রবিবার

৯ আগস্ট, ২০২৬ ২৫ শ্রাবণ, ১৪৩৩

সাত বছরে নির্যাতনের শিকার হয়ে দেশে ফিরেছেন ৭০ হাজার নারী কর্মী

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ৯ আগস্ট, ২০২৬ ০৭:০৮

শেয়ার

সাত বছরে নির্যাতনের শিকার হয়ে দেশে ফিরেছেন ৭০ হাজার নারী কর্মী
ছবি সংগৃহীত

প্রেম, বিয়ে ও চাকরির প্রলোভনে বাংলাদেশি নারীদের বিদেশে পাচারের অভিযোগ বাড়ছে। চীন, কম্বোডিয়া ও সৌদি আরবসহ বিভিন্ন দেশে নেওয়ার পর নারী কর্মীদের নির্যাতন, শোষণ ও প্রতারণার শিকার হওয়ার ঘটনাও সামনে এসেছে। অভিবাসনসংশ্লিষ্টদের মতে, স্থানীয় দালালদের সহযোগিতায় আন্তর্জাতিক মানবপাচারকারী চক্র এ ধরনের কর্মকাণ্ডে সক্রিয় রয়েছে।

ব্র্যাকের তথ্য অনুযায়ী, গত সাত বছরে নির্যাতন, শোষণ ও প্রতারণার শিকার হয়ে প্রায় ৭০ হাজার নারী কর্মী বিদেশ থেকে দেশে ফিরেছেন। একই সময়ে প্রায় ৮০০ নারী কর্মীর মরদেহও দেশে ফিরেছে।

প্রেম ও বিয়ের ফাঁদ

প্রেম ও বিয়ের সম্পর্কের মাধ্যমে বাংলাদেশি নারীদের চীনে নেওয়ার চেষ্টার অভিযোগে গত কয়েক মাসে কয়েকজন চীনা নাগরিক গ্রেপ্তার হয়েছেন।

২০২৪ সালের ৭ নভেম্বর হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ফ্যান গোউয়ে ও ইয়াং জিকু নামে দুই চীনা নাগরিককে গ্রেপ্তার করা হয়। অভিযোগ ছিল, রানী আক্তার ও মালিনা মারাক নামে দুই নারীকে প্রেম ও বিয়ের সম্পর্কের মাধ্যমে চীনে নেওয়ার চেষ্টা করছিলেন তারা। বিমানবন্দরে ওই দুই নারী চীনে যেতে অস্বীকৃতি জানালে বিষয়টি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরে আসে।

এরপর ২০২৫ সালের ২৮ মে একই ধরনের অভিযোগে হু জানজুন ও জিয়াং লিজি নামে আরও দুই চীনা নাগরিক গ্রেপ্তার হন।

সংশ্লিষ্ট সূত্রের ভাষ্য, বিদেশি নাগরিকরা স্থানীয় দালালদের মাধ্যমে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গ্রামের নারীদের সঙ্গে পরিচিত হন। কয়েক মাস যোগাযোগের পর তারা বাংলাদেশে এসে পরিবারের আস্থা অর্জনের চেষ্টা করেন। পরে বিয়ের মাধ্যমে নারীদের বিদেশে নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়। অভিযোগ রয়েছে, বিদেশে নেওয়ার পর এসব নারীকে বিভিন্ন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কাছে বিক্রি করে দেওয়া হয়।

চাকরির প্রলোভনে পাচার

চাকরির প্রলোভনে কম্বোডিয়ায় নিয়ে এক নারীকে নির্যাতনের অভিযোগও সামনে এসেছে। সম্প্রতি দেশে ফিরে ওই নারী বিমানবন্দর থানায় মামলা করেছেন।

মামলার অভিযোগ অনুযায়ী, মাসে এক লাখ টাকা বেতনে কাস্টমার কেয়ারে চাকরির কথা বলে তাকে কম্বোডিয়ায় পাঠানো হয়। বিদেশে যাওয়ার জন্য তার কাছ থেকে প্রায় চার লাখ টাকা নেওয়া হয়। কম্বোডিয়ায় পৌঁছানোর পর তার পাসপোর্ট ও ডলার নিয়ে নেওয়া হয়। পরে তাকে একটি চীনা প্রতিষ্ঠানের কাছে বিক্রি করে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি।

ওই নারী আরও অভিযোগ করেন, সেখানে তাকে নির্যাতন করা হয় এবং অনৈতিক কাজে বাধ্য করার চেষ্টা করা হয়। পরে সেখান থেকে পালিয়ে ব্র্যাক মাইগ্রেশন ওয়েলফেয়ার সেন্টারের সহায়তায় দেশে ফেরেন তিনি।

এ ঘটনায় রাজবাড়ীর মো. রুবেল, ফরিদপুরের আনিসুর রহমান ও গাজীপুরের বেলাল হোসেনের নাম মামলায় এসেছে।

সৌদি আরবেও চাকরির প্রলোভনে গিয়ে এক নারী নির্যাতনের শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তাকে আটকে রেখে মারধর, খাবার না দেওয়া এবং যৌন নির্যাতনের অভিযোগ পাওয়া গেছে।

সমন্বিত উদ্যোগের তাগিদ

ব্র্যাকের তথ্য বলছে, গত সাত বছরে প্রায় ৭০ হাজার নারী কর্মী বিভিন্ন ধরনের নির্যাতন, শোষণ ও প্রতারণার শিকার হয়ে বিদেশ থেকে দেশে ফিরেছেন। একই সময়ে প্রায় ৮০০ নারী কর্মীর মরদেহ দেশে ফেরানো হয়েছে।

অভিবাসন বিশেষজ্ঞ শরিফুল হাসান বলেন, বিদেশি নাগরিকদের পরিচয় ও উদ্দেশ্য যাচাই করা জরুরি। বিদেশে নির্যাতনের শিকার নারীদের দ্রুত আইনি ও কূটনৈতিক সহায়তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি মানবপাচারকারীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।

তার মতে, প্রেম, বিয়ে কিংবা চাকরির প্রলোভনে নারী পাচার ঠেকাতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, দূতাবাস এবং অভিবাসনসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। একই সঙ্গে বিদেশে যাওয়ার আগে ভিসা, চাকরির নিয়োগদাতা এবং বিদেশি নাগরিকের পরিচয় যাচাইয়ের বিষয়ে নারীদের সচেতন করা জরুরি।



banner close
banner close