাসদুয়েক আগে রাজধানীর পল্লবী থানায় কতিপয় সন্ত্রাসীর বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছিলেন মোছা. হোসনে আরা নামে এক গৃহিণী। তবে পুলিশ কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। থানায় অভিযোগ করায় সন্ত্রাসীরা ক্ষিপ্ত হয়ে তার ওপর ফের হামলা চালায়।

তিনি বলেন, বিএনপি নামধারী সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে থানায় অভিযোগ করেছিলেন, কিন্তু তারা প্রভাবশালী হওয়ায় পুলিশ ব্যবস্থা নেয়নি। তাদের বিচার আল্লাহ করবেন।

পুলিশের দাবি, আচরণে পরিবর্তন এসেছে

এ বিষয়ে পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত আইজিপি (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) খোন্দকার রফিকুল ইসলাম বলেন, পুলিশের দৃষ্টিভঙ্গি ও আচরণে নজরকাড়া পরিবর্তন এসেছে। আগে যেমন ইচ্ছা হলেই মাত্রাতিরিক্ত বলপ্রয়োগ, যথেচ্ছ গ্রেপ্তার কিংবা গুমের নাটক সাজানো হতো। এগুলো থেকে পুলিশ এখন পুরোপুরি সরে এসেছে।

তিনি আরও বলেন, ন্যূনতম বলপ্রয়োগ করে কীভাবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা যায়, সে বিষয়ে পুলিশ সদস্যদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। তবে এর ফলে অনেকেই প্রশ্ন তোলেন, পুলিশ কেন নিষ্ক্রিয়। কারণ, সাধারণ মানুষের ধারণা, পুলিশ ধুমধাম মারপিট করবে, সবাইকে পিটিয়ে ছত্রভঙ্গ করে দেবে, তবেই তাদের অ্যাকশন ঠিক আছে।



banner close
banner close