প্রতিবছর রাজধানীর ভূগর্ভস্থ পানির স্তর যে হারে নিচে নামছে, সে তুলনায় ভূগর্ভে পানির পুনর্ভরণ বা রিচার্জ হচ্ছে না। ফলে ক্রমেই কমছে রাজধানীর ভূগর্ভস্থ পানির মজুদ।
ঢাকা ওয়াসার তথ্য অনুযায়ী, ২০০১ সালে রাজধানীর ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ছিল ভূপৃষ্ঠের প্রায় ৩৯ দশমিক ৬ মিটার নিচে। ২০২৪ সালে তা নেমে দাঁড়ায় প্রায় ১০৬ মিটার নিচে। আর ২০২৬ সালে রাজধানীর কোনো কোনো এলাকায় পানির স্তর আরও নিচে নেমেছে। ঢাকা ওয়াসাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, প্রতিবছর গড়ে দুই থেকে তিন মিটার করে পানির স্তর নিচে নামছে।
বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, ভূগর্ভস্থ পানির ওপর এভাবে নির্ভরতা অব্যাহত থাকলে রাজধানীর পানিসংকট ভবিষ্যতে আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে।
ঢাকা ওয়াসার তথ্য অনুযায়ী, ২০০২ সালে রাজধানীর ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ছিল ৪৫ দশমিক ৬ মিটার, ২০০৩ সালে ৪৮ মিটার, ২০০৪ সালে ৫১ মিটার, ২০০৫ সালে ৫৪ দশমিক ২ মিটার, ২০০৬ সালে ৫৭ মিটার এবং ২০০৭ সালে ৬০ মিটার নিচে। এরপরও একই প্রবণতা অব্যাহত রয়েছে। ২০২০ সালে পানির স্তর দাঁড়ায় ৯৯ মিটার, ২০২১ সালে ১০২ দশমিক ৮০ মিটার, ২০২২ সালে ১০৪ দশমিক ৮০ মিটার, ২০২৩ সালে ১০৬ দশমিক ৮ মিটার এবং ২০২৪ সালে প্রায় ১০৬ মিটার নিচে।
চলতি বছর, অর্থাৎ ২০২৬ সালে, তা প্রায় ১১২ মিটারে পৌঁছেছে।
কিছু এলাকায় পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক
রাজধানীর কিছু এলাকায় পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক। ঢাকা ওয়াসার চলতি বছরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, মিরপুরের কিছু এলাকা, পূর্ব মনিপুর ও শাহজাদপুরের কিছু এলাকায় পানির স্তর ছয় থেকে সাত ফুট পর্যন্ত নেমে গেছে। ঢাকা ওয়াসা বলছে, এমন পরিস্থিতি অন্য এলাকাতেও দেখা দিতে পারে। এর ফলে শুষ্ক মৌসুমে রাজধানীতে তীব্র পানিসংকটের আশঙ্কা রয়েছে।
বর্তমানে ঢাকা ওয়াসার পানির প্রায় ৭০ শতাংশ আসে ভূগর্ভস্থ উৎস থেকে। বাকি ৩০ শতাংশ আসে ভূ-উপরিস্থ উৎস থেকে।
রাজধানীর পানি ও পয়োবর্জ্য ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকা সংস্থাটির অধীন এলাকার আয়তন প্রায় ৪০১ বর্গকিলোমিটার। আবাসিক ও বাণিজ্যিক পানির সংযোগ রয়েছে প্রায় চার লাখ ছয় হাজার। রাজধানীতে দৈনিক পানির চাহিদা ২৮০ থেকে ২৯০ কোটি লিটার। ঢাকা ওয়াসার দাবি, তাদের দৈনিক উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ৩২০ কোটি লিটার। এর পরও প্রতিবছর শুষ্ক মৌসুমে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় তীব্র পানিসংকট দেখা দেয়।
জানা গেছে, বর্তমানে ঢাকা ওয়াসা পাঁচটি পানি শোধনাগার থেকে দৈনিক প্রায় ৯০ কোটি লিটার পানি এবং এক হাজার ৩২৮টি গভীর নলকূপের মাধ্যমে প্রায় ২২০ কোটি লিটার পানি সংগ্রহ করে। অর্থাৎ ভূগর্ভস্থ পানির ওপরই এখনো রাজধানীর পানি সরবরাহের বড় অংশ নির্ভরশীল।
সম্প্রতি মিরপুর এলাকায় পানি সরবরাহ করতে হিমশিম খাচ্ছে ঢাকা ওয়াসা। মিরপুর-১০, মিরপুর-১১, কল্যাণপুর, পূর্ব মনিপুর ও পীরেরবাগ এলাকায় পানির সংকট রয়েছে। কোথাও দিনে অল্প সময়ের জন্য পানি এলেও তা অনিয়মিত।
ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. আমিনুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, প্রতিবছরের মতো এবারও রাজধানীতে দুই থেকে তিন ফুট পানির স্তর নিচে নেমেছে। তবে কিছু এলাকায় পানির স্তর স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি নেমে গেছে, যা উদ্বেগজনক। ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়া পরিবেশের জন্য নেতিবাচক। শুষ্ক মৌসুমে এর কারণে তীব্র পানিসংকট হতে পারে।
তিনি বলেন, নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের গন্ধর্বপুর পানি শোধনাগার প্রকল্প দ্রুত চালু করা গেলে দিনে ৫০ কোটি লিটার বিশুদ্ধ পানি রাজধানীতে সরবরাহ করা সম্ভব হবে। এতে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ কমানো যাবে এবং নগরীর পানি সরবরাহ পরিস্থিতিরও উন্নতি হতে পারে।
ভূমিধসের ঝুঁকি নিয়ে গবেষণার পরামর্শ
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে যাওয়ার কারণে ভূমিধসের ঝুঁকি রয়েছে কি না, এ বিষয়ে এখনো সুনির্দিষ্ট গবেষণা হয়নি। তবে বিশেষজ্ঞরা বিষয়টি নিয়ে মনোযোগ দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। তাঁদের মতে, এ বিষয়ে গবেষণা হওয়া জরুরি।
ঢাকা ওয়াসা সূত্র জানিয়েছে, ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা কমাতে সরকার ও ঢাকা ওয়াসা ইতিমধ্যে ভূ-উপরিস্থ উৎস থেকে পানি উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে। ২০৩০ সালের মধ্যে ঢাকা ওয়াসার মোট পানি উৎপাদনের ৮০ শতাংশ ভূ-উপরিস্থ উৎস থেকে সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নেওয়া হয়েছে।
এ লক্ষ্যে সায়েদাবাদ পানি শোধনাগার ফেজ-৩ ও পদ্মা পানি শোধনাগার ফেজ-২ চালুর কাজ চলছে। একই সঙ্গে রূপগঞ্জের গন্ধর্বপুর পানি শোধনাগারের পানি দ্রুত রাজধানীতে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রকল্পটি চালু হলে দৈনিক আরও ৫০ কোটি লিটার বিশুদ্ধ পানি রাজধানীতে সরবরাহ করা সম্ভব হবে।
পানি ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়া অবশ্যই নেতিবাচক ঘটনা। পৃথিবীর যেসব শহরে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ব্যাপকভাবে নেমে গেছে, সেসব শহর এখন পানির স্তর পুনর্ভরণের উদ্যোগ নিয়েছে। জাকার্তা ও মেক্সিকো সিটিতে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর পুনর্ভরণে বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
ভূগর্ভস্থ পানির স্তর কমে যাওয়ার কারণে ভূমিধস বা শহর দেবে যাওয়ার আশঙ্কা থাকলেও রাজধানীর ক্ষেত্রে এ ধরনের কোনো সুনির্দিষ্ট গবেষণালব্ধ প্রমাণ নেই। তবে বিশ্বের বিভিন্ন শহরে অতিরিক্ত ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনের কারণে ভূমিধসের ঘটনা ঘটেছে। এ ক্ষেত্রে মেক্সিকো সিটি, ইতালির মিলান, যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস ও জাপানের বিভিন্ন এলাকার উদাহরণ সামনে আসে।
রিচার্জের চেয়ে বেশি পানি উত্তোলন
ভূগর্ভস্থ পানি গবেষক ও বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) সাবেক পরিচালক ড. আনোয়ার জাহিদ কালের কণ্ঠকে বলেন, রাজধানীর ভূগর্ভস্থ পানির মজুদ ক্রমেই কমে যাচ্ছে। ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা অব্যাহত থাকলে পানির স্তর আরও দ্রুত নিচে নেমে যাবে। শিল্প-কারখানায় ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার বাড়লে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে। এটি রাজধানীর জন্য বড় ধরনের সংকট তৈরি করতে পারে।
ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে যাওয়ার মূল কারণ হিসেবে তিনি বলেন, প্রতিবছর বৃষ্টি, নদী-নালা ও অন্যান্য উৎস থেকে ভূগর্ভস্থ পানিতে যে পরিমাণ পানি যুক্ত হয় বা রিচার্জ হয়, তার চেয়ে বেশি পানি উত্তোলন করা হচ্ছে। রাজধানীতে ভূগর্ভস্থ পানির চাহিদা বেশি হওয়ায় প্রতিবছর যতটা পানি রিচার্জ হয়, তার চেয়ে অনেক বেশি পানি উত্তোলন করা হচ্ছে। ফলে পানির স্তর ক্রমাগত নিচে নামছে এবং ভূগর্ভস্থ পানির মজুদ কমে যাচ্ছে।
ড. আনোয়ার জাহিদ বলেন, পানি ব্যবস্থাপনার বিষয়ে নীতিমালা ও পরিকল্পনা রয়েছে। ওয়াটার অ্যাক্টেও এ বিষয়ে নির্দেশনা আছে। কিন্তু এসব নীতিমালা ও পরিকল্পনার যথাযথ বাস্তবায়ন হচ্ছে না। ফলে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে রাজধানীর পানির সংকট আরও গভীর হচ্ছে।
আরও পড়ুন:








