বৃহস্পতিবার

৬ আগস্ট, ২০২৬ ২১ শ্রাবণ, ১৪৩৩

ফিরে দেখা ৩৬ জুলাই; মুক্তির আনন্দে রাস্তায় নেমে আসে আপামর মানুষ

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ৫ আগস্ট, ২০২৬ ০৭:২৮

শেয়ার

ফিরে দেখা ৩৬ জুলাই; মুক্তির আনন্দে রাস্তায় নেমে আসে আপামর মানুষ
ছবি বাংলা এডিশন

আন্দোলন সংঘাত ও ক্ষমতার পরিবর্তনে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে নতুন অধ্যায়ের সূচনা ঘটে পাঁচ আগস্ট। সোমবার ৫ আগস্ট ২০২৪ জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চূড়ান্ত দিন। টানা এক মাসের আন্দোলন শত শত প্রাণহানি হাজারো মানুষের রক্ত ও আত্মত্যাগের পর এদিন পতন ঘটে স্বৈরাচার শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের। মার্চ টু ঢাকা কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে দেশের ইতিহাসে অন্যতম বড় গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে ক্ষমতা ছাড়েন শেখ হাসিনা এবং পালিয়ে আশ্রয় নেন ভারতে। এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে শুরু হয় এক নতুন অধ্যায়। অবসান ঘটে দীর্ঘ ১৭ বছরের স্বৈরাচারী শাসনের।

তবে এই বিজয়ের দিন ছিল একই সঙ্গে রক্তাক্তও। সরকার পতনের পরও দেশের বিভিন্ন স্থানে সংঘর্ষ ও গুলির ঘটনা ঘটে। শেখ হাসিনা দেশ ছাড়ার পরও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গুলিতে বহু মানুষ নিহত ও আহত হন। যে আন্দোলনের শুরু হয়েছিল সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে তার চূড়ান্ত পরিণতি হয় সরকার পতনের মধ্য দিয়ে।

এর মাত্র দুই সপ্তাহ আগে সোমবার ২২ জুলাই ব্যবসায়ীদের সঙ্গে এক বৈঠকে হাসিনা বলেছিলেন শেখ হাসিনা পালায় না। কিন্তু সোমবার ৫ আগস্ট জনরোষ আন্দোলনের চাপ এবং দ্রুত পরিবর্তিত পরিস্থিতির মধ্যে তিনি প্রধানমন্ত্রীর পদ ছেড়ে ঠিকই পালিয়ে যান।

সোমবার ৫ আগস্ট কারফিউ উপেক্ষা করে ভোর থেকেই দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে লাখো মানুষ ঢাকার উদ্দেশে রওনা হন। রাজধানীর প্রবেশমুখে বিভিন্ন স্থানে বাধা ও সংঘর্ষ হলেও মানুষের ঢল থামেনি। দুপুরের পর সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার উজ জামান শেখ হাসিনার পদত্যাগের ঘোষণা দেয়ার পর রাজপথজুড়ে শুরু হয় কোটি কোটি মানুষের উল্লাস। মুক্তির আনন্দে রাস্তায় নামে এসে শিশু থেকে বয়স্ক সব বয়সী মানুষ।

মূলত সকাল থেকেই রাজধানীর রাজপথ দখলে নেয় আপামর মানুষ। হাজারো বিক্ষুব্ধ জনতা প্রবেশ করেন গণভবনে। একই সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও জাতীয় সংসদ ভবনেও ঢুকে পড়েন মুক্তিকামী মানুষ। শিশু বৃদ্ধ শিক্ষার্থী শ্রমজীবী নারী সব শ্রেণি পেশার মানুষের উপস্থিতিতে রাজপথ পরিণত হয় এক অভূতপূর্ব গণউল্লাসের মঞ্চে।

কিন্তু এই বিজয়ের দিনেও থামেনি সহিংসতা। তথ্য অনুযায়ী রাজধানীর প্রবেশপথসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংঘর্ষ হয়। শেখ হাসিনা পালিয়ে যাওয়ার পরও এদিন বিভিন্ন স্থানে গুলিবর্ষণে কমপক্ষে শতাধিক মানুষ নিহত এবং কয়েক হাজার মানুষ আহত হন।

২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার পর দীর্ঘ সময় ধরে শেখ হাসিনার সরকার মানবাধিকার লঙ্ঘন মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সংকুচিত করা নৃশংসভাবে বিরোধী মত দমন এবং রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে দেশে। সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া আন্দোলনের প্রতি সরকারের কঠোর অবস্থানই শেষ পর্যন্ত আন্দোলনকে গণঅভ্যুত্থানে রূপ দেয়।

সোমবার ১ জুলাই শুরু হওয়া আন্দোলনের শুরুতে শিক্ষার্থীদের দাবি ছিল সরকারি চাকরিতে কোটাব্যবস্থার যৌক্তিক সংস্কার। ২০১৮ সালে সরকার প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির চাকরিতে কোটা বাতিল করলেও ২০২৪ সালের জুনে হাইকোর্ট সেই প্রজ্ঞাপন বাতিল করে পুনর্বহালের রায় দেয়। এরপরই নতুন করে আন্দোলনে নামে শিক্ষার্থীরা।

হাইকোর্টের রায়ের পর পুনরায় ৫৬ শতাংশ কোটা কার্যকরের সিদ্ধান্ত শিক্ষার্থীদের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভ সৃষ্টি করে। মেধাভিত্তিক নিয়োগের দাবিতে শুরু হওয়া আন্দোলন দ্রুত দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকার আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও সরকারপন্থী সংগঠনের সন্ত্রাসীদের লেলিয়ে দেয়। একপর্যায়ে সংঘর্ষ প্রাণহানি ও দমন পীড়নের মধ্যে আন্দোলন রূপ নেয় গণঅভ্যুত্থানে। পরবর্তীতে জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী এ আন্দোলনে প্রায় ১ হাজার ৪০০ মানুষ নিহত এবং প্রায় ২০ হাজার মানুষ আহত হন।

মূলত মঙ্গলবার ৬ আগস্ট মার্চ টু ঢাকা কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়েছিল। কিন্তু শনিবার ৩ আগস্ট ও রবিবার ৪ আগস্টের হামলায় ব্যাপক প্রাণহানির পর আন্দোলনের সমন্বয়করা কর্মসূচি একদিন এগিয়ে এনে সোমবার ৫ আগস্ট নির্ধারণ করে।

আন্দোলনের শুরুতে সমন্বয়করা হত্যাকাণ্ডের দায় স্বীকার করে শেখ হাসিনার প্রকাশ্য ক্ষমা বিচার এবং ৯ দফা দাবি বাস্তবায়নের আহ্বান জানিয়েছিলেন। কিন্তু সে দাবি পূরণ না হয়ে আন্দোলনের ছয় সমন্বয়ককে ডিবি হেফাজতে নেয়া হয়। বাইরে থাকা সমন্বয়করা ফ্যাসিবাদবিরোধীদের সাথে নিয়ে আন্দোলন চালিয়ে যান এবং কর্মসূচি আরও বিস্তৃত করে।

পরে সমন্বয়করা মুক্তি পাওয়ার পর শনিবার ৩ আগস্ট কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে এক দফা ঘোষণা দেয়। শেখ হাসিনার পদত্যাগকেই তখন আন্দোলনের একমাত্র দাবি হিসেবে সামনে আনা হয়।

এক দফা ঘোষণার পর আন্দোলন আরও তীব্র হয়ে ওঠে। দমন পীড়ন বাড়লেও আন্দোলনকারীরা পিছু হটেনি। তারা সোমবার ৫ আগস্টকে ৩৬ জুলাই আখ্যা দিয়ে ঘোষণা করে সরকারের পতনের আগ পর্যন্ত তাদের কাছে জুলাই শেষ হবে না।

অবশেষে আসে সেই প্রতীক্ষিত দিন। ভোর থেকেই রাজধানীমুখী মানুষের ঢল নামে। ঢাকার বাইরের জেলা থেকেও হাজার হাজার মানুষ পুলিশি বাধা অতিক্রম করে রাজধানীতে পৌঁছানোর চেষ্টা করেন। শাহবাগ বাংলামোটর ফার্মগেট যাত্রাবাড়ীসহ বিভিন্ন এলাকা জনসমুদ্রে পরিণত হয়।

পরিস্থিতি তখন আর কোনো সাধারণ রাজনৈতিক কর্মসূচির মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। কোটি কোটি মানুষের একটাই দাবি স্বৈরাচারী সরকারের পদত্যাগ। কারফিউ ব্যারিকেড কিংবা গুলির ভয় উপেক্ষা করে মানুষ এগিয়ে যেতে থাকে। আন্দোলনের চাপে পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।

শেষ পর্যন্ত শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী পদ থেকে পদত্যাগ করে এবং তার ছোট বোন শেখ রেহানাকে সঙ্গে নিয়ে একটি সামরিক হেলিকপ্টারে করে ভারতের উদ্দেশে পালিয়ে যায়। প্রায় দেড় দশকের ফ্যাসিস্ট শাসনের অবসানের মধ্য দিয়ে শেষ হয় এক যুগের রাজনৈতিক অধ্যায়।

সোমবার ১ জুলাই কোটা সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া যে আন্দোলন ধাপে ধাপে ৯ দফা তারপর এক দফার আন্দোলনে রূপ নিয়েছিল তার চূড়ান্ত পরিণতি ঘটে সোমবার ৫ আগস্ট। ছাত্রদের আন্দোলন পরিণত হয় সর্বস্তরের মানুষের গণঅভ্যুত্থানে। অসংখ্য প্রাণের বিনিময়ে ক্ষমতার পালাবদল ঘটে আর বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে যুক্ত হয় এক নতুন অধ্যায়। সেই কারণেই সোমবার ৫ আগস্ট শুধু একটি তারিখ নয় জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চূড়ান্ত দিন আন্দোলনের বিজয়ের দিন এবং ইতিহাসের এক মোড় ঘোরানো মুহূর্ত আর মানুষের মুক্তির আনন্দ।



banner close
banner close