মঙ্গলবার

১১ আগস্ট, ২০২৬ ২৭ শ্রাবণ, ১৪৩৩

চাকরি হারাচ্ছেন ‘গুলি করি, মরে একটা’ বলা সেই পুলিশ কর্মকর্তা

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ১১ আগস্ট, ২০২৬ ১৯:৪৩

শেয়ার

চাকরি হারাচ্ছেন ‘গুলি করি, মরে একটা’ বলা সেই পুলিশ কর্মকর্তা
ছবি সংগৃহীত

গুলি করি, মরে একটা, আহত হয় একটা-ভাইরাল হওয়া এমন বক্তব্যের আলোচিত পুলিশ কর্মকর্তা মো. ইকবাল হোসাইনের বিরুদ্ধে চাকরি থেকে বরখাস্তের প্রক্রিয়া চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকার অভিযোগে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) ওয়ারী বিভাগের সাবেক এই উপকমিশনারকে বরখাস্তের প্রজ্ঞাপন শিগগিরই জারি হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

বর্তমানে খুলনা রেঞ্জ ডিআইজি কার্যালয়ে সংযুক্ত ইকবাল হোসাইন কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া ২০২৪ সালের ২৮ আগস্ট থেকে কর্মস্থলে অনুপস্থিত রয়েছেন। এ ঘটনায় তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা হয়। তদন্ত শেষে তার বিরুদ্ধে অসদাচরণ ও পলায়নের অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে বলে মতামত দেওয়া হয়েছে।

গণমাধ্যমের হাতে আসা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট নথি অনুযায়ী, অভিযোগের বিষয়ে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হলেও ইকবাল হোসাইন কোনো জবাব দেননি। পরে তদন্তকারী কর্মকর্তা নিয়োগ করে অভিযোগ তদন্ত করা হয়। তদন্ত প্রতিবেদনে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার পর চাকরি থেকে বরখাস্ত করার গুরুদণ্ড আরোপের প্রাথমিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

এ সিদ্ধান্তের বিষয়ে তাকে দ্বিতীয় দফায় কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হলেও তিনি কোনো জবাব দেননি। পরে তদন্ত প্রতিবেদন, অভিযোগের গুরুত্বসহ সংশ্লিষ্ট বিষয় পর্যালোচনা করে চাকরি থেকে বরখাস্ত করার সিদ্ধান্ত বহাল রাখা হয়।

গুরুদণ্ড আরোপের বিষয়ে সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮ এবং বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশন (পরামর্শকরণ) রেগুলেশনস, ১৯৭৯ অনুযায়ী বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনের পরামর্শ চাওয়া হয়। কমিশন ইকবাল হোসাইনকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা যেতে পারে বলে পরামর্শ দেয়। এরপর বিধিমালা অনুযায়ী নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষ হিসেবে রাষ্ট্রপতির অনুমোদনের জন্য বিষয়টি উপস্থাপন করা হয়েছে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট নথিতে ইকবাল হোসাইনসহ পাঁচ পুলিশ কর্মকর্তার চাকরি থেকে বরখাস্ত করার গুরুদণ্ড অনুমোদনের প্রক্রিয়ার উল্লেখ রয়েছে। রাষ্ট্রপতির অনুমোদন পাওয়ার পর এ-সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করা হবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

ইকবাল হোসাইন ছাড়া অপর চার পুলিশ কর্মকর্তা হলেন ডিএমপির সাবেক যুগ্ম কমিশনার বিপ্লব কুমার সরকার, যিনি বর্তমানে সাময়িক বরখাস্ত হয়ে বরিশাল রেঞ্জ ডিআইজি কার্যালয়ে সংযুক্ত; মো. গোলাম রুহানী, সাবেক ছাত্রলীগ সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানীর ছোট ভাই, যিনি বর্তমানে সাময়িক বরখাস্ত ও পলাতক; সুদীপ কুমার চক্রবর্তী, যিনি সাময়িক বরখাস্ত হয়ে বরিশাল রেঞ্জ ডিআইজির কার্যালয়ে সংযুক্ত; এবং রাজন কুমার দাস, যিনি সাময়িক বরখাস্ত ও পলাতক।

যে বক্তব্যে আলোচনায় আসেন ইকবাল

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময় তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের সঙ্গে ইকবাল হোসাইনের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়। ৪৩ সেকেন্ডের ওই ভিডিওতে তাকে তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে আন্দোলনকারীদের ওপর গুলি চালানোর বিষয়ে কথা বলতে শোনা যায়।

ভিডিওতে ইকবাল হোসাইন বলেন, ‘গুলি করে করে লাশ নামানো লাগছে স্যার। গুলি করি, মরে একটা, আহত হয় একটা। একটাই যায় স্যার, বাকিডি যায় না। এইটা হলো স্যার সবচেয়ে বড় আতঙ্কের এবং দুশ্চিন্তার বিষয়।’

ভিডিওতে দেখা যায়, তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে ঘিরে পুলিশের মহাপরিদর্শক চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন ও স্বরাষ্ট্রসচিব জাহাঙ্গীর আলম দাঁড়িয়ে আছেন। তাদের সামনে ইকবাল হোসাইন সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে মুঠোফোনে একটি ভিডিও দেখাচ্ছেন। এ সময়ই তিনি ওই মন্তব্য করেন।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালেও মামলা

ইকবাল হোসাইনের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালেও গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলা চলছে। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে যাত্রাবাড়ীর কাজলা এলাকায় পুলিশ কর্মকর্তা ও শিক্ষার্থী ইমাম হাসান তাইমকে গুলি করে হত্যার ঘটনায় তাকে মামলার অন্যতম আসামি করা হয়েছে।

প্রসিকিউশনের অভিযোগ, ২০২৪ সালের ২০ জুলাই যাত্রাবাড়ীর কাজলা এলাকায় ডিএমপির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নির্দেশে খুব কাছ থেকে গুলি চালিয়ে তাইমকে হত্যা করা হয়। তাকে বাঁচাতে এগিয়ে এলে তার বন্ধু রাহাতকেও গুলি করা হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

রাষ্ট্রপক্ষের অভিযোগে ইকবাল হোসাইনের বিরুদ্ধে হত্যার নির্দেশ, উসকানি ও প্ররোচনাসহ মানবতাবিরোধী অপরাধে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ আনা হয়েছে।

এ মামলায় সাবেক ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমানসহ ১১ জনের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর নির্দেশ দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। মামলায় ইকবাল হোসাইন অন্যতম প্রধান আসামি। বর্তমানে মামলাটির বিচারিক কার্যক্রম ও যুক্তিতর্ক ট্রাইব্যুনালে চলমান রয়েছে।



banner close
banner close