সোমবার ৫ আগস্টের সকাল। গণভবনের ভেতরে দিনটি শুরু হয়েছিল এক অস্বাভাবিক চাপা উত্তেজনার মধ্য দিয়ে। নিরাপত্তা বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তাদের দ্রুত উপস্থিত হতে নির্দেশ যায়। আগের রাত থেকেই পরিস্থিতি ছিল অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
আগের রাতে পুলিশ, র্যাব, বিজিবিসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে দীর্ঘ বৈঠক হয়েছে এখানে। বিভিন্ন সূত্রের বর্ণনা অনুযায়ী, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ঘোষিত মার্চ ফর ঢাকা কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়েই ছিল সেই বৈঠকের মূল আলোচনা।
সোমবার ৫ আগস্ট খুব সকালেই ঘুম থেকে ওঠেন স্বৈরাচার শেখ হাসিনা। গণভবনের চারপাশে ছিল কড়া নিরাপত্তা। বিশ্বস্ত কর্মকর্তাদের সঙ্গে একের পর এক ফোনালাপ চলতে থাকে। কারফিউ কার্যকর রয়েছে, রাজধানীর প্রবেশপথগুলো নিয়ন্ত্রণে রাখা হয়েছে এবং নিরাপত্তা বাহিনী প্রস্তুত, এমন বার্তাই তাকে জানানো হচ্ছিল।
সকালের নাস্তা সেরে দিনের কর্মসূচির খোঁজ নেন তিনি। রাজনৈতিক নেতা, প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং নিরাপত্তা বাহিনীর প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠকের প্রস্তুতি চলছিল। গণভবনের আশপাশে নিরাপত্তা জোরদার থাকলেও, সাধারণ যানবাহনের সীমিত চলাচল তখনও পুরোপুরি বন্ধ হয়নি।
অন্যদিকে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ধীরে ধীরে জড়ো হতে শুরু করে আন্দোলনকারীরা। আসাদ গেট, কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার, চানখারপুলসহ বিভিন্ন স্থানে বাড়ছিল মানুষের উপস্থিতি। ইন্টারকন্টিনেন্টাল মোড় এলাকায় সেনাবাহিনীর সাঁজোয়া যান ও এপিসি মোতায়েন ছিল। রাজধানীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও জোরদার করা হয়।
এদিকে গণভবনে শুরু হয় একের পর এক বৈঠক। বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার তথ্য তখন পৌঁছাতে শুরু করেছে। আন্দোলনের বিস্তার, রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় মানুষের অবস্থান এবং নিরাপত্তা পরিস্থিতির দ্রুত অবনতির খবর আসছিল ধারাবাহিকভাবে। এর আগের দিন আন্দোলন ঠেকানোর বিভিন্ন উদ্যোগ নেয়া হলেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিতে পারেনি হাসিনার বাহিনী। বরং সংঘর্ষ ও প্রাণহানির ঘটনায় আন্দোলন আরও বিস্তৃত হয়। এ অবস্থায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন মঙ্গলবার ৬ আগস্টের পরিবর্তে একদিন এগিয়ে সোমবার ৫ আগস্ট লং মার্চ টু ঢাকা কর্মসূচি ঘোষণা করে। এরপর থেকেই পরিস্থিতি নতুন মোড় নেয়।
সোমবার ৫ আগস্ট সকাল গড়াতেই গণভবনে ডাকা হয় নিরাপত্তা বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তাদের। বিভিন্ন গোয়েন্দা প্রতিবেদনে রাজধানীর পরিস্থিতিকে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে তুলে ধরা হয়। সূত্রের বর্ণনা অনুযায়ী, নিরাপত্তা বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তারা গোয়েন্দা প্রতিবেদনের সর্বশেষ তথ্য গণভবনে তুলে ধরেন। আন্দোলনের ব্যাপকতা এবং রাজধানীর বিভিন্ন প্রবেশপথে বিপুল মানুষের উপস্থিতির কথা জানানো হয়। সূত্রগুলোর দাবি, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কঠোর পদক্ষেপের বিষয়টি আলোচনায় এলেও নিরাপত্তা বাহিনীর কর্মকর্তারা আরও রক্তপাতের আশঙ্কার কথা তুলে ধরেন। তাদের মূল্যায়ন ছিল, শক্তি প্রয়োগে প্রাণহানি বাড়তে পারে, কিন্তু তাতেও জনস্রোত ঠেকানো যাবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।
এরই মধ্যে সাভার, আশুলিয়া, যাত্রাবাড়ী, উত্তরাসহ রাজধানী ও আশপাশের বিভিন্ন এলাকায় সংঘর্ষ এবং গুলির ঘটনায় প্রাণহানির খবর আসতে থাকে। বিভিন্ন গণমাধ্যম ও মানবাধিকার সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, সোমবার ৫ আগস্ট সকালেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গুলিতে বহু মানুষ নিহত হন। একই সময়ে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের কমান্ড সেন্টার থেকে মাঠপর্যায়ে নির্দেশনা দেয়া হচ্ছিল।
সূত্রগুলোর দাবি, বৈঠকে নিরাপত্তা বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তারা শেখ হাসিনাকে জানান, রাজধানীর পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। তাদের মূল্যায়ন ছিল, পরিস্থিতি সামাল দেয়ার সময় খুবই সীমিত। এ অবস্থায় পদত্যাগের বিকল্পও আলোচনায় আসে বলে বিভিন্ন বর্ণনায় উল্লেখ রয়েছে। তবে শুরুতে শেখ হাসিনা সেই প্রস্তাবে সম্মত হননি। পরে পরিস্থিতির গুরুত্ব তুলে ধরে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গেও আলোচনা হয় বলে জানা যায়।
একপর্যায়ে, হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়ের সঙ্গেও যোগাযোগ করা হয়। প্রথমদিকে পরিস্থিতি নিয়ে ভিন্নমত থাকলেও পরবর্তীতে তিনি মায়ের সঙ্গে কথা বলেন। একই সঙ্গে ধানমন্ডি ৩২ নম্বর এবং গোপালগঞ্জে যাওয়ার প্রস্তাব, এমনকি জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেয়ার বিষয়টিও আলোচনায় আসে। তবে দ্রুত অবনতিশীল পরিস্থিতির কারণে এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হয়নি।
এদিকে ঢাকা ও শাহবাগ এলাকায় আন্দোলনকারীদের অবস্থান নিয়ে নিয়মিত তথ্য সংগ্রহ করছিলেন কর্মকর্তারা। তাদের হিসাব অনুযায়ী, আন্দোলনকারীরা তখন গণভবনের খুব কাছাকাছি পৌঁছে যাচ্ছিলেন। ফলে, সম্ভাব্য ভাষণ রেকর্ড করার পরিকল্পনাও শেষ পর্যন্ত আর বাস্তবায়িত হয়নি।
বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও দেশীয় সূত্রে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, দেশত্যাগের প্রস্তুতির সময় ভারতের সঙ্গে যোগাযোগের বিষয়টিও আলোচনায় আসে। তবে শেখ হাসিনা ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির মধ্যে কী ধরনের কথোপকথন হয়েছিল, সে বিষয় প্রকাশ্যে আসেনি।
পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যাওয়ায় অল্প সময়ের মধ্যেই, পদত্যাগ পত্র জমা দিয়ে গণভবন ছেড়ে পালাতে হয় শেখ হাসিনাকে। সরকারি সূত্র অনুযায়ী, প্রথমে হেলিকপ্টারে এবং পরে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর একটি উড়োজাহাজে দেশ ছেড়ে ভারতের উদ্দেশে রওনা হন ফ্যাসিস্ট হাসিনা।
শেখ হাসিনা গণভবন থেকে পালানোর পরপরই আন্দোলনকারীরা গণভবন ও জাতীয় সংসদ ভবন এলাকায় প্রবেশ করে। নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদেরও সেখান থেকে সরিয়ে নেয়া হয়। এর মধ্য দিয়ে টানা প্রায় দেড় দশক জেঁকে বসা এক দানবের স্বৈরাচারী শাসনের অবসান ঘটে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে সোমবার ৫ আগস্ট একটি গুরুত্বপূর্ণ ও আলোচিত দিন হিসেবে স্থান করে নেয়। মুক্তি পায় দেশের মানুষ।
আরও পড়ুন:








