বৃহস্পতিবার

৬ আগস্ট, ২০২৬ ২২ শ্রাবণ, ১৪৩৩

দিল্লিকে কড়া বার্তা ঢাকার; ভারতের চোখ রাঙানির দিন কি তবে শেষ?

নিউজ ডেস্ক: বাংলা এডিশন

প্রকাশিত: ৬ আগস্ট, ২০২৬ ২১:০৩

শেয়ার

দিল্লিকে কড়া বার্তা ঢাকার; ভারতের চোখ রাঙানির দিন কি তবে শেষ?
ছবি বাংলা এডিশন

ভারতের নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত আওয়ামী লীগের এক সংবাদ সম্মেলনে সরাসরি ভার্চ্যুয়ালি যোগ দেন পলাতক ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা। এরপরই অভিযোগ উঠেছে তাকে সরাসরি কথা বলার সুযোগ করে দিয়েছে ভারত সরকার। আর এরপর থেকেই দেশের রাজনৈতিক অঙ্গন থেকে শুরু করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে শুরু হয় তুমুল আলোচনা সমালোচনা ও প্রতিক্রিয়া।

দিল্লির মাথুরা রোডে অবস্থিত স্যার মার্ক টালি অডিটোরিয়ামে ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাব অব সাউথ এশিয়ার আয়োজনে বুধবার সন্ধ্যায় গণমাধ্যমের মুখোমুখি হন ছাত্র জনতার রক্তখেকো হাসিনা। এ সময় তাকে বাংলাদেশের বর্তমান সরকার ও দেশ নিয়ে বিভিন্ন রাষ্ট্রবিরোধী মন্তব্য করতে দেখা যায়।

ভারতের নয়াদিল্লিতে শেখ হাসিনাকে এমন উস্কানিমূলক ও রাষ্ট্রবিরোধী বক্তব্য দেয়ার সুযোগ করে দেয়ায় বিবৃতিতে প্রতিবাদ জানিয়েছে বাংলাদেশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। প্রতিবাদী ওই বিবৃতিকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে প্রশংসার জোয়ার বইছে। বিশেষ করে ভারতের প্রতি কূটনৈতিক ভাষায় দৃঢ় বার্তাকে অনেকেই দেখছে বাংলাদেশের আত্মমর্যাদার সুস্পষ্ট প্রতিফলন হিসেবে।

বিবৃতিতে গণহত্যার দায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত পলাতক শেখ হাসিনাকে নয়াদিল্লিতে গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ দেয়ায় ভারতের প্রতি তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। বুধবার মন্ত্রণালয়ের অফিসিয়াল ফেসবুক পেজ থেকে এ নিয়ে এক বিবৃতি প্রকাশ করা হয়।

শেখ হাসিনার এই বক্তব্যকে ঘিরে বাংলাদেশ ভারত দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ওপর সম্ভাব্য নেতিবাচক প্রভাব নিয়ে আগেই ভারত সরকারকে সতর্ক করা হয়েছিল বলে বিবৃতি থেকে জানা যায়। এরপরও এমন প্রকাশ্য অনুষ্ঠানের অনুমতি দেয়া নেতিবাচক হিসেবেই দেখছে বাংলাদেশ সরকার। বিশেষ করে যেদিন দেশের মানুষ জুলাই বিপ্লবের দ্বিতীয় বার্ষিকী পালন করছে সেদিন ভারতীয় ভূখণ্ডে এমন কর্মকাণ্ডকে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব এবং শহীদদের প্রতি চরম অসম্মান হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

এছাড়া ২০২৪ সালের জুলাই আগস্টে ফ্যাসিবাদী শাসনের সময় শিশু ও নিরপরাধ বেসামরিক নাগরিকদের ওপর চালানো নৃশংস হত্যাযজ্ঞ অস্বীকারের যেকোনো অপচেষ্টা ইতিহাস বিকৃতির শামিল বলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়েছে। একইভাবে দণ্ডিত ও পলাতক ব্যক্তিদের এমন বক্তব্যকে ইতিহাসের গতিপথ উল্টে দেয়ার এক ব্যর্থ প্রয়াস হিসেবেও আখ্যা দেয়া হয় বিবৃতিতে।

বিবৃতিতে জোর দিয়ে আরও বলা হয়েছে বাংলাদেশের জনগণ অতীতেও এমন অপচেষ্টা প্রত্যাখ্যান করেছে এখনও করছে এবং ভবিষ্যতেও করবে। জুলাই বিপ্লবের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে দেশের মানুষ দৃঢ় অঙ্গীকারবদ্ধ বাংলাদেশ আর কখনো ফ্যাসিবাদের অন্ধকার গহ্বরে ফিরে যাবে না বলেও উল্লেখ করা হয়। একই সঙ্গে কোনো রাষ্ট্রের ক্লায়েন্ট স্টেট বা অনুগত সত্তায় পরিণত হওয়ার প্রশ্নই আসে না বলে তীর্যক ও দৃঢ় ভাষায় তুলে ধরা হয়েছে সেখানে।

অন্যদিকে বাংলাদেশ ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখতে চায় পারস্পরিক শ্রদ্ধা সার্বভৌম সমতা এবং অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার নীতির ভিত্তিতে। এমন তথ্যও তুলে ধরা হয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে। পাশাপাশি মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে দেয়ার জন্য ভারত সরকারের কাছে বারবার অনুরোধ জানানো হলেও এখন পর্যন্ত কোনো ইতিবাচক সাড়া না পাওয়ায় হতাশা প্রকাশ করেছে ঢাকা।

এই বক্তব্য প্রকাশের পর থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখা গেছে ব্যাপক ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পোস্টে সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে বিশ্লেষক অনেকেই মন্তব্য করেছে। দীর্ঘদিন পর বাংলাদেশ এমন এক ভাষায় কথা বলছে যেখানে আত্মসম্মান ও ভারসাম্যের যুগল উপস্থিতি স্পষ্ট। কেউ কেউ এটিকে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে প্রকাশ্য ও কঠোর হুঁশিয়ারি হিসেবে দেখছে আবার অনেকেই এটিকে ভারতের প্রতি বাংলাদেশের কড়া কূটনৈতিক বার্তা হিসেবেও বিবেচনা করছে।

তারেক রহমানের নেতৃত্বে সরকার গঠনের পর থেকেই ভারতকে নিয়ে একের পর এক দৃঢ় অবস্থান দেশের জনগণের মাঝে ব্যাপক ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছে। বিশেষ করে সীমান্তে বিএসএফের পুশ ইন ইস্যুতে কঠোর অবস্থান চোখে চোখ রেখে পাল্টা বার্তা প্রশংসা কুড়িয়েছে।

অপরদিকে আওয়ামী লীগের আমলে বাংলাদেশ পাকিস্তান কূটনৈতিক সম্পর্কে যে শুষ্কতা তৈরি হয়েছিল বর্তমান সময়ে তা যেন ধীরে ধীরে সজীবতায় রূপ নিচ্ছে। পাকিস্তানের পক্ষ থেকে বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের জন্য শতভাগ স্কলারশিপ ঘোষণাসহ দুই দেশের সম্পর্কের নতুন সম্ভাবনার নানা ইঙ্গিত পাওয়া গেছে সাম্প্রতিক সময়ে।

এদিকে ফ্যাসিবাদী সরকারের সময়ে ভারতের সঙ্গে একচেটিয়া সম্পর্কের ধারাবাহিকতা দেখে অনেকেই ধারণা করেছিলেন নতুন নেতৃত্বও হয়তো প্রথম রাষ্ট্রীয় সফর হিসেবে হাসিনার মতোই ভারতকেই বেছে নেবে। কিন্তু সেই ধারণা ভেঙে দিয়ে তারেক রহমানের প্রথম রাষ্ট্রীয় সফর হিসেবে চীনকে বেছে নেয়া অনেকের কাছে ভারতের প্রতি এক পরোক্ষ কিন্তু এক স্পষ্ট কূটনৈতিক বার্তা।

বিশ্লেষকদের মতে সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে পরিবর্তনের সুস্পষ্ট ইঙ্গিত মিলছে। যেখানে একসময় ভারতের সঙ্গে সম্পর্ককে একমুখী বলা হতো সেখানে এখন দৃশ্যমান হচ্ছে ভিন্ন এক কৌশল সমতার ভাষা দৃঢ়তার সুর এবং প্রয়োজনে কঠোর বার্তা। আর ভারতের প্রতি বাংলাদেশের এই অবস্থানকে দেশের মানুষ নতুন এক পরিবর্তনের সূচনা হিসেবে দেখছে। সব মিলিয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক এই বিবৃতি কেবল তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া নয় বরং বৃহত্তর একটি কৌশলগত ও নীতিগত অবস্থানের প্রতিফলন বলেই মনে করছে বিশ্লেষকরা।



banner close
banner close