বৃহস্পতিবার

৬ আগস্ট, ২০২৬ ২২ শ্রাবণ, ১৪৩৩

বিএনপিতে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন ঘিরে নানা সমীকরণ, সিদ্ধান্ত নেবেন তারেক রহমান

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ৬ আগস্ট, ২০২৬ ২১:৫৪

শেয়ার

বিএনপিতে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন ঘিরে নানা সমীকরণ, সিদ্ধান্ত নেবেন তারেক রহমান
ছবি সংগৃহীত

দেশের তেইশতম রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে সামনে রেখে ক্ষমতাসীন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক সমীকরণ বিবেচনায় রেখে এগোচ্ছে। রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী চূড়ান্ত করার ক্ষেত্রে অতীতে দল ও দেশের জন্য ভূমিকা, রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, দেশ-বিদেশে গ্রহণযোগ্যতা, ব্যক্তিত্ব, বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতা, সরকার ও দলের সাংগঠনিক ভারসাম্য এবং ভবিষ্যতের সম্ভাব্য রাজনৈতিক ঝুঁকিসহ নানা বিষয় বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে।

দলীয় সূত্রে জানা গেছে, গত শনিবার (১ আগস্ট) বিএনপির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। তবে অতীতের ধারাবাহিকতার মতো এবারও রাষ্ট্রপতি পদে দলীয় প্রার্থী মনোনয়নের একক ক্ষমতা বিএনপি চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ওপর ন্যস্ত করা হয়েছে। তিনি সার্বিক পরিস্থিতি মূল্যায়ন করে যাকে উপযুক্ত মনে করবেন, তাকেই দলীয় প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দেবেন।

উল্লেখ্য, গত ২৪ জুলাই স্বাস্থ্যগত কারণ দেখিয়ে দেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন পদত্যাগ করেন। সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হওয়ার ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন সম্পন্ন করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে।

এদিকে, নির্বাচন কমিশন (ইসি) রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ভোটার তালিকা জাতীয় সংসদ সচিবালয় থেকে পেয়েছে। বৃহস্পতিবার (৬ আগস্ট) রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্বাচন ভবনে সংবাদ সম্মেলনে ইসি সচিবালয়ের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ জানান, ভোটার তালিকা পাওয়ার পর রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হয়েছে। তফসিল অনুযায়ী, ১৩ আগস্ট মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার শেষ দিন, ১৬ আগস্ট যাচাই-বাছাই, ১৮ আগস্ট পর্যন্ত মনোনয়ন প্রত্যাহার করা যাবে এবং ২০ আগস্ট ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে।

এর আগে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান জানিয়েছিলেন, সেপ্টেম্বরে জাতীয় সংসদের নিয়মিত অধিবেশনে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে পারে। তবে রাজনৈতিক পরিস্থিতি, জুলাই সনদ এবং সংবিধান সংশোধনের বিষয় বিবেচনায় রেখেই সরকার নির্বাচন সম্পন্ন করার পরিকল্পনা করছে।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক ড. দিলারা চৌধুরীর মতে, রাষ্ট্রপতি হিসেবে এমন একজনকে নির্বাচিত করা প্রয়োজন, যিনি কেবল দলীয় আনুগত্যের জন্য নয়, বরং সাংবিধানিক নিরপেক্ষতা ও রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনের সক্ষমতার জন্যও সর্বমহলে গ্রহণযোগ্য।

বিএনপি সূত্রে জানা গেছে, দলের জ্যেষ্ঠ ও অভিজ্ঞ নেতাদের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও পরিচিত ও গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিদের নাম রাষ্ট্রপতি পদে বিবেচনায় রয়েছে। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নির্ভর করবে প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ওপর।

স্থায়ী কমিটির একাধিক সদস্য জানিয়েছেন, বৈঠকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন নিয়ে আলোচনা হলেও কোনো নাম চূড়ান্ত হয়নি। কাকে মনোনয়ন দেওয়া হবে, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্ব চেয়ারম্যানের ওপরই ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।

দলীয় সূত্রগুলো বলছে, রাষ্ট্রপতি পদে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় রয়েছেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। যদিও তিনি প্রকাশ্যে নিজের প্রার্থিতা নিয়ে মন্তব্য করেননি, তবে ঘনিষ্ঠজনদের কাছে এ পদে আগ্রহের কথা জানিয়েছেন বলে জানা গেছে।

এ ছাড়া দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ড. আবদুল মঈন খান, নজরুল ইসলাম খান এবং সাবেক শিক্ষামন্ত্রী ড. ওসমান ফারুকের নামও আলোচনায় রয়েছে।

সবচেয়ে বেশি আলোচনা হচ্ছে বর্তমান ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি ও জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদকে নিয়ে। মেজর হাফিজ নামে পরিচিত এই বীর মুক্তিযোদ্ধা দেশের সেনাবাহিনীর প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্যদের অন্যতম। পাশাপাশি তিনি ক্রীড়াঙ্গন, বিশেষ করে ফুটবল অঙ্গনেও পরিচিত সংগঠক হিসেবে পরিচিত।

দলীয় নেতাদের বাইরে বিভিন্ন মহলে অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস, সদ্য অবসরে যাওয়া প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদ এবং বর্তমানে জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি আইরিন খানের নামও আলোচনায় রয়েছে।

প্রধানমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলো জানিয়েছে, মন্ত্রিসভার মতো রাষ্ট্রপতি নির্বাচনেও তারেক রহমান আগেভাগেই সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকতে পারেন। তবে আলোচনায় থাকা কোনো শীর্ষ নেতাকে রাষ্ট্রপতি করা হলে দল ও সরকারে সাংগঠনিক পুনর্বিন্যাসের প্রয়োজন হতে পারে।

যদি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর রাষ্ট্রপতি হন, তাহলে মহাসচিবের পদ শূন্য হবে। সে ক্ষেত্রে নতুন মহাসচিব নির্বাচন, ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব নিয়োগ অথবা বিকল্প সাংগঠনিক ব্যবস্থা নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। একই সঙ্গে তিনি স্থানীয় সরকারমন্ত্রীর দায়িত্ব ছাড়বেন এবং সংবিধান অনুযায়ী তাঁর সংসদীয় আসনও শূন্য হবে। ফলে সরকার, দল ও সংসদে একাধিক পরিবর্তনের প্রয়োজন দেখা দেবে।

দলীয় সূত্রের মতে, মির্জা ফখরুলের পক্ষে প্রধান যুক্তি হলো দীর্ঘ সময় মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন, কঠিন সময়ে দলকে ঐক্যবদ্ধ রাখা, পরিচ্ছন্ন রাজনৈতিক ভাবমূর্তি এবং দলীয় ও জাতীয় পর্যায়ে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা। অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক আইন উপদেষ্টা অধ্যাপক আসিফ নজরুলসহ বিভিন্ন ব্যক্তি তাঁকে রাষ্ট্রপতি পদের উপযুক্ত প্রার্থী হিসেবে মত দিয়েছেন।

অন্যদিকে, ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেনের দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, দলীয় আনুগত্য এবং মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতাও তাঁকে শক্তিশালী সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে সামনে এনেছে।

রাষ্ট্রপতি পদে আলোচনায় থাকা বিএনপির স্থায়ী কমিটির এক সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, স্থায়ী কমিটির বৈঠকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন নিয়ে আলোচনা হলেও কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। দলের চেয়ারম্যানই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন। তিনি আরও বলেন, দল দায়িত্ব দিলে রাষ্ট্রপতির মর্যাদা রক্ষায় সর্বোচ্চ চেষ্টা করবেন।

বৈঠকের পর বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, নতুন রাষ্ট্রপতি দলীয় হবেন নাকি দলের বাইরের কেউ হবেন, তা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। সংবিধান ও প্রয়োজনীয় আইন অনুসরণ করে দলের চেয়ারম্যানই এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন।

সরকার ও বিএনপির দায়িত্বশীল সূত্রগুলোর মতে, সংবিধানের সম্ভাব্য অষ্টাদশ সংশোধনীও রাষ্ট্রপতি নির্বাচন প্রক্রিয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। আগামী সেপ্টেম্বরে সংসদে সংশোধনী বিল উত্থাপনের প্রস্তুতি চলছে। সেখানে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্যসহ জুলাই জাতীয় সনদের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। যদি রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা ও দায়িত্বে পরিবর্তন আসে, তাহলে প্রার্থী নির্বাচনের বিবেচনাও বদলে যেতে পারে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নানা জল্পনা-কল্পনা থাকলেও নতুন রাষ্ট্রপতির নাম জানতে শেষ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সিদ্ধান্তের দিকেই সবার নজর থাকবে।



banner close
banner close