রক্তে রাঙানো চব্বিশের জুলাই পেরিয়ে দুই বছর হলেও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন-সংশ্লিষ্ট অধিকাংশ মামলার তদন্ত এখনো শেষ হয়নি। পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, সারা দেশে করা ১ হাজার ৮৬৬টি মামলার মধ্যে গত দুই বছরে তদন্ত সম্পন্ন হয়েছে মাত্র ২৬৪টির। অর্থাৎ প্রায় ৮৫ দশমিক ৮৫ শতাংশ, বা প্রায় ৮৬ শতাংশ মামলা এখনো তদন্তাধীন।
তদন্তের অগ্রগতি ও পরিসংখ্যান
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, মোট মামলার মধ্যে ৮০২টি হত্যা মামলা এবং ১ হাজার ৬৪টি অন্যান্য ধারার মামলা। এসব মামলায় মোট আসামির সংখ্যা ৬ লাখ ১০ হাজারের বেশি। এর মধ্যে নাম উল্লেখ করে আসামি করা হয়েছে প্রায় ১ লাখ ৫৪ হাজার জনকে এবং সন্দেহভাজন আসামি ৪ লাখ ৫৬ হাজারেরও বেশি। বিপুলসংখ্যক আসামি এবং তথ্যপ্রমাণের জটিলতায় তদন্ত কার্যক্রম চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।
মামলাগুলোর তদন্তে সহায়তার জন্য পুলিশ সদর দপ্তর ১০টি মেন্টরিং অ্যান্ড মনিটরিং বা পরামর্শক কমিটি গঠন করেছে। এসব কমিটির তদারকিতে হত্যা মামলার মধ্যে ১০১টির তদন্ত নিষ্পত্তি হয়েছে। এর মধ্যে ৬৩টি মামলায় অভিযোগপত্র এবং ৩৮টি মামলায় চূড়ান্ত প্রতিবেদন (এফআরটি) দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে অন্যান্য ধারার ১৬৩টি মামলার তদন্ত শেষ হয়েছে। এর মধ্যে ১৪৫টি মামলায় অভিযোগপত্র এবং ১৮টি মামলায় চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে।
পিবিআই তদন্তে যা উঠে এসেছে
তদন্ত শেষ হওয়া ২৬৪টি মামলার মধ্যে ২০৩টির তদন্ত সম্পন্ন করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। সংস্থাটি বর্তমানে ২৭৮টি মামলার তদন্ত করছে। এর মধ্যে ১৯৬টি ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে করা (সিআর) এবং ৮২টি থানায় দায়ের করা (জিআর) মামলা।
পিবিআইয়ের তদন্তে দেখা গেছে, আদালতে করা ১৯৬টি মামলার মধ্যে ১০০টিতে অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে। এসব মামলায় মোট ৯ হাজার ৯৫৬ জনকে আসামি করা হয়েছিল। তদন্তে ৩ হাজার ৩৯৫ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগের প্রমাণ পাওয়া গেলেও ৬ হাজার ৫৬১ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগের সঙ্গে সম্পৃক্ততার প্রমাণ মেলেনি। অর্থাৎ মোট আসামির ৬৫ দশমিক ৮৯ শতাংশের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি।
এ ছাড়া ৩৫টি মামলা তদন্তাধীন রয়েছে। বাকি ৬১টি মামলার মধ্যে ৩২টি অপ্রমাণিত হয়েছে। এর মধ্যে ৬টি মামলার বাদী নিখোঁজ, ২০টি মিথ্যা অভিযোগের মামলা এবং ৬টিতে বাদীর অসহযোগিতা ও সাক্ষ্য-প্রমাণের অভাব পাওয়া গেছে।
তদন্তে বিলম্বের কারণ
পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া অ্যান্ড পিআর) এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন বলেন, বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন-সংশ্লিষ্ট মামলাগুলো অত্যন্ত সংবেদনশীল। অধিকাংশ মামলায় বহু আসামি, বিপুলসংখ্যক সাক্ষী, ডিজিটাল ও ফরেনসিক আলামত এবং বিভিন্ন স্থান থেকে তথ্যপ্রমাণ সংগ্রহ করতে হচ্ছে। তাই প্রতিটি মামলার তদন্ত নিরপেক্ষ, তথ্যভিত্তিক ও আইনসম্মতভাবে সম্পন্ন করতে প্রয়োজনীয় সময় লাগছে। তিনি জানান, দ্রুততার চেয়ে মানসম্মত তদন্ত নিশ্চিত করাই পুলিশের অগ্রাধিকার।
তিনি আরও বলেন, বাকি মামলাগুলোর তদন্ত দ্রুত শেষ করার জন্য সংশ্লিষ্ট ইউনিটগুলোকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তবে প্রতিটি মামলার প্রকৃতি ও জটিলতা ভিন্ন হওয়ায় নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ করা সম্ভব নয়।
তদন্তসংশ্লিষ্টরা জানান, আন্দোলন চলাকালে সংঘর্ষ, সহিংসতা, হত্যা, হামলা ও ভাঙচুরের অভিযোগে শত শত ব্যক্তিকে আসামি করা হলেও তদন্তে অনেকের বিরুদ্ধে অভিযোগের কোনো সুস্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়নি। একই ব্যক্তি একাধিক হত্যা মামলাসহ বিভিন্ন মামলার আসামি হওয়া এবং অধিকাংশ মামলায় পুলিশসহ সরকারি কর্মকর্তাদের আসামি করা হওয়ায় তদন্ত আরও জটিল হয়ে উঠেছে।
ডিবির তদন্ত
ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবি) ৫৯টি মামলার তদন্ত করছে। ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) মো. শফিকুল ইসলাম জানান, সঠিক ঘটনা উদ্ঘাটনে প্রায় ৪০ জিবি তথ্য-উপাত্ত, ফরেনসিক আলামত এবং সংশ্লিষ্টদের ভূমিকা বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। প্রতিটি মামলায় আসামির সংখ্যা অনেক বেশি। তাদের অবস্থান শনাক্ত এবং আন্দোলনকালে ভূমিকা যাচাই করা হচ্ছে। তিনি বলেন, অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত পরিচালনা করা হচ্ছে এবং প্রকৃত অপরাধীদের আইনের আওতায় এনে সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দেওয়া হবে।
বিশেষজ্ঞদের পর্যবেক্ষণ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যয়ন বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. সাজ্জাদ সিদ্দিকী বলেন, গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী দুই বছরের মধ্যে ১৮ মাস ছিল অন্তর্বর্তী সরকারের সময়। এ সময় অনেক ক্ষেত্রে হয়রানির উদ্দেশ্যে বা মামলার জন্য মামলা করা হয়েছে। এতে অপ্রয়োজনীয় মামলার ভিড়ে প্রকৃত অপরাধের বিচার এবং প্রকৃত ভুক্তভোগীদের ন্যায়বিচার পাওয়ার পথ বাধাগ্রস্ত হয়েছে। তাঁর মতে, শুরু থেকেই গুরুত্ব বিবেচনায় অর্থবহ মামলাগুলো নিয়ে কাজ করার ঘোষণা দেওয়া হলে সরকারের জবাবদিহিমূলক অবস্থান স্পষ্ট হতো এবং ভুক্তভোগীদের আস্থাও বাড়ত।
সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশের (এইচআরপিবি) প্রেসিডেন্ট মনজিল মোরসেদ বলেন, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ঘটনায় করা অনেক মামলাই এখন প্রশ্নের মুখে। অভিযোগ রয়েছে, প্রকৃত ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ত নন এমন ব্যক্তিদেরও আসামি করা হয়েছে। এতে মামলাগুলোর বিশ্বাসযোগ্যতা দুর্বল হচ্ছে এবং আদালতে টিকে থাকা নিয়েও সংশয় তৈরি হয়েছে। তিনি বলেন, গ্রহণযোগ্য প্রমাণ ছাড়া কাউকে দায়ী করা হলে সেই মামলা আদালতে টিকবে না এবং এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন প্রকৃত ভুক্তভোগী ও তাদের পরিবার।
স্বজনহারার অপেক্ষা
জানা গেছে, ২০২৪ সালের রবিবার (৪ আগস্ট) মিরপুর-১০ নম্বরে পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টারের সামনের সড়কে ছাত্র-জনতার মিছিলে গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন ২২ বছর বয়সী ইমন হোসেন আকাশ।
আকাশের মা বেবি আক্তার বলেন, আসামিরা প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়ালেও পুলিশ দাবি করছে কাউকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। উল্টো তাঁকেই জিজ্ঞেস করা হচ্ছে, মামলা তুলে নেওয়ার জন্য কেউ হুমকি দিচ্ছে কি না। তাঁর ভাষ্য, যারা বিচার করার দায়িত্বে রয়েছেন, তারাই যদি অন্যায়ের পক্ষে থাকেন, তাহলে হত্যার বিচার কীভাবে হবে।
আরও পড়ুন:








