প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, ফ্যাসিবাদের সুবিধাভোগীরা রাষ্ট্র, রাজনীতি ও প্রশাসনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে এখনো সক্রিয় রয়েছে। সম্প্রতি একটি চক্র জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করছে।
শনিবার দুপুর ১২টার দিকে রাজধানীতে ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ড্যাব) ৩৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত চিকিৎসক সমাবেশে তিনি এসব কথা বলেন।
তিনি বলেন, সরকার দায়িত্ব নেয়ার সময় একটি দুর্বল অর্থনীতি, বিভাজিত প্রশাসন এবং ভঙ্গুর শিক্ষা ও স্বাস্থ্যব্যবস্থা উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছে। সেই পরিস্থিতি থেকে দেশকে ঘুরে দাঁড় করানোর চেষ্টা চলছে। একটি চক্র কৌশলে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতকে অস্থিতিশীল করার জন্য সক্রিয় রয়েছে এবং বিভিন্নভাবে বিভ্রান্তিকর বক্তব্য উপস্থাপন করছে।
তিনি বলেছেন, একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত যেহেতু প্রায় সব কাজকেই প্রভাবিত করে, সেহেতু শিক্ষার্থী, শিক্ষক কিংবা পেশাজীবী—সবাই নিজ নিজ মতাদর্শ অনুসারে রাজনৈতিকভাবে সুসংগঠিত থাকা কিংবা রাজনৈতিকভাবে সচেতন থাকা অযৌক্তিক নয়। তবে অতিমাত্রায় রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা যেন পেশাগত দায়িত্ব পালনে বিঘ্ন না ঘটায়, সে বিষয়ে সতর্ক থাকা জরুরি। একই সঙ্গে প্রথাগত রাজনীতির বাইরে এসে রাজনীতির গুণগত পরিবর্তন এখন সময়ের দাবি বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, শিক্ষার্থী কিংবা পেশাজীবীরা রাজনীতিতে সংশ্লিষ্ট থাকবেন কি না, কিংবা কতটা সম্পৃক্ত থাকবেন—এ নিয়ে সচেতন মহলে আলোচনা রয়েছে। এর পক্ষে-বিপক্ষে নানা মতও রয়েছে। তবে একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত প্রায় সব কাজকেই প্রভাবিত করে। তাই শিক্ষার্থী, শিক্ষক কিংবা পেশাজীবী সবাই নিজ নিজ মতাদর্শ অনুসারে রাজনৈতিকভাবে সুসংগঠিত থাকা কিংবা রাজনৈতিকভাবে সচেতন থাকা অযৌক্তিক নয়। কিন্তু অতিমাত্রায় রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা যেন নিজেদের পেশাগত দায়িত্ব পালনে বিঘ্ন ঘটার কারণ না হয়, সে বিষয়ে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে।
চিকিৎসকদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আজ এখানে আমার সামনে যারা উপস্থিত রয়েছেন, আপনারা সবাই স্বনামধন্য চিকিৎসক। আমি চিকিৎসক নই। আজ আমি চিকিৎসাব্যবস্থা সম্পর্কে একজন অচিকিৎসক ব্যক্তির একটি উক্তি উল্লেখ করে চিকিৎসকদের সম্মেলনে কয়েকটি কথা বলতে চাই।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, উনিশ শতকের শুরুর দশকে টমাস এডিসন বলেছিলেন, ভবিষ্যতের চিকিৎসক কোনো ওষুধ দেবেন না; বরং তিনি রোগীদের মানবদেহের যত্ন ও খাদ্যাভ্যাস এবং রোগের কারণ ও প্রতিরোধের বিষয়ে আগ্রহী করে তুলবেন।
টমাস এডিসনের এই চিন্তার সঙ্গে বর্তমান সরকারের স্বাস্থ্যসেবা নীতির একটি মিল রয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, চিকিৎসাসেবার ক্ষেত্রে বর্তমান সরকারের নীতি হচ্ছে—‘প্রিভেনশন ইজ বেটার দ্যান কিউর।’
তিনি বলেন, বর্তমান সরকার মনে করে, মানুষকে যদি শুরুতেই রোগের উৎপত্তির কারণ এবং প্রতিকার সম্পর্কে সচেতন করা যায়, তাহলে শুরুতেই সহজেই অনেক রোগের নিরাময় সম্ভব। এ কারণে বিদ্যমান চিকিৎসাব্যবস্থার পাশাপাশি সরকার নতুন করে আরও এক লাখ হেলথ ওয়ার্কার বা স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ করতে যাচ্ছে। এসব স্বাস্থ্যকর্মী নাগরিকদের প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা সম্পর্কে সতর্ক ও সচেতন করবেন। তবে হেলথ ওয়ার্কার বা স্বাস্থ্যকর্মীদের যথাযথভাবে প্রশিক্ষিত করার ক্ষেত্রে চিকিৎসকদের নেতৃত্ব দিতে হবে।
তারেক রহমান বলেন, দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা এবং চিকিৎসাসেবা আরও কার্যকর ও জনবান্ধব করার লক্ষ্যে চিকিৎসকদের পক্ষ থেকে বেশ কিছু প্রস্তাব উপস্থাপন করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—স্বল্পতম সময়ের মধ্যে বিশেষ বিসিএসের মাধ্যমে ৫ হাজার চিকিৎসক নিয়োগ; সরকারি চাকরিতে চিকিৎসকদের প্রবেশের বয়সসীমা ৩২ থেকে ৩৪ বছরে উন্নীত করা; চিকিৎসকদের অবসরের বয়সসীমা ৬১ থেকে ৬৫ বছরে উন্নীত করা; চিকিৎসক ও রোগী উভয়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সময়োপযোগী স্বাস্থ্যসেবা সুরক্ষা আইন প্রণয়ন; উপজেলা ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে কর্মরত চিকিৎসকদের জন্য বিশেষ ভাতা ও প্রণোদনার ব্যবস্থা; বেসরকারি খাতে কর্মরত লক্ষাধিক চিকিৎসকের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট ও ন্যায্য বেতনকাঠামো প্রণয়ন এবং শুধু রাজধানীকেন্দ্রিক না রেখে বিভাগ, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে বিশেষায়িত হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, চিকিৎসকদের উপস্থাপিত এসব প্রস্তাব অযৌক্তিক নয়। ইতোমধ্যেই শিশু হাসপাতালসহ ঢাকার বাইরে বেশ কিছু বিশেষায়িত হাসপাতাল নির্মাণের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের কাজ শুরু হয়েছে। চিকিৎসকদের উপস্থাপিত অন্যান্য প্রস্তাবও ইতিবাচকভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে পর্যায়ক্রমে বিবেচনা করা হবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকার শিক্ষা, স্বাস্থ্য, জ্বালানিসহ প্রতিটি সেক্টরকে স্বয়ংসম্পূর্ণ ও স্বনির্ভর করতে বাস্তবমুখী পরিকল্পনা গ্রহণ এবং তা বাস্তবায়ন করে চলছে। বাংলাদেশের স্বাস্থ্য ও চিকিৎসাব্যবস্থাকে আধুনিক ও স্বয়ংসম্পূর্ণ করতে বর্তমান সরকার দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো স্বাস্থ্য খাতে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বাজেট বরাদ্দ দিয়েছে। পর্যায়ক্রমে এই বরাদ্দ আগামী পাঁচ বছরে জিডিপির ৫ শতাংশে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
তবে শুধু অবকাঠামোগত উন্নয়ন দিয়ে স্বাস্থ্য খাতে কাঙ্ক্ষিত সফলতা আসবে না বলে মন্তব্য করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, চিকিৎসকগণ যদি সেবার মানসিকতা নিয়ে নিজেদেরকে নিবেদিত না রাখেন, তাহলে শুধুমাত্র অবকাঠামোগত উন্নতি দিয়েই সফলতা আসবে না।
চিকিৎসকদের কাছ থেকে আরও দায়িত্বশীল ও মানবিক ভূমিকা প্রত্যাশা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আসুন, আমরা সকলে মিলে এমন একটি চিকিৎসাবান্ধব বাংলাদেশ গড়ে তুলি, যেখানে দেশের প্রতিটি মানুষ মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা পাবে এবং উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশমুখী হতে হবে না।
আরও পড়ুন:








