রবিবার

৯ আগস্ট, ২০২৬ ২৫ শ্রাবণ, ১৪৩৩

হাসিনা কাউকে বিশ্বাস করতেন না, ফোনে নজরদারি চলত

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ৯ আগস্ট, ২০২৬ ২০:৪৯

শেয়ার

হাসিনা কাউকে বিশ্বাস করতেন না, ফোনে নজরদারি চলত
ছবি সংগৃহীত

ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দলের বা সরকারের গুরুত্বপূর্ণ কোনো ব্যক্তি বা পদধারীকে বিশ্বাস করতেন না বলে দাবি করেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন। এ কারণে ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টারের (এনটিএমসি) মাধ্যমে বিভিন্ন ব্যক্তির ফোনকল রেকর্ড করিয়ে তিনি নিজেই সেগুলো মনিটরিং ও নজরদারি করতেন বলে দাবি করা হয়েছে।

প্রসিকিউশনের দাবি, শেখ হাসিনা এনটিএমসির প্রধান হিসেবে মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসানকে নিয়োগ দিয়েছিলেন। তার মাধ্যমে ফোনকলগুলো রেকর্ড করা হতো।

রবিবার (৯ আগস্ট) বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এ একটি মামলায় যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের সময় এসব কথা বলেন প্রসিকিউটর গাজী এমএইচ তামিম।

জুলাই গণঅভ্যুত্থানে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ শীর্ষ সাত নেতার বিরুদ্ধে তৃতীয় দিনের মতো রবিবার যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষ করেছে প্রসিকিউশন।

ট্রাইব্যুনালে ১৪টি কথোপকথন

যুক্তিতর্কে গাজী এমএইচ তামিম জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার আন্দোলন দমনে কোথায় কী ধরনের বৈঠক ও যোগাযোগ হয়েছিল, তার বিভিন্ন দিক ট্রাইব্যুনালে তুলে ধরেন। এ সময় ওবায়দুল কাদেরের সঙ্গে সাবেক আইসিটি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক এবং যুবলীগের সভাপতি শেখ ফজলে শামস পরশের পৃথক দুটি ফোনালাপ ট্রাইব্যুনালে বাজিয়ে শোনানো হয়। পাশাপাশি আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের শীর্ষ নেতাদের বেশ কয়েকটি কথোপকথনের উদ্ধৃতিও তুলে ধরেন প্রসিকিউটর।

গাজী এমএইচ তামিম বলেন, ট্রাইব্যুনালে ১৪টি কথোপকথন উপস্থাপন করা হয়েছে। শুরুতেই ওবায়দুল কাদের ও জুনাইদ আহমেদ পলকের একটি কথোপকথন শোনানো হয়, যা এরই মধ্যে ট্রাইব্যুনালে দালিলিক প্রমাণ হিসেবে গৃহীত হয়েছে।

প্রসিকিউটরের দাবি, ওই কথোপকথনে উঠে এসেছে, ২০২৪ সালের ১৬ জুলাই ইন্টারনেট সেবা সীমিত করার নির্দেশ দেন ওবায়দুল কাদের। পরে শেখ হাসিনার অনুমোদন নিয়ে তা কার্যকর করেন পলক।

তামিম বলেন, বিষয়টি শুধু কথোপকথনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। ১৬ জুলাই সন্ধ্যা ৬টা থেকে দেশের ৫৯টি বিশ্ববিদ্যালয়ে থ্রি-জি ও ফোর-জি নেটওয়ার্ক বন্ধ করে দেওয়ার নির্দেশনা জারি করেছিল সরকার। আন্দোলন চলাকালে ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ, টিকটকসহ কয়েকটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমও বন্ধ করে দেওয়া হয়। প্রসিকিউশনের ভাষ্য অনুযায়ী, এটি সিস্টেম ক্রাইমের একটি অংশ।

এ ছাড়া জাতিসংঘের প্রতিবেদনের কথা উল্লেখ করে প্রসিকিউটর বলেন, ওই সময় হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে যাওয়া আহত আন্দোলনকারীদেরও গ্রেপ্তার করা হয়েছিল।

আন্দোলনকারীদের ট্যাগ দেওয়ার দাবি

গাজী এমএইচ তামিম বলেন, ওবায়দুল কাদেরের সঙ্গে চট্টগ্রামের তৎকালীন মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীনের কথোপকথনের পরপরই ১৬ জুলাই ওয়াসিমসহ তিনজনকে আওয়ামী লীগের নেতারা গুলি চালিয়ে হত্যা করেন বলে প্রসিকিউশনের দাবি।

এ ছাড়া ওবায়দুল কাদের ও তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাছান মাহমুদের সঙ্গে শেখ হাসিনার কথোপকথনে আন্দোলনকারীদের বিভিন্নভাবে ট্যাগ দেওয়ার বিষয়টি উঠে এসেছে বলে জানান তিনি।

প্রসিকিউটরের ভাষ্য অনুযায়ী, এসব কথোপকথনে আন্দোলনকারীদের সন্ত্রাসী, জঙ্গি, বিএনপি-জামায়াত ও রিলিজিয়াস অ্যাক্টিভিস্ট হিসেবে চিহ্নিত করার বিষয়টি উঠে এসেছে। হাছান মাহমুদ বলেছিলেন, আন্তর্জাতিকভাবে জঙ্গি শব্দটি গুরুত্ব পায়। তাই এ শব্দ ব্যবহার করা হলে আন্তর্জাতিক বিশ্ব তাদের পক্ষে কথা বলবে।

এ সময় শেখ হাসিনার একটি কথোপকথনের উদ্ধৃতি তুলে ধরেন তামিম। সেখানে শেখ হাসিনাকে আন্দোলনকারীদের বাড়িঘর ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে আগুন দেওয়ার নির্দেশনা দিতে শোনা যায় বলে দাবি করেন তিনি।

প্রসিকিউটর জানান, উপস্থাপন করা ১৪টি কথোপকথনই সিআইডির ফরেনসিক পরীক্ষার মাধ্যমে যাচাই করা হয়েছে।

এনটিএমসির মাধ্যমে কল রেকর্ডের দাবি

এনটিএমসির প্রসঙ্গে প্রসিকিউটর তামিম বলেন, শেখ হাসিনার সময়ে চালু করা বিভিন্ন ব্যবস্থার মধ্যে একটি ছিল ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টার। এর প্রধান ছিলেন মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসান। তার মাধ্যমে ফোনকলগুলো রেকর্ড করা হতো বলে দাবি করেন তিনি।

তামিম বলেন, শেখ হাসিনা নিজের ফোনকল এনটিএমসিতে দেননি। তবে অসংখ্য ফোনকল ওই সংস্থার মাধ্যমে পাওয়া গেছে। শেখ হাসিনা যার সঙ্গে কথা বলতেন, তার ফোন নম্বর এনটিএমসিতে ছিল। এ কারণে ওই ব্যক্তি যার সঙ্গেই কথা বলতেন, সেটি রেকর্ড হয়ে যেত। একইভাবে শেখ হাসিনাও যখন এসব ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলেছেন, তখন তার ফোনকলও রেকর্ড হয়েছে বলে দাবি করেন প্রসিকিউটর।

প্রসিকিউটরের দাবি, এমন বহু কল রেকর্ড থেকে দেখা গেছে, জুলাই গণঅভ্যুত্থান চলাকালে আওয়ামী লীগের বিভিন্ন নেতা-কর্মী নিজেদের অধীনস্থদের প্রাণঘাতী অস্ত্র ও হেলিকপ্টার ব্যবহার করে গুলি চালানোর নির্দেশ দিয়েছিলেন।

এ ছাড়া ওবায়দুল কাদের দলের একজন যুগ্ম সাধারণ সম্পাদকের সঙ্গে কথা বলে সারাদেশে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের টাকা দিয়ে আন্দোলন প্রতিহত করা এবং আন্দোলনকারীদের ওপর আক্রমণ করার বিষয়ে আলোচনা করেছিলেন বলেও জানান তামিম। ওই টাকা কোন উৎস থেকে আসবে এবং কীভাবে সংগ্রহ করা হবে, সে বিষয়ে একটি কথোপকথনও ট্রাইব্যুনালে উপস্থাপন করা হয়েছে বলে জানান তিনি।



banner close
banner close