শেখ হাসিনাকে দেশে ফেরানোর পরিবেশ তৈরির লক্ষ্যে দেশের ২২টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪০৪ শিক্ষক নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের পক্ষে গোপন তৎপরতা চালাচ্ছেন। পুরো বিষয়টি সমন্বয় করা হচ্ছে মেসেজিং অ্যাপ টেলিগ্রামে খোলা একটি সিক্রেট গ্রুপের মাধ্যমে।
গ্রুপটির নাম বাংলাদেশ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রগতিশীল শিক্ষক সমাজ। এর সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা প্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক ড. এম অহিদুজ্জামান। সাধারণ সম্পাদক রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. মাহবুবর রহমান।
গ্রুপের সদস্য ও কার্যক্রম
গোপন কার্যক্রম পরিচালনার ওই গ্রুপের ২৮ পৃষ্ঠার স্ক্রিনশটের ভিত্তিতে ৪০৪ জনের নাম শনাক্ত করা গেছে। এর মধ্যে অনেকের সাংকেতিক নাম ব্যবহার করা হয়েছে। এর বাইরে আরও ২১ জনের শুধু মোবাইল নম্বর রয়েছে।
গ্রুপের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, টেলিগ্রাম ও এর বাইরে বিভিন্ন প্রযুক্তি ব্যবহার করে তারা নিয়মিত বিভিন্ন বৈঠকে মিলিত হচ্ছেন। একটি বৈঠক আহ্বানের বার্তায় সাধারণ সম্পাদক মাহবুবর রহমান কমিটির পক্ষ থেকে জানিয়েছেন, আজ বিকেল সাড়ে তিনটায় সিস্টেম আপডেটের স্বার্থে গ্রুপের সংযুক্ত সকল শিক্ষক মতবিনিময় সভায় মিলিত হবেন এবং সবাইকে সংযুক্ত হওয়ার অনুরোধ জানিয়েছেন। বার্তায় জয় বাংলা জয় বঙ্গবন্ধু স্লোগান ব্যবহার করা হয়েছে।
গ্রুপে জুলাই অভ্যুত্থানকেন্দ্রিক এবং এর বাইরে বিভিন্ন বিষয়ে আওয়ামী লীগের পক্ষের নিউজ শেয়ার করা হয়। একটি বার্তায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. মাহবুব লিটু অধিকারপত্র নামের একটি অনলাইন নিউজ শেয়ার করেছেন, যার শিরোনাম ছিল কলঙ্কের কালো অধ্যায়: ৫ আগস্টের পর যে আগুনে পুড়েছে বাংলার শ্রেণিকক্ষ-২০২৪ আগস্ট পরবর্তী শিক্ষক নিগ্রহকে উপজীব্য করে একটি বিস্তৃত বাংলা সংবাদধর্মী ফিচার।
আরেকটি বার্তায় সভাপতি অহিদুজ্জামান জানিয়েছেন, সার্বিক সহযোগিতায় সিস্টেম আপডেট করে গত রাতে সফলভাবে ট্রায়াল শেষ করা হয়েছে এবং মাহেন্দ্রক্ষণ সন্নিকটে থাকায় প্রোগ্রামের গাইডলাইনসহ অন্যান্য বিষয়াদি অবহিত করার স্বার্থে আজ বিকেল তিনটায় অতীব গুরুত্বপূর্ণ এক সভায় মিলিত হওয়ার জন্য সবাইকে অনুরোধ জানিয়েছেন। এখানেও জয় বাংলা জয় বঙ্গবন্ধু স্লোগান ব্যবহার করা হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক সদস্য সংখ্যা
গ্রুপে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক রয়েছেন ৯২ জন, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ৬৮ জন, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪২ জন, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪৪ জন, নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩৮ জন, মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ২৯ জন, সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ১২ জন এবং কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের ১১ জন।
কুড়িগ্রাম কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ১০ জন, চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ১১ জন, শের-ই-বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ১০ জন, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ৯ জন এবং পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ৬ জন শিক্ষক রয়েছেন। বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ৭ জন এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫ জন শিক্ষক রয়েছেন। এ ছাড়া আরও সাত পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ৭ জন শিক্ষক রয়েছেন। আওয়ামী লীগ সমর্থিত চিকিৎসকদের সংগঠন স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের তিন নেতাও এই গ্রুপে রয়েছেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৯২ শিক্ষকের মধ্যে রয়েছেন জেড এম পারভেজ সাজ্জাদ, প্রফেসর ড. আজমল হোসেন ভূঁইয়া, প্রফেসর ড. মো. আসাদুজ্জামান, প্রফেসর ড. তাওহিদা রশীদ, ড. ইশরাত জাহান, প্রফেসর ড. জামিলা এ চৌধুরীসহ আরও অনেকে। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ৬৮ জনের মধ্যে রয়েছেন প্রফেসর ড. জি এম আল আমিন, ড. অমল কান্তি দেব, বেল্লাল আহমেদ অনিকসহ অন্যান্যরা। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪২ জনের মধ্যে রয়েছেন প্রফেসর লাইলা, প্রফেসর দিলীপ, প্রফেসর রানা এবং প্রফেসর ড. মো. মাহবুবর রহমানসহ অন্যান্যরা।
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪৪ জনের মধ্যে রয়েছেন কে এম শরফ উদ্দিন, শারমিন সুলতানা, প্রফেসর ড. আলমগীর কবিরসহ অন্যান্যরা। নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩৮ জনের মধ্যে রয়েছেন ড. এম গোলাম মোস্তফা, মেহেরীন মুঞ্জারিন রত্নাসহ অন্যান্যরা। মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ২৯ জনের মধ্যে রয়েছেন প্রফেসর ড. মো. মাসুদুর রহমানসহ অন্যান্যরা। সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ১২ জনের মধ্যে রয়েছেন প্রফেসর মো. জামাল উদ্দিন ভূঁইয়াসহ অন্যান্যরা। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের ১১ জনের মধ্যে রয়েছেন ড. কাজী ওমর সিদ্দিকীসহ অন্যান্যরা।
কুড়িগ্রাম কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ১০ জনের মধ্যে রয়েছেন প্রফেসর ড. জাকির হোসেনসহ অন্যান্যরা। চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ১১ জনের মধ্যে রয়েছেন প্রফেসর ড. জামাল উদ্দিন আহসহ অন্যান্যরা। শের-ই-বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ১০ জনের মধ্যে রয়েছেন রুহুল আমিনসহ অন্যান্যরা। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ৯ জনের মধ্যে রয়েছেন শ্যামল রঞ্জন চক্রবর্তীসহ অন্যান্যরা। পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ৬ জনের মধ্যে রয়েছেন প্রফেসর ড. সন্তোষ কুমার বোসসহ অন্যান্যরা। বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ৭ জনের মধ্যে রয়েছেন আসাদ মন্ডলসহ অন্যান্যরা। এর মধ্যে মশিউর রহমান জুলাই অভ্যুত্থানে শহীদ আবু সাঈদ হত্যা মামলার আসামি। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫ জনের মধ্যে রয়েছেন রিয়াদ সিদ্দিকী প্রাণসহ অন্যান্যরা। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের আরও ১২ জনের মধ্যে রয়েছেন হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের জিয়া ও ইকবালসহ অন্যান্যরা এবং স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের আহসান হাবীব, ড. আনজানা পারভীন ও মো. সাজু।
সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা গবেষণা বিভাগের অধ্যাপক ড. ওয়াহিদুজ্জামান জানিয়েছেন, এখানে শেখ হাসিনা বা কোনো রাজনৈতিক দলের বিষয় নয়। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শত শত শিক্ষকের সব ধরনের অধিকার খর্ব করে রাখা হয়েছে। তাদের বয়কট করে রাখা হয়েছে, মানবাধিকার খর্ব করে রাখা হয়েছে, পজিশন কেড়ে নেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে তাদের শিক্ষকদের হয়রানি ও মানহানি করা হচ্ছে। মূলত তাদের সংগঠনটি হলো যারা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শিক্ষক, প্রগতিশীলতা রক্ষা করেন তাদের। তারা বাংলাদেশকে এগিয়ে নিতে চান এবং নিজেদের রক্ষা করতে চান। এ লক্ষ্যে ঐক্যবদ্ধ হয়েছেন। সেখানে নানা বিষয় আলাপ-আলোচনা হতে পারে। প্রয়োজন হলে তারা আন্দোলন করবেন, রাস্তায় নামবেন এবং জীবন দেবেন। ইউনূস সরকার দুঃশাসন চালু করেছিল। তারা ভেবেছিলেন বর্তমান সরকার তা থেকে বেরিয়ে আসবে। কিন্তু দেখা যাচ্ছে বর্তমান সরকারও একই পথে হাঁটছে।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মাহবুবুর রহমান জানিয়েছেন, তিনি এই বিষয়ে এখন কোনো মন্তব্য করার অবস্থায় নেই। তিনি এখন বাইরে আছেন এবং পরে কথা হবে।
আরও পড়ুন:








