ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্পটির দ্বিতীয় সংশোধনী প্রস্তাব ইতোমধ্যে একনেক সভায় অনুমোদন দেয়া হয়। এর ফলে প্রকল্পটির সঙ্গে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তিনটি নতুন অঙ্গ যুক্ত হচ্ছে। বাইপাইল ইন্টারসেকশন, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের থার্ড টার্মিনাল ও নির্মাণাধীন পাতাল মেট্রোরেলের এমআরটি লাইন-১ এর সঙ্গে সংযোগ।
নতুন এই সংযোজনগুলোর ফলে প্রকল্পটির ব্যয় মূল বরাদ্দের চেয়ে ৯৪৯২ দশমিক ৬৩ কোটি টাকা যা প্রায় ৫৪ দশমিক ০৮ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। ২৪ কিলোমিটার দীর্ঘ এই এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েটি হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কাছে কাওলা থেকে শুরু হয়ে আব্দুল্লাহপুর, কামারপাড়া, ধউর, আশুলিয়া, জিরাবো ও বাইপাইল অতিক্রম করবে। এরপর ঢাকা ইপিজেড সাভারের শ্রীপুর বাসস্ট্যান্ডে গিয়ে শেষ হবে।
ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের সঙ্গে সংযুক্ত এই সড়কটি চালু হলে ঢাকার যানজটপূর্ণ সড়ক এড়িয়ে চট্টগ্রাম বন্দর ও দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে উত্তর ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের মধ্যে একটি দ্রুতগতির যোগাযোগ করিডোর তৈরি হবে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে আগামী ২০২৮ সালের জুনে যানবাহন চলাচলের জন্য খুলে দেয়ার লক্ষ্য নিয়ে কাজ এগিয়ে চলছে।
ধউর থেকে আশুলিয়া পর্যন্ত প্রায় ৩ দশমিক ৭১ কিলোমিটার অংশের দুটি সার্ভিস লেন সেতু এক সপ্তাহের মধ্যে যান চলাচলের জন্য খুলে দেয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এরপর নিচের বিদ্যমান সড়ক বন্ধ করে সেখানে মূল এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের কাঠামো নির্মাণের কাজ শুরু হবে। আব্দুল্লাহপুর থেকে ধউর পর্যন্ত একপাশের সড়কে কার্পেটিংয়ের কাজ প্রায় শেষ হয়েছে। অপর পাশের কাজ ডিসেম্বরের মধ্যে শেষ করে যানবাহন চলাচলের জন্য খুলে দেয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। ডলারের বিনিময় হার অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেলে অতিরিক্ত ব্যয়ের প্রয়োজন হতে পারে। এ ছাড়া অন্য কোনো কারণে প্রকল্প ব্যয় বাড়বে না।
প্রকল্প পরিচালক বলেন, অতিরিক্ত ব্যয় বৃদ্ধির কারণ হিসেবে ডলারের মূল্য বৃদ্ধি একটি বড় কারণ। ডলারের মূল্য বৃদ্ধি পাওয়ার ফলে প্রকল্পের নির্মাণ ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ায় ভ্যাট, টেক্স এবং কাস্টমস ডিউটির ব্যয় বেড়েছে। ডলারের মূল্য বৃদ্ধির কারণে ব্যয় বেড়েছে ৩ হাজার ৭৩৬ দশমিক ৬১ কোটি টাকা। ভ্যাট, টেক্স এর পরিমান বৃদ্ধির কারণে ১০৩০ দশমিক ৩৬ কোটি টাকা। কাস্টমস ডিউটি ৩৯০ দশমিক ৭৩ কোটি টাকা, মালামালের মূল্য বৃদ্ধির কারণে ৮১০ দশমিক ২৮ কোটি টাকা, ভূমি অধিগ্রহণে ৭৪৭ দশমিক ৫৫ কোটি টাকা বৃদ্ধি, পরামর্শক সেবা ২৫৭ দশমিক ৯ কোটি টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে। আবার তিনটি নতুন অঙ্গ বাইপাইলে ৩ স্তরের ইন্টরসেকশন যা নির্মিত হলে সেখানে কোনো যানবাহনকে এক মিনিটের জন্য হলেও দাঁড়ানোর প্রয়োজন হবে না।
হযরত শাহজালাল বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনালে প্রবেশ ও প্রস্থানের র্যাম্প ও এমআরটি লাইন-১ এর সাথে সংযোগ এবং বিআইডাব্লিওটিএ রেগুলেটরি রিকোয়ারম্যান্ট অনুযায়ী তুরাগ নদীর শ্রেণি পরিবর্তনের কারণে ৩টি সেতুর নেভিগেশন ক্লিয়ারেন্স পরিবর্তনের কারণে এবং রেলওয়ের কাওলায় রেলক্রসিং ক্লিয়ারেন্স পরিবর্তনের কারণে অতিরিক্ত ১৭৭০ দশমিক ৮৪ কোটি টাকা ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে।
শুরুতে ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছিল ১৬ হাজার ৯০১ কোটি টাকা। তখন প্রকল্পটি ২০২২ সালের জুনে শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তখনও কাজই শুরু হয়নি। পরে ওই বছর জুনেই প্রকল্প প্রস্তাবে প্রথম সংশোধনী আনা হয়। এতে প্রকল্প ব্যয় ৬৫২ কোটি টাকা বেড়ে ১৭ হাজার ৫৫৩ কোটি টাকা দাঁড়ায়। ওই বছর নির্মাণ কাজ শুরু হয়। চীন ও বাংলাদেশ সরকারের যৌথ অর্থায়নে প্রকল্পটি নির্মাণাধীন।
গত ২২ জুলাই জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় দ্বিতীয় সংশোধনী অনুমোদন পায়। ফলে ১৭ হাজার ৫৫৩ কোটি থেকে প্রকল্প ব্যয় বেড়ে ২৭ হাজার ৪৬ কোটি টাকায়।
ঢাকা-আশুলিয়া যে প্রকল্পের খরচটা এখন বৃদ্ধি পেয়েছে, তার দুটো কারণ রয়েছে। একটা ডলার রেটে বড় আকারে পরিবর্তন ঘটেছে। ডলারের পরিবর্তনের কারণে আবার ভ্যাট, ট্যাক্সসহ বেশ কিছু পরিবর্তনের জায়গা রয়েছে।
প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ঢাকা শহরের উত্তরাঞ্চল তথা সাভার, আশুলিয়া, নবীনগর ও ইপিজেড সংলগ্ন শিল্প এলাকার যানজট নিরসন এবং যোগাযোগ ব্যবস্থার দ্রুত উন্নয়নের লক্ষ্যে ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণের পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। প্রকল্পের আওতায় ঢাকা ও গাজীপুর জেলার মোট ১৩৬ দশমিক ৮১৩৩ একর ভূমি অধিগ্রহণ হয়।
এছাড়া প্রকল্পের আওতায় ভৌত নির্মাণ কাজ চলমান রয়েছে। গত জুন পর্যন্ত প্রকল্পের সার্বিক অগ্রগতি ৭১ দশমিক ৫০ এবং নির্মাণ কাজের ভৌত অগ্রগতি ৬৫ শতাংশ। সম্ভাব্যতা সমীক্ষা অনুযায়ী এই প্রকল্পের কাজ সম্পন্ন হলে জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ০.২১৭ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে।
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছে, দ্রুতগতিতে কাজ এগিয়ে নেয়া হচ্ছে। এরই মধ্যে আগামী ১০ আগস্টের মধ্যে এক্সপ্রেসওয়ের কিছু অংশ যান চলাচলের জন্য খুলে দেয়ার প্রস্তুতি চলছে। এতে প্রকল্পের প্রথম ধাপের সুফল পেতে শুরু করবেন আশপাশের এলাকার মানুষ ও ওই পথের যাত্রীরা।
দেশের প্রথম ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব (পিপিপি) পদ্ধতিতে নির্মিত হলেও দ্বিতীয় এই এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে বাস্তবায়িত হচ্ছে বিদেশি ঋণের অর্থায়নে। প্রকল্পটির ঠিকাদার চায়না ন্যাশনাল মেশিনারি ইমপোর্ট অ্যান্ড এক্সপোর্ট কর্পোরেশন (সিএমসি) এবং অর্থায়ন করছে এক্সিম ব্যাংক অব চায়না।
ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের ধউর মোড় থেকে আশুলিয়া বাজার পর্যন্ত অংশ এমনভাবে নির্মাণ করা হচ্ছে, যাতে তুরাগ নদীর স্বাভাবিক পানি প্রবাহে কোনো ধরনের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি না হয়। এ কারণে মূল এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের পাশাপাশি স্থানীয় যানবাহন চলাচলের জন্য উড়ালপথে দুই লেনের পৃথক দুটি সেতু সার্ভিস লেন হিসেবে নির্মাণ করা হয়েছে। যা আগামী এক সপ্তাহের মধ্যেই সেতু দুটি যানবাহন চলাচলের জন্য খুলে দেয়া হবে। সার্ভিস লেন চালু হওয়ার পর নিচের বিদ্যমান সড়ক বন্ধ করে মূল এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের ভায়াডাক্ট নির্মাণকাজ শুরু হবে।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের প্রফেসর ড. হাদিউজ্জামান ইনকিলাবকে বলেন, পরিকল্পনা অনুযায়ী ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের সাথে এই এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে যুক্ত হয়ে যাবে।
ফলে দুই প্রকল্পটি যদি একই সাথে আগাতে না পারে, তাহলে দুইটা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে একসাথে যুক্ত করা সম্ভব হবে না। প্রকল্পটির মূল যে লক্ষ্য ঢাকার ভিতরে যানবাহন না ঢুকে উত্তরবঙ্গ-দক্ষিণবঙ্গের যানবাহনগুলো ভার্টিকালি বাইপাস করার। দুইটা প্রজেক্ট একইভাবে যখন শেষ করা হবে তখনই এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে।
আরও পড়ুন:








