ভারতকে যা দিয়েছি আজীবন মনে রাখবে কেন বলেছিলেন হাসিনা। ভারতকে যা দিয়েছেন হাসিনা। বর্তমানে ট্রানজিট ফি বাড়িয়ে সমতার ভিত্তিতে ভারতের চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলছে বাংলাদেশ।
ভারতকে যা দিয়েছি তা তারা আজীবন মনে রাখবে। ক্ষমতায় থাকাকালে এক সংবাদ সম্মেলনে ঠিক এভাবেই দম্ভোক্তি করেছিলেন তৎকালীন স্বৈরাচারী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। কিন্তু ১৫ বছরের শাসনামলের খতিয়ান মেলানোর পর আজ জনমনে প্রশ্ন দেশের রাষ্ট্রীয় ও কৌশলগত স্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়ে আসলে কী দেওয়া হয়েছিল প্রতিবেশী দেশটিকে।
২০০৯ থেকে ২০২৪। ক্যালেন্ডারের পাতা উল্টেছে পুরো পনেরো বার। যে সম্পর্ককে তকমা দেওয়া হয়েছিল সোনালী অধ্যায় আজ তার হিসাব কষতে গিয়ে বেরিয়ে আসছে এক শ্বাসরুদ্ধকর বাস্তবতা।
প্রতিবেশী ভারতের সাথে এ কি শুধুই বন্ধুত্ব ছিল নাকি বন্ধুত্বের মোড়কে এক নিঃশব্দ অর্থনৈতিক উপনিবেশ। কী ছিল সেই ১৫ বছরের খতিয়ানে যা এতদিন সযত্নে লুকিয়ে রাখা হয়েছিল পর্দার আড়ালে।
চট্টগ্রাম ও মোংলা বাংলাদেশের অর্থনীতির দুই হৃৎপিণ্ড। অথচ দেশের এই দুই বন্দরকে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর করিডোর বানাতে গিয়ে বাংলাদেশ কী পেয়েছে।
পরিসংখ্যান বলছে এই ট্রানজিট সুবিধার ফলে ভারতের পণ্য পরিবহনের খরচ কমেছে ৬০ শতাংশ সময় বেঁচেছে ৭০ শতাংশ। প্রতি বছর তাদের সাশ্রয় হয়েছে হাজার হাজার কোটি টাকা। আর বাংলাদেশ বন্দরগুলোতে তৈরি হয়েছে দীর্ঘ জট নিজস্ব পণ্য পরিবহনে নেমেছে স্থবিরতা আর ভারতীয় ভারী ট্রাকের চাকায় পিষ্ট হয়েছে এদেশের সড়ক।
সবচেয়ে বিস্ময়কর তথ্যটি লুকিয়ে আছে মাশুল নীতিতে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের বিশেষজ্ঞ কমিটি সুপারিশ করেছিল প্রতি টনে ১০৫৮ টাকা। কিন্তু ধার্য করা হয়েছিলো মাত্র ২৭৭ টাকা। চার ভাগের এক ভাগ মূল্যে এই সেবাকে কি সহযোগিতা বলা চলে নাকি এটি ছিল কৌশলগত সম্পদকে পানির দামে বিলিয়ে দেওয়ার এক সুপরিকল্পিত আয়োজন।
উন্নয়নের রঙিন মোড়কে এল ভারতীয় ঋণ লাইন অব ক্রেডিট বা এলওসি। আখাউড়া-আগরতলা রেল লিংক কিংবা খুলনা-মোংলা রেললাইন আপাতদৃষ্টিতে আধুনিকতা মনে হলেও এর আসল ব্লু-প্রিন্ট ছিল ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলকে জুড়ে দেওয়া। শর্ত ছিল আরও কঠিন মালামাল কিনতে হবে ভারত থেকে ঠিকাদার হতে হবে ভারতীয়। অর্থাৎ ঋণের টাকা শেষ পর্যন্ত ফিরে গেছে ভারতেরই পকেটে।
২০০৯ সালে বাংলাদেশের কাঁধে বৈদেশিক ঋণ ছিল ২৩ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার। ১৫ বছর পর ২০২৪-এর জুনে সেই বোঝা দাঁড়িয়েছে ১০৩ দশমিক সাত আট বিলিয়ন ডলারে। হাসিনা আমলে যা বৃদ্ধি পেয়েছে তিনশো ৪১ শতাংশ। তাই প্রতিটি বাংলাদেশির মাথার ওপর ঝুলছে ৬০৪ ডলারের ঋণের খড়্গ। রিজার্ভের তলানিতে দাঁড়িয়ে কেবল ঋণের সুদ গুনছে বাংলাদেশ।
এই অসম সমীকরণের সবচেয়ে বড় ক্ষত আদানি বিদ্যুৎ চুক্তি। ঝাড়খণ্ডের গড্ডা থেকে বিদ্যুৎ আনার নামে এমন এক একতরফা চুক্তি স্বাক্ষর করা হয়েছিলো যেখানে বাজারমূল্যের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি দামে বিদ্যুৎ কিনতে বাধ্য করা হয় বাংলাদেশকে। ক্যাপাসিটি চার্জের নামে হাজার হাজার কোটি টাকা বেরিয়ে গেছে দেশের কোষাগার থেকে যা ছিল জাতীয় স্বার্থের চরম পরিপন্থী।
উত্তরের কৃষক যখন তিস্তার এক ফোঁটা পানির জন্য আকাশের দিকে চেয়ে থাকে ভারতের কেন্দ্র সরকার তখন পশ্চিমবঙ্গের বিরোধিতার অজুহাত দেখায়। অথচ ঠিক একই সময়ে দেশের নিরাপত্তাকে বেঁধে ফেলা হয় ৫০০ মিলিয়ন ডলারের ভারতীয় সামরিক ঋণের চুক্তিতে।
অস্ত্র আসবে ভারত থেকে যন্ত্রাংশ আসবে ভারত থেকে। ভূ-রাজনীতির খেলায় এ কেমন কৌশল। পানির ন্যায্য হিস্যা না দিলেও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার চাবিকাঠি তুলে দেওয়া হয়েছিল তাদেরই হাতে। যেন এক নিরাপত্তাহীনতার অদৃশ্য শিকল।
বন্ধুত্বের কথা বলা হলেও পৃথিবীর সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী সীমান্তগুলোর একটি হয়ে রইল বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত। ফেলানী থেকে শুরু করে শত শত নিরীহ বাংলাদেশির রক্তে লাল হয়েছে কাঁটাতার। আন্তর্জাতিক সব নিয়ম উপেক্ষা করে বিএসএফ-এর গুলি আর তার বিপরীতে তৎকালীন হাসিনা সরকারের এক রহস্যজনক নীরবতা বারবার প্রশ্ন তুলেছে এ কেমন বন্ধুত্বের নিদর্শন।
২০২৪ সালের বাণিজ্য ঘাটতির অঙ্কটা দেখলে যেকারো চোখ কপালে উঠে যাবে ৯ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার। তুলা থেকে খাদ্যশস্য যন্ত্রপাতি থেকে যানবাহন বাংলাদেশ হয়ে উঠল ভারতীয় পণ্যের সবচেয়ে বড় মুক্তবাজার। অথচ বাংলাদেশী পণ্য যখন ভারতের সীমান্তে পৌঁছায় তখনই দাঁড়িয়ে যায় অদৃশ্য প্রাচীর নন-ট্যারিফ ব্যারিয়ার মান নিয়ন্ত্রণের অজুহাত আর আমলাতান্ত্রিক জটিলতা।
কিন্তু কোনো মেঘই চিরস্থায়ী নয়। ২০২৪ সালের সোমবার ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভূতপূর্ব বৈপ্লবিক গণ-অভ্যুত্থানের মুখে তৎকালীন স্বৈরাচার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পালিয়ে যাওয়ার মধ্যে দিয়ে বাংলাদেশের ইতিহাসে এক ঐতিহাসিক পটপরিবর্তন ঘটে। আওয়ামী লীগের দীর্ঘ স্বৈরশাসনের অবসান ঘটে। ভেঙে যায় ১৫ বছরের একমুখী সমীকরণের ছক। ফলে ভারত হারাল তার সবচেয়ে বিশ্বস্ত অংশীদার আর একটি নিয়ন্ত্রিত বাজার।
আজ আর বাংলাদেশ কারো অন্ধ আনুগত্য করে না। বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ও বর্তমান তারেক রহমানের সরকার টেবিলে তুলেছে সমতার দাবি। পুনর্মূল্যায়ন করা হচ্ছে পুরোনো সব অসম চুক্তি।
বর্তমানে দেখা যাচ্ছে ভারত ট্রানশিপমেন্ট সুবিধা বাতিল করেছে। বাংলাদেশও খুঁজে নিয়েছে কলম্বো মালদ্বীপ আর দুবাইয়ের নতুন সমুদ্রপথ। ভারত বন্দর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। বাংলাদেশও ৫টি স্থলবন্দর দিয়ে ভারতীয় সুতা আমদানি বন্ধ করে দিয়েছে। ট্রানজিট ফি বাড়িয়ে করেছে প্রতি কিলোমিটারে ১ দশমিক ৮ টাকা। এ এক নতুন বাংলাদেশ। যে বাংলাদেশ চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলতে জানে। মূল্যস্ফীতি আর ঋণের ক্ষত সারিয়ে অর্থনীতি আজ ঘুরে দাঁড়াচ্ছে। পোশাক রপ্তানি বাড়ছে ফিরছে আত্মবিশ্বাস। ১৫ বছরের গোলামির শিকল ভেঙে বাংলাদেশ স্পষ্ট জানিয়ে দিচ্ছে বন্ধুত্ব হবে সমতার ভিত্তিতে নতজানু হয়ে নয়।
আরও পড়ুন:








