জুলাই-আগস্টের রক্তস্নাত ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের এক জীবন্ত দলিল হয়ে উঠেছে ১১১ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত, ঢাকার শেরেবাংলা নগরে অবস্থিত ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর’। গতানুগতিক কোনো সংগ্রহশালা বা ক্ষমতাশালীদের বন্দনাগার নয় এটি। বরং আপামর মানুষের রক্তে কেনা বিজয়ের এক অবিস্মরণীয় স্মারক। যা আগে ছিলো প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন বা গণভবন।
উদ্বোধন ও উন্মুক্তকরণ
২০২৬ সালের বুধবার (৫ আগস্ট) জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হয় এবং পরের দিন বৃহস্পতিবার (৬ আগস্ট) এটি সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করা হয়। জাদুঘরে পা রাখতেই দর্শনার্থীদের স্বাগত জানায় দেয়ালজুড়ে আঁকা রাজপথের নানা প্রতিবাদী গ্রাফিতি। আর সারি সারি স্থিরচিত্রে মূর্ত হয়ে ওঠে ছাত্র-জনতার উত্তাল আন্দোলন ও তাদের ওপর চালানো নির্মম দমন-পীড়নের ইতিহাস।
এছাড়াও, জাদুঘরের প্রবেশদ্বার ও প্রাথমিক গ্যালারিগুলো সাজানো হয়েছে ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের বীরত্বগাথা, জাতির সূর্য সন্তানদের আত্মত্যাগ এবং পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক খাতের বিভিন্ন ঐতিহাসিক অর্জন নিয়ে।
শহীদদের স্মারক ও স্বৈরাচারের চিহ্ন
কালের কী নির্মম প্রতিশোধ। ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রাখতে স্বৈরাচার শেখ হাসিনা যে বিলাসবহুল খাটে রাত্রিযাপন আর নানা কূটকৌশল বুনতেন, আজ সেখানেই জ্বলজ্বল করছে জুলাই অভ্যুত্থানে শহীদদের নাম। সেই খাটের ওপরেই থরে থরে সাজিয়ে রাখা হয়েছে শহীদদের রক্তমাখা জামা, প্যান্ট ও পরিচয়পত্র।
পাশেই উন্মুক্ত রাখা হয়েছে ক্ষমতাচ্যুত স্বৈরশাসকের ব্যবহৃত সেই আলোচিত ‘লাল টেলিফোন’। দর্শনার্থীরা রিসিভার কানে তুলে শুনছেন সে সময়কার নানা অডিও বার্তা। আর ক্ষোভ আর উপহাসে ফেটে পড়ছেন অনেকেই।
কাঁচের শোকেসে সযত্নে সংরক্ষিত আছে জুলাইয়ের প্রথম শহীদ আবু সাঈদের ১৫ নম্বর এবং শহীদ অসীমের ১৯ নম্বর জার্সি। এছাড়া জাদুঘরের একটি মনিটরে অবিরাম বেজে চলা শহীদ মুগ্ধর সেই হৃদয়বিদারক আর্তি- ‘পানি লাগবে, পানি?’ একইভাবে, সকল শহীদ ও আহতদের বিভিন্ন স্মৃতি এখানে সংরক্ষণ করা হয়েছে যা দেখে, আবেগাপ্লুত হয়ে পড়ছে আগত দর্শনার্থীরা।
তবে, এমন আয়োজনের মাঝেও রয়েছে কিছু অসঙ্গতি। বীর শহীদ আবু সাঈদ ও মুগ্ধর ছবি না থাকা এবং তাদের স্মৃতিচিহ্নগুলোর সঠিক মর্যাদা না দেয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছে অনেক দর্শনার্থী।
সাংবাদিকদের স্মৃতি ও গ্রন্থাগার
অন্যদিকে, আন্দোলনের মাঠে পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে যেসব সংবাদকর্মী প্রাণ হারিয়েছেন বা নিগৃহীত হয়েছেন, বাদ পড়েনি তাদের স্মৃতিচারণও। প্রদর্শনীতে রাখা হয়েছে সাংবাদিকদের ব্যবহৃত ভেঙে যাওয়া নানা সরঞ্জাম ও ক্যামেরা। এছাড়া জুলাই অভ্যুত্থানের ইতিহাস সম্পর্কে বিশদভাবে জানতে জাদুঘরের ভেতরেই গড়ে তোলা হয়েছে একটি বিশেষ গ্রন্থাগার; যেখানে স্থান পেয়েছে গণঅভ্যুত্থানের অজানা ইতিহাস নিয়ে লেখা নানা বই।
ভাস্কর্য ও শিল্পকর্ম
আন্দোলনের নির্মম ও সাহসী মুহূর্তগুলো জীবন্ত হয়ে উঠেছে ভাস্কর্য আর শিল্পকর্মে। শিল্পী তেজস হালদার জসের তৈরি ফাইবার গ্লাস ও ধাতুর ভাস্কর্যে ফুটে উঠেছে, সাভারে পুলিশের এপিসি থেকে শহীদ ইয়ামিনের নিথর দেহ নিচে ফেলে দেয়ার সেই হৃদয়বিদারক দৃশ্য। একই শিল্পীর ছোঁয়ায় মূর্ত হয়েছে ফার্মগেটে গুলিবিদ্ধ শহীদ নাফিজকে বাঁচাতে খুনিদের হুমকি উপেক্ষা করে রিকশাচালক নূর মোহাম্মদের ছুটে চলার সাহসিকতা এবং শহীদ মিনারের সামনে রিকশাচালক সুজনের আইকনিক স্যালুট। এছাড়া, রয়েছে একদল শিক্ষার্থীর কাঁধে লাশ বহনের মর্মস্পর্শী ভাস্কর্য।
তবে, সবচেয়ে হৃদয়বিদারক হলো আনাসের সেই শেষ চিঠি “মা, আমি মিছিলে যাচ্ছি... মৃত্যুর ভয় করে ঘরে বসে না থেকে বীরের মতো মৃত্যুও অধিক শ্রেষ্ঠ।”
এছাড়া ২০০৯ সালের পিলখানা ট্র্যাজেডিতে কান্নারত সেনাদের কফিন বহনের দৃশ্য নিয়ে ফাইবার গ্লাসের ভাস্কর্য তৈরি করেছেন শিল্পী আমিনুল ইসলাম আশিক। আর শেখ হাসিনার ফ্যাসিবাদী শাসনতন্ত্র টিকিয়ে রাখতে যেসব প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছেন, তাদের অপকর্ম নিয়ে অ্যানিমেশন ভিডিওর শৈল্পিক কাজটি করেছেন শিল্পী দেবাশিস চক্রবর্তী।
আয়নাঘর ও গণকবর
শুধু জুলাই অভ্যুত্থানই নয়, জাদুঘরে উঠে এসেছে বিগত ১৫ বছরের গুম-খুন ও ফ্যাসিবাদের ভয়াল চিত্র। ফুটিয়ে তোলা হয়েছে কুখ্যাত ‘আয়নাঘর’-এর প্রতিচ্ছবি, যেখানে ভিন্নমতাবলম্বীদের ধরে নিয়ে চালানো হতো বর্বরোচিত নির্যাতন।
জাদুঘর প্রাঙ্গণেই তৈরি করা হয়েছে একটি প্রতীকী গণকবর, যেখানে খোদাই করে লেখা রয়েছে শহীদদের নাম। এছাড়া আলোকচিত্র ও ভিডিও ফুটেজ প্রদর্শনের মাধ্যমে দর্শনার্থীদের সামনে ভাস্বর হয়ে উঠছে জুলাইয়ের সেই উত্তাল রাজপথের আন্দোলন, মুহুর্মুহু স্লোগান আর পুলিশের নির্মম নির্যাতনের নানা দৃশ্য।
জুলাই জাদুঘর, শুধু একটি প্রদর্শনী নয়, এটি একটি রক্তাক্ত ইতিহাসের জীবন্ত দলিল। দেয়ালে ঝোলানো ছবিগুলোতে স্পষ্ট পুলিশি নিপীড়ন আর বন্দি ছাত্রীর আর্তনাদ। “তুমি কে? আমি কে?” স্লোগানের শিল্পকর্মগুলো যেন সেই উত্তাল দিনগুলোরই প্রতিচ্ছবি। আর কাঁচের বাক্সে সযত্নে সংরক্ষিত শহীদ ফয়সালের জার্সি, গামছা ও টুপি। পাশেই আছে চশমা, জুতো আর মিছিলে ব্যবহৃত সরঞ্জাম। সেই সাথে পহেলা জুলাই থেকে শুরু হওয়া আন্দোলনের দিনপঞ্জি সাজানো আছে দীর্ঘ টাইমলাইনে। এই স্মারকগুলো কেবল বস্তু নয়, যেসব এদেশের অকুতোভয় তরুণদের আত্মত্যাগের অমর গাথা।
দর্শনার্থীদের ভিড় ও নিরাপত্তা
ইতিহাস সংরক্ষণের এই বিশাল আয়োজনে প্রতিদিন স্বতঃস্ফূর্ত ভিড় জমাচ্ছে নানা শ্রেণিপেশার মানুষ। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে যারা জীবন উৎসর্গ করে নতুন বাংলাদেশ গড়েছে, তাদের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা জানাচ্ছে সমগ্র জাতি। পাশাপাশি, ইতিহাসের এই অমর সৃষ্টির সাথে নিজেদের সম্পৃক্ত রাখতে জাদুঘরের এসব স্মৃতিচিহ্ন অনেকেই ক্যামেরাবন্দি করে রাখছে।
১৭ বছরের ফ্যাসিবাদী দুঃশাসনের কথা স্মরণ করে দর্শনার্থীরা বলছে, আগামীতে যেন কেউ আর এমন স্বৈরাচারী হওয়ার দুঃসাহস না দেখায়। সবারই এই অভ্যুত্থান থেকে শিক্ষা নেয়া উচিত।
প্রজন্মের কাছে আত্মত্যাগের এই বার্তা পৌঁছে দিতে অনেকেই সপরিবারে ছুটে আসছে এখানে।
শিশুরা জানছে বিগত স্বৈরশাসনের ইতিহাস, আর এই অভ্যুত্থান থেকে শিখছে অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের ভাষা।
তবে, দর্শনার্থীদের উপচে পড়া ভিড় থাকলেও, জাদুঘরটির নিরাপত্তা ব্যবস্থা একেবারেই অপ্রতুল। নেই পর্যাপ্ত পাহারাদার বা কড়া নজরদারি। ফলে যেকোনো সময় মূল্যবান ও স্পর্শকাতর এসব স্মৃতিচিহ্ন নষ্ট বা হারিয়ে যাওয়ার শঙ্কাও হয়েছে।
এছাড়া আগত দর্শনার্থীদের সুবিধার্থে জাদুঘর প্রাঙ্গণে একটি মসজিদ নির্মাণেরও দাবি উঠেছে।
তবে, সার্বিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা কর্মীরা বলছে, নতুন অবস্থায় অনেকেই নিয়ম মানছে না, সচেতনতা বাড়লেই এই সমস্যার দ্রুত সমাধান সম্ভব।
মো. জাহাঙ্গীর হোসেন, নিরাপত্তা কর্মী, জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর জুলাই গণ-অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর বৃহস্পতিবার বাদে সপ্তাহের বাকি ৬ দিন প্রতিদিন সকাল ১১:০০টা থেকে সন্ধ্যা ৬:০০টা পর্যন্ত খোলা থাকে এবং এর প্রবেশমূল্য প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য ৫০ টাকা এবং শিশুদের জন্য ২৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
হাজারো প্রাণের আত্মত্যাগ আর স্বৈরাচার পতনের এই জীবন্ত দলিল যুগ যুগ ধরে পথ দেখাবে নতুন বাংলাদেশকে, যেন ভবিষ্যতে আর কোনো ফ্যাসিবাদ মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে না পারে এমনটাই প্রত্যাশা সকলের।
আরও পড়ুন:








