প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, জুলাই আন্দোলন ছিল সম্পূর্ণভাবে জনগণের আন্দোলন। জনগণ পরিবর্তন চেয়েছিল বলেই আন্দোলন সফল হয়েছে। এ আন্দোলনের কৃতিত্ব কোনো একক ব্যক্তি বা রাজনৈতিক দলের নয়, বরং দেশের সর্বস্তরের জনগণের।
মঙ্গলবার (৪ আগস্ট) বিকেলে রাজধানীর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন অব বাংলাদেশ (কেআইবি) মিলনায়তনে গণতন্ত্র আদায়ে ১৭ বছরের অনিবার সংগ্রাম ও রক্তঝরা জুলাই জাগরণ শীর্ষক আলোচনা সভায় তিনি এসব কথা বলেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিগত ১৭ বছর ধরে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এবং গণতন্ত্রে বিশ্বাসী অন্যান্য রাজনৈতিক দল ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে মাঠে ছিল এবং কখনো জনগণকে একা ফেলে যায়নি। জনগণ সম্পূর্ণভাবে আন্দোলনে সম্পৃক্ত হওয়ার কারণেই জুলাই আন্দোলন সফল হয়েছে।
দেশ পুনর্গঠনে ঐক্যের আহ্বান
সব রাজনৈতিক দলের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তারেক রহমান বলেন, আন্দোলন, সংগ্রাম ও তর্ক বিতর্কের সময় শেষ। এখন দেশ পুনর্গঠন, উন্নয়ন এবং ষড়যন্ত্র মোকাবিলায় সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে। জনগণের সামনে দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলো ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের মাধ্যমে তাদের প্রত্যাশা পূরণ করতে হবে।
রাষ্ট্র সংস্কারের ৩১ দফা বাস্তবায়নের অঙ্গীকার
তিনি বলেন, বিএনপি দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে রাষ্ট্র সংস্কারের যে রূপরেখা দিয়েছিল, তা পরে মিত্র দলগুলোর সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে ৩১ দফায় পরিণত হয়। গত সাধারণ নির্বাচনে জনগণ এই কর্মসূচির পক্ষে ম্যান্ডেট দিয়েছে। ফলে এটি এখন শুধু বিএনপির নয়, বরং সমগ্র জনগণের কর্মসূচিতে পরিণত হয়েছে।
সরকারের অগ্রাধিকার ও অর্থনৈতিক উদ্যোগ
প্রধানমন্ত্রী বলেন, দায়িত্ব গ্রহণের পর সরকার ভঙ্গুর অর্থনীতি, দুর্বল স্বাস্থ্যব্যবস্থা এবং বিভাজিত প্রশাসনের বাস্তবতা পেয়েছে। জনগণের দুর্ভোগ কমাতে তাৎক্ষণিক বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে এবং প্রত্যাশা পূরণে কাজ অব্যাহত রয়েছে।
জ্বালানি সংকট নিরসনে মিয়ানমার থেকে গ্যাস আমদানির আলোচনা শুরু হয়েছে এবং মালয়েশিয়ার পেট্রোনাসের সঙ্গে এলএনজি আমদানির আলোচনা চূড়ান্ত হয়েছে বলে জানান তিনি। এর মাধ্যমে জাতীয় গ্রিডে অতিরিক্ত চার হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ যোগ করার পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেন। পাশাপাশি দীর্ঘদিন অকার্যকর থাকা বাপেক্সকে পুনরুজ্জীবিত করে দুটি নতুন রিগ কেনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
কর্মসংস্থান ও শিল্পায়ন
বেকারত্ব কমাতে মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি শ্রমিক নিয়োগে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, চট্টগ্রাম ও নারায়ণগঞ্জে নতুন শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলা হচ্ছে, যেখানে চীনা ও কোরিয়ান বিনিয়োগ আসবে। এছাড়া বিটিএমসির বন্ধ প্রায় ৫০টি মিল ও কারখানা বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তরুণ উদ্যোক্তাদের সহায়তায় বিশেষ তহবিলও গঠন করা হয়েছে।
স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে পরিকল্পনা
তিনি জানান, আগামী পাঁচ বছরে প্রতিটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে ৫০ শয্যা থেকে ১০১ শয্যায় উন্নীত করা হবে। দুই থেকে তিন বছরের মধ্যে সব উপজেলা হাসপাতালে অন্তত ১০ শয্যার ডায়ালিসিস ইউনিট চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। একই সঙ্গে স্টেন্ট, ডায়ালিসিস, চোখের লেন্স এবং তথ্যপ্রযুক্তি পণ্যের ওপর শুল্ক কমিয়ে সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
শিক্ষা বিষয়ে তিনি বলেন, শিক্ষা কার্যক্রমকে আনন্দমুখর শেখার পরিবেশে রূপান্তর করা হবে, যাতে শিক্ষার্থীদের আগ্রহ ও সক্ষমতা আরও বৃদ্ধি পায়।
তরুণদের উন্নয়ন ও ক্রীড়া চর্চা
তরুণদের মাদক থেকে দূরে রাখতে দেশব্যাপী ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রম বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি জানান, সম্প্রতি প্রাথমিক বিদ্যালয় পর্যায়ে ২২ লাখ শিশুর ফুটবল প্রতিযোগিতা এবং ১২ থেকে ১৪ বছর বয়সীদের জন্য নতুন গতি স্পোর্টস প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়েছে।
ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি
জুলাই আন্দোলনে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি ও পরিবারের পাশে থাকার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে তারেক রহমান বলেন, যাদের চিকিৎসা প্রয়োজন তাদের চিকিৎসা এবং যাদের কর্মসংস্থান প্রয়োজন তাদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা হবে।
অনুষ্ঠানের শেষদিকে তিনি ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধ, বিভিন্ন গণতান্ত্রিক আন্দোলন এবং জুলাই আন্দোলনে শহীদদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন। একই সঙ্গে দেশের শান্তি, অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও গণতন্ত্রকে সুদৃঢ় করতে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহ্বান জানান।
বিএনপির মহাসচিব ও স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতারা বক্তব্য দেন। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য, মন্ত্রী, উপদেষ্টা এবং অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতারাও অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।
আরও পড়ুন:








