রাজধানী ঢাকার একদম কোলঘেঁষে বুড়িগঙ্গার এপারের জনবহুল এলাকা কেরানীগঞ্জ। দ্রুত নগরায়ণ, বহুতল ভবনের বিস্তার এবং ভাসমান জনগোষ্ঠীর চাপের কারণে প্রতিদিনই বাড়ছে ভাড়া বাসার সংখ্যা। কিন্তু এই বিস্তারের সঙ্গে তাল মিলিয়ে গড়ে ওঠেনি ভাড়াটিয়া যাচাই ও নিবন্ধনের কার্যকর ব্যবস্থা। ফলে কেরানীগঞ্জের দক্ষিণ ও মডেল থানা এলাকায় পরিচয়পত্র যাচাই ছাড়াই বাসা ভাড়া দেওয়ার প্রবণতা এখন উদ্বেগজনক রূপ নিয়েছে।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, অনেক বাড়ির মালিক জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি), পাসপোর্ট, কর্মস্থলের পরিচয় কিংবা লিখিত ভাড়া চুক্তিপত্র ছাড়াই কেবল অগ্রিম টাকা নিয়ে বাসা ভাড়া দিচ্ছেন। কোথাও ভাড়াটিয়ার ছবি সংরক্ষণ করা হয় না, কোথাও থানায় তথ্য দেওয়া হয় না। ফলে অপরাধ সংঘটনের পর অভিযুক্তদের শনাক্ত করতে গিয়ে তদন্তকারীদের বড় ধরনের সমস্যায় পড়তে হচ্ছে।
সাম্প্রতিক সময়ে কেরানীগঞ্জে একের পর এক হত্যা, মাদক উদ্ধার, ইয়াবা তৈরির কারখানা বা মজুদের অভিযোগে অভিযান, চুরি, ছিনতাই এবং সংঘবদ্ধ অপরাধের বিভিন্ন ঘটনা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। বিভিন্ন অভিযানে দেখা গেছে, অপরাধে জড়িত সন্দেহভাজনদের কেউ কেউ অস্থায়ী ভাড়া বাসাকে আশ্রয় হিসেবে ব্যবহার করেছে। তদন্তসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভাষ্য অনুযায়ী, ভাড়াটিয়ার সঠিক পরিচয় সংরক্ষিত না থাকায় অনেক ক্ষেত্রেই তদন্ত জটিল হয়ে পড়ে এবং অপরাধীদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে অতিরিক্ত সময় লাগে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, অপরিচিত লোকজন কয়েক দিনের জন্য বাসা নিয়ে দিনের বেলায় আড়ালে থাকে, রাতে যাতায়াত করে এবং হঠাৎ করেই এলাকা ছেড়ে চলে যায়। পরে কোনো অপরাধের ঘটনা ঘটলে বাড়ির মালিকের কাছেও তাদের প্রকৃত পরিচয়ের তথ্য থাকে না।
কদমতলী, চুনকুটিয়া, শুভাঢ্যা, হাসনাবাদ, জিনজিরা, আগানগরসহ বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে দেখা যায়, অধিকাংশ বাড়িওয়ালা ভাড়াটিয়ার জাতীয় পরিচয়পত্র যাচাই বা সংরক্ষণকে গুরুত্ব দিচ্ছেন না। অনেক ক্ষেত্রে ভুয়া নাম ও একটি মোবাইল নম্বরের ভিত্তিতেই বাসা ভাড়া দেওয়া হচ্ছে। লিখিত চুক্তিপত্র না থাকায় পরবর্তীতে আইনগত জটিলতাও সৃষ্টি হচ্ছে।
ঢাকা মহানগরের বিভিন্ন এলাকায় ভাড়াটিয়া তথ্য ফরম পূরণ ও তথ্য সংরক্ষণের ব্যবস্থা থাকলেও কেরানীগঞ্জে সেটি কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে না বলে অভিযোগ রয়েছে। সচেতন নাগরিকদের দাবি, প্রতিটি বাড়িওয়ালার কাছ থেকে বাধ্যতামূলকভাবে ভাড়াটিয়ার পরিচয়পত্র, ছবি, স্থায়ী ঠিকানা ও জরুরি যোগাযোগের তথ্য সংরক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বড় কোনো হত্যাকাণ্ড, মাদকবিরোধী অভিযান বা আলোচিত অপরাধের পর কয়েক দিনের জন্য পুলিশের তৎপরতা দেখা গেলেও পরে তা অনেকটাই শিথিল হয়ে যায়। নিয়মিত তদারকি ও নিবন্ধন ব্যবস্থা জোরদার না হলে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ কঠিন হবে বলে মনে করছেন তারা।
থানা পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ভাড়াটিয়াদের তথ্য সংগ্রহ ও সচেতনতা বৃদ্ধির বিষয়ে তারা কাজ করছেন। তবে জনসংখ্যার ঘনত্ব, দ্রুত নগরায়ণ এবং সীমিত জনবলের কারণে শতভাগ নজরদারি নিশ্চিত করা চ্যালেঞ্জিং।
আইন ও অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, পরিচয় যাচাই ছাড়া বাসা ভাড়া দেওয়ার সংস্কৃতি বন্ধ না হলে কেরানীগঞ্জে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ আরও কঠিন হয়ে পড়বে। তাদের পরামর্শ, প্রতিটি ভাড়া বাসার জন্য ডিজিটাল ভাড়াটিয়া নিবন্ধন, জাতীয় পরিচয়পত্র যাচাই, লিখিত চুক্তিপত্র বাধ্যতামূলক করা এবং নিয়মিত পুলিশি তদারকি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
কেরানীগঞ্জকে নিরাপদ রাখতে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ। প্রতিটি ভাড়াটিয়ার তথ্য ডিজিটালভাবে সংরক্ষণ, বাড়িওয়ালাদের আইনি দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন করা, নিয়মিত অভিযান পরিচালনা এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে বিশেষ নজরদারি জোরদার করা এখন সময়ের দাবি। অন্যথায় পরিচয়হীন ভাড়া বাসা অপরাধীদের জন্য নিরাপদ আশ্রয়ে পরিণত হওয়ার ঝুঁকি থেকেই যাবে, যার মূল্য দিতে হবে সাধারণ মানুষকেই।
আরও পড়ুন:








