দীর্ঘ ১৭ বছরের আওয়ামী ফ্যাসিজম আর স্বৈরাচারী শাসনের পতনের আজ দ্বিতীয় বর্ষপূর্তি। ঐতিহাসিক ৫ আগস্টে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মুখে দেশ ছেড়ে ভারতে পালিয়ে যাওয়া শেখ হাসিনা আজ প্রকাশ্যে পর্দায় আসছেন।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কয়েক দিন ধরেই আওয়ামী দোসরদের হাঁকডাক নেত্রী এবার প্রকাশ্যে আসছেন পর্দায়। কিন্তু দিল্লির মাথুরা রোডের স্যার মার্ক টালি অডিটোরিয়ামে ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাব অব সাউথ এশিয়ার সেই আয়োজন শুরু হতেই স্পষ্ট হলো আসল বাস্তবতা। ঢাকঢোল পিটিয়ে যে প্রকাশ্য উপস্থিতির কথা বলা হয়েছিল তা বাস্তবে ছিল শুধুই ফাঁকা আওয়াজ। পর্দায় শেখ হাসিনার কোনো দেখা মেলেনি। আগের মতোই ভার্চুয়াল আয়োজনে ভেসে এল কেবল তার অডিও বার্তা।
ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাব অব সাউথ এশিয়া এফসিসি আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন সংগঠনের প্রধান ড. ওয়ায়েল আউয়াদ। এসময় আয়োজনে অংশ নেন শেখ হাসিনার ছেলে ও সাবেক তথ্যপ্রযুক্তি উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয় হাসিনার সাবেক শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল ও হাসিনার আরেক এমপি সাকিব আল হাসান হাসিনার সাবেক কূটনীতিক আমিনুল হক পলাশ আবু ওবাইদাহ আরিন বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস ওয়াচের মহাসচিব মাহাম্মদ আলী সিদ্দিক বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ইউএসএর পরিচালক শাহ মো. বখতিয়ার।
শেখ হাসিনা নিজে পর্দায় না এলেও দিল্লির এই দরবারে সশরীরে উপস্থিত ছিলেন আওয়ামী লীগের বেশ কয়েকজন নেতা ও সুবিধাভোগী। যার মধ্যে সবচেয়ে বেশি নজর কেড়েছে ক্রিকেটার ও আওয়ামী লীগ নেতা সাকিব আল হাসানের উপস্থিতি। স্বৈরাচারী সরকারের আমলে মাগুরা-১ আসন থেকে প্রতিনিধিত্ব করা এই সাবেক সংসদ সদস্য শুধু অনুষ্ঠানে হাজিরই ছিলেন না। নিজের ভেরিফাইড ফেসবুক পেজ থেকে গোটা অনুষ্ঠানটি সরাসরি সম্প্রচারও করেছেন। গণঅভ্যুত্থানের মুখে সংসদ ও মাঠ দুই জায়গা থেকেই ছিটকে পড়ার পর দিল্লির মাটিতে দাঁড়িয়ে আওয়ামী ফ্যাসিজমের পক্ষে এভাবে প্রকাশ্যে অবস্থান নিলেন সাকিব।
অনুষ্ঠানে দেওয়া অডিও ভাষণে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ঐতিহাসিক সত্যকে অস্বীকার করে শেখ হাসিনা দাবি করেন জুলাই-আগস্টের অস্থিরতা শুরু থেকেই শান্তিপূর্ণ ছাত্র আন্দোলন ছিল না। তার অভিযোগ কোটা আন্দোলনকে এক দফা দাবিতে রূপ দিয়ে সংগঠিত গোষ্ঠীগুলো ব্যালট বাক্সের বাইরে থেকে ক্ষমতা দখল করেছে।
৪৫০টিরও বেশি থানা জ্বালিয়ে দেওয়া এবং সরকারি ভবনে হামলার কথা উল্লেখ করে তিনি দাবি করেন দেশে এখন সংখ্যালঘু বিচারক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বরা লক্ষ্যবস্তু হচ্ছেন এবং দণ্ডিত জঙ্গিদের মুক্তি দেওয়া হচ্ছে। সবশেষে জনগণের ওপর আস্থা রেখে আবারও দেশে ফেরার পুরনো স্লোগান শোনান পতিত এই স্বৈরাচার।
অনুষ্ঠানে শেখ হাসিনার ছেলে ও সাবেক আইসিটি উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয় বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে পুলিশি হেফাজতে হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ তোলেন। জাতিসংঘ ও সরকারি পরিসংখ্যানে জুলাই আন্দোলনে মৃতের সংখ্যার পার্থক্য নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের তদন্ত দাবি করেন এবং বিক্ষোভকারীদের অভূতপূর্ব দায়মুক্তি দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেন।
অন্যদিকে সাবেক শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানিয়ে দাবি করেন আওয়ামী লীগ প্রতিশোধ নয় ন্যায়বিচার চায় এবং শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তনকে ক্ষত নিরাময়ের সুযোগ হিসেবে দেখা উচিত। পাশাপাশি বিশ্লেষক আবু ওবাইধা আরিন দাবি করেন রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের কারণেই শেখ হাসিনা নির্বাসনে রয়েছেন।
যে ৫ আগস্টে ছাত্র-জনতার রক্তের বিনিময়ে ১৭ বছরের স্বৈরাচারের পতন হয়েছিল ঠিক দুই বছর পর সেই একই দিনে দিল্লি থেকে আওয়ামী নেতাদের এমন আস্ফালন ও ফেসবুক লাইভকে নতুন কোনো ষড়যন্ত্র হিসেবেই দেখছেন সচেতন নাগরিকরা। ঢাকঢোল পিটিয়েও শেখ হাসিনার পর্দায় না এসে কেবল অডিও বার্তায় সীমাবদ্ধ থাকাই প্রমাণ করে জনরোষের ভয় আজও তাড়া করে ফিরছে পতিত স্বৈরাচারকে।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দোসরদের যতই প্রচার-প্রচারণা থাকুক না কেন দিল্লির মঞ্চে সাকিবের লাইভ কিংবা শেখ হাসিনার অডিও বার্তা দেশের সাধারণ মানুষের কাছে কেবলই চেনা নাটকের পুরনো স্ক্রিপ্ট। জুলাই বিপ্লবের দুই বছর পরেও বাস্তবের বাংলাদেশে পতিত স্বৈরাচারের এই ভার্চুয়াল ফাঁকা আওয়াজ কতটা ধোপে টেকে সেটাই এখন দেখার বিষয়।
আরও পড়ুন:








