রবিবার

৯ আগস্ট, ২০২৬ ২৫ শ্রাবণ, ১৪৩৩

সবে মিলে করি লুট

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ৯ আগস্ট, ২০২৬ ০৮:০৬

শেয়ার

সবে মিলে করি লুট
ছবি এআই মাধ্যমে তৈরি

উদ্যোক্তা তৈরি, খাদ্য উৎপাদন বাড়ানো ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্য নিয়ে গঠিত ইক্যুইটি অ্যান্ড এন্ট্রাপ্রেনিউরশিপ ফান্ড (ইইএফ) থেকে অর্থ বিতরণে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। ভুয়া দলিল, অন্যের জমি, খাসজমি, নদী ও ওয়াকফ সম্পত্তি জামানত দেখিয়ে অর্থ নেওয়া, প্রকল্প বাস্তবায়ন না করেই অর্থ ছাড় এবং ঘুষের বিনিময়ে তহবিলের অর্থ পাওয়ার মতো অভিযোগ রয়েছে বিভিন্ন প্রকল্পের বিরুদ্ধে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০০১ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত ইইএফ থেকে ১ হাজার ৪৮টি প্রকল্পে প্রায় ১ হাজার ৬৩৯ কোটি টাকা বিতরণ করা হয়। পরে ২০১৮ সালে তহবিলটির নাম পরিবর্তন করে ইক্যুইটি সাপোর্ট ফান্ড (ইএসএফ) করা হয়। ২০১৮ সাল থেকে পরবর্তী আট বছরে ইএসএফ থেকে বিতরণ করা হয়েছে প্রায় ৪৭ কোটি টাকা। ২০০১ সাল থেকে এখন পর্যন্ত অনাদায়ী রয়েছে প্রায় ১ হাজার ৪৩৬ কোটি টাকা।

নদীর পানিতে ৮ বিঘা জমি, তবু ৩ কোটি টাকা

নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজার উপজেলার মেঘনা নদীর কোলঘেঁষা ঘাটপাড় এলাকায় ছিল নুরু ডেইরি ফার্ম। প্রতিষ্ঠানটি তিনবার হাতবদলের পর এখন বন্ধ। এর মালিক নুরুজ্জামান বর্তমানে দুবাইপ্রবাসী।

এই প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে বাংলাদেশ ব্যাংকের উদ্যোক্তা তহবিল থেকে নেওয়া হয়েছিল ৩ কোটি টাকা। এর বিপরীতে ৮ বিঘা ১১ শতাংশ জমি বন্ধক রাখা হয়। তবে সরেজমিনে দেখা যায়, বন্ধক রাখা ওই জমির পুরো অংশই মেঘনা নদীর পানির মধ্যে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, ভুয়া দলিল দেখিয়ে নারায়ণগঞ্জের সাবেক সংসদ সদস্য শামীম ওসমান, সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হক, সাবেক গভর্নর ফজলে কবির এবং সাবেক ডেপুটি গভর্নর এস কে সুরের প্রভাব খাটিয়ে ইইএফের অর্থ ছাড় করানো হয়। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংক ও ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশের (আইসিবি) সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ওপরও চাপ প্রয়োগ করা হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।

একই জমি বন্ধক রেখে শুধু মালিকের নাম পরিবর্তন করে দুই দফায় আরও ৫ কোটি টাকা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। তবে এসব অর্থ আদায়ে এখনো কূলকিনারা খুঁজে পাচ্ছে না আইসিবি।

উদ্যোক্তা তৈরির তহবিল, আদায় হয়নি বেশিরভাগ অর্থ

দেশে খাদ্য উৎপাদন বাড়ানো এবং আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যেই ইইএফ গঠন করা হয়েছিল। উদ্দেশ্য ছিল উদ্যমী তরুণ ও উদ্যোক্তাদের উৎপাদনমুখী ব্যবসা গড়ে তুলতে সহায়তা করা।

ইইএফের আওতায় উদ্যোক্তাদের প্রকল্পে ইক্যুইটি হিসেবে অর্থ দেওয়া হতো। তহবিল থেকে সহায়তা পাওয়া উদ্যোক্তারা বাংলাদেশ ব্যাংকের ৪৯ শতাংশ শেয়ারের অর্থ পরিশোধ করতেন। বাকি ৫১ শতাংশ শেয়ার থাকত উদ্যোক্তার নিজের। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অর্থ পরিশোধের পর প্রকল্পের পূর্ণ মালিকানা পাওয়ার সুযোগ ছিল তাদের।

তবে অর্থ আদায়ে নানা জটিলতা তৈরি হয়। বিশেষ করে ইক্যুইটি শেয়ার ঋণ হিসেবে বিবেচিত না হওয়ায় আইনি পদক্ষেপের মাধ্যমে অর্থ ফেরত আনার ক্ষেত্রেও জটিলতা ছিল।

২০১৮ সালে ইইএফের নাম পরিবর্তন করে ইএসএফ করা হয়। তখন ইক্যুইটির পরিবর্তে ৪ শতাংশ সুদে ঋণ দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। চার বছরের গ্রেস পিরিয়ড শেষে ছয় মাস পরপর কিস্তিতে আট বছরে ঋণ পরিশোধের বিধান করা হয়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ সাল থেকে আট বছরে ইএসএফ থেকে প্রায় ৪৭ কোটি টাকা বিতরণ করা হলেও আদায় হয়েছে মাত্র ২ কোটি টাকা।

তিন দফায় ৫ কোটি, ঘুষ দেওয়ার অভিযোগ ২১ বার

রাজধানীর খিলগাঁওয়ের তালতলা এলাকার ব্যবসায়ী মুকুল আহমেদের প্রতিষ্ঠান সোনানি ট্রেডার্স লিমিটেড। ব্যবসা সম্প্রসারণের জন্য ঢাকার অদূরে ধানি জমি বন্ধক রেখে ইইএফের সহায়তা নেন তিনি। তহবিল থেকে তিন দফায় ৫ কোটি টাকা ছাড় করা হয়।

মুকুল আহমেদের অভিযোগ, অর্থ ছাড় করাতে তাকে নয় ব্যক্তিকে ২১ বার ঘুষ দিতে হয়েছে। এতে তার ৯২ হাজার ৫০০ টাকা খরচ হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।

অভিযোগ রয়েছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের এক প্রভাবশালী ডেপুটি গভর্নরের প্রভাবে ২০২১ সাল পর্যন্ত ওই অর্থের কোনো কিস্তি পরিশোধ করতে হয়নি। পরে করোনার প্রভাবে ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। একই সময়ে অন্যান্য ব্যাংকের ঋণের কিস্তির চাপও বাড়তে থাকে। একপর্যায়ে প্রকল্পটি বন্ধ হয়ে যায়।

অর্থ আদায় না হওয়ায় আইসিবি মামলা করেছে। মামলার ভয়ে উদ্যোক্তা পালিয়ে বেড়াচ্ছেন বলে জানা গেছে। অন্যদিকে বন্ধকি জমি থেকে অর্থ আদায়ের চেষ্টা করছে আইসিবি।

ভুয়া নথিতে সাড়ে ৩ কোটি টাকা

টঙ্গীর পরাগ এলাকার ২৩ নম্বর হোল্ডিংয়ের গ্রিন ভিলেজ ঠিকানায় গিয়ে কথিত নেটওয়ার্ক কারখানার কোনো অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। প্রতিষ্ঠানটির মালিক রফিকুল ইসলাম। অভিযোগ রয়েছে, তহবিল থেকে অর্থ নেওয়ার সময় তিনি ভুয়া নথিপত্র ব্যবহার করেন।

সংশ্লিষ্টরা এখন তাকে শনাক্ত করতেও হিমশিম খাচ্ছেন। স্থানীয় নুরুল ইসলাম দাবি করেন, তিনি রফিকুল ইসলামকে চেনেন। তার ভাষ্য, ২০১৬ সালে এস কে সুরের সহায়তায় রফিকুল তহবিলের অর্থ পান। ২০২১ সালে করোনাকালে এলাকায় এলে রফিকুল নিজেই এক কোটি টাকা ঘুষ দেওয়ার কথা বলেছিলেন বলেও দাবি করেন নুরুল ইসলাম।

জানা গেছে, রফিকুল দুই দফায় প্রায় সাড়ে ৩ কোটি টাকা নিয়েছিলেন। পরে আইসিবি ও বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বিরোধের পর তিনি গা-ঢাকা দেন।

খাসজমি ও অন্যের খামার দেখিয়ে অর্থ নেওয়ার অভিযোগ

মুন্সীগঞ্জের সিরাজদীখান উপজেলা সদরের বাসিন্দা মনির হোসেন সোহাগের বিরুদ্ধেও ভুয়া প্রকল্প দেখিয়ে অর্থ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, সরকারি খাসজমি এবং অন্যের গরুর খামারের সামনে ভুয়া সাইনবোর্ড লাগিয়ে সেটিকে নিজের প্রকল্প হিসেবে দেখানো হয়। খামারের মালিকের কাছ থেকে এ বিষয়ে কোনো অনুমতিও নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।

অভিযোগ রয়েছে, আইসিবির একটি সংঘবদ্ধ চক্র এতে সহযোগিতা করেছে। প্রকল্প সরেজমিনে পরিদর্শন না করেই ওই চক্রের সদস্যরা ভুয়া টিএডিএ নিয়েছেন বলে অভিযোগ। ৫ কোটি টাকা ছাড়ের বিপরীতে দফায় দফায় ২ কোটি ২০ লাখ টাকা ঘুষ নেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।

তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন মনির হোসেন সোহাগ।

সিএজির প্রতিবেদনেও অনিয়মের চিত্র

ইইএফের অর্থ বিতরণ ও ব্যবস্থাপনায় অনিয়মের চিত্র উঠে এসেছে কম্পট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেলের (সিএজি) প্রতিবেদনেও।

২০১৯-২০ সালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, তহবিল থেকে অর্থ নেওয়া অনেক উদ্যোক্তাকেই খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। কেউ কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে যোগাযোগ করছেন না। অনেক প্রকল্পের আয়-ব্যয়ের তথ্যও নেই। বারবার নোটিশ দেওয়ার পরও অনেক উদ্যোক্তা সাড়া দেননি।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, প্রকল্পের প্রাথমিক কাজ বাস্তবায়ন না করেই গ্রাহকের অনুকূলে অর্থ ছাড় করা হয়েছে। কোম্পানির নামে জমি রেজিস্ট্রেশন এবং ভুয়া কাগজপত্রের মাধ্যমে অর্থ বিতরণের ঘটনাও পাওয়া গেছে।

অনেক প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই করা হয়নি। আমদানি করা যন্ত্রপাতির প্রকৃত দাম ও মানও নিরূপণ করা হয়নি। জমির প্রকৃত মালিকানা ও মূল্য যাচাই না করে ভুয়া নথির বিপরীতে অর্থ দেওয়ার প্রমাণও পেয়েছে সিএজি।

স্বচ্ছতার ঘাটতি ও রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, তহবিল ব্যবস্থাপনায় শুরু থেকেই স্বচ্ছতার ঘাটতি ছিল। রাজনৈতিক স্বজনপ্রীতি ও তদারকির অভাবও ছিল।

তার মতে, সুনির্দিষ্ট নীতিমালার কার্যকর প্রয়োগ না থাকায় দলীয় ও রাজনৈতিক বিবেচনায় অর্থ ছাড় হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে পরিচালিত এই তহবিলে মনিটরিং ও তদারকি দুর্বল ছিল।

জনগণের সম্পদ এভাবে অপচয় হওয়া উদ্বেগের কারণ উল্লেখ করে তিনি বলেন, তহবিলের অনিয়মে যারা জড়িত, তাদের পরিচয় যাই হোক না কেন, বিচারের মুখোমুখি করা উচিত।

আইসিবির হাতে তহবিল, পরিচালনা নিয়ে টানাপোড়েন

আইসিবির একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ২০০৯ সাল থেকে আইসিবি পুরো তহবিল দেখভাল করছে। নীতিমালা ও তহবিলের অর্থের জোগান দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক।

তার ভাষ্য, ইইএফ ও ইএসএফ মিলিয়ে তহবিল থেকে বিপুল অর্থ বিতরণ হয়েছে। কিন্তু আইনি ফাঁকফোকর এবং মামলার সুযোগের সীমাবদ্ধতার কারণে অনেকে নির্ধারিত সময়েও অর্থ পরিশোধ করেননি। পরে আইনি কাঠামোতে পরিবর্তন এনে মামলা করার সুযোগ তৈরি করা হয়।

ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, কুমির চাষ, কাঁকড়া উৎপাদন ও পালনসহ কিছু প্রকল্প সরকারি নীতিমালার ঘাটতির কারণে কাঙ্ক্ষিত ফল পায়নি। একইভাবে গ্রিনহাউসে মাংস উৎপাদনের মতো নতুন ধরনের প্রকল্পও নানা বাধার মুখে পড়েছে।

তবে আইসিবির দীর্ঘ অভিজ্ঞতার পরও একটি বিশেষ মহল এর অপারেশনাল ক্ষমতা কেড়ে নিয়ে ২৭টি ব্যাংকের মাধ্যমে তহবিল পরিচালনা করতে চায় বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

আইসিবি: আদায়ে চেষ্টা চলছে

ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশের চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবু আহমেদ বলেন, সরকারি প্রতিষ্ঠান হিসেবে আইসিবি অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করছে। কোনো ঋণ নিয়ে সমস্যা হলে তা বোর্ডে আলোচনা করে সমাধানের চেষ্টা করা হয়।

তিনি বলেন, আগের কিছু গুরুতর সমস্যার কারণে আদায়ের হার কমেছে। এরপরও অর্থ আদায়ে সর্বোচ্চ চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের বক্তব্য

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান বলেন, দেশের খাদ্য উৎপাদন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে গড়ে ওঠা প্রকল্পগুলোর বিনিয়োগে নানা অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। তবে কিছু প্রকল্প সফল হয়েছে এবং এসব প্রকল্পের উদ্যোক্তারা জাতীয় অর্থনীতিতে অবদান রাখছেন।

তার মতে, অর্থ নয়ছয় হলেও এখন আদায় বেড়েছে। তবে মূল সংকট হলো, অনেকে ভুয়া নাম ও ভুয়া জামানত ব্যবহার করে অর্থ ছাড় করেছেন।



banner close
banner close