ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরে এক ট্রান্সজেন্ডার ব্যক্তির বিয়ে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনা শুরুর পর মুখ খুলেছে মন্দির কর্তৃপক্ষ। তাদের দাবি, বিয়েটি একেবারেই সাধারণ সনাতন ধর্মীয় রীতি মেনে সম্পন্ন হয়েছিল এবং পাত্র-পাত্রী তথ্য গোপন করে তাদের সঙ্গে প্রতারণা করেছেন। মন্দির কর্তৃপক্ষ ইতিমধ্যে থানায় অভিযোগ দিয়ে দায়ীদের শাস্তি দাবি করেছে এবং ভবিষ্যতে বিয়ের ক্ষেত্রে পাত্র-পাত্রীর নথি যাচাই-বাছাই করে তিন দিন পর বিয়ে সম্পন্ন করার নির্দেশনা জারি করেছে।
বিয়ের বিবরণ
শুক্রবার (১০ জুলাই) পাত্র লিটন চন্দ্র বিশ্বাস ও পাত্রী শিশির বিশ্বাসের সনাতন শাস্ত্রমতে ঢাকেশ্বরী মন্দিরে বিয়ে সম্পন্ন হয়। এর অন্তত ১৫ দিন পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে বিয়ের একটি ছবি ভাইরাল হয়, যা সমকামী বিয়ে হিসেবে প্রচার করা হচ্ছে। তবে মন্দির কর্তৃপক্ষের সরবরাহ করা নথিতে দেখা যায়, সেখানে একজন মুসলিম ট্রান্সজেন্ডার আছেন তা বোঝার উপায় নেই। এনআইডি কার্ডে পাত্রীর নাম শিশির বিশ্বাস উল্লেখ থাকলেও তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পরিচয়ে তিনি তাসনুভা আনান নামে পরিচিত এবং নিজেই বিয়ের ছবি-ভিডিও নিজের আইডিতে প্রকাশ করেছেন। তাসনুভা আনান বৈশাখী টিভিতে খবর পড়তেন এবং নিউইয়র্কে একটি ফ্যাশন শোতে অংশ নিয়েছিলেন বলে জানা গেছে। তার সব কর্মকাণ্ড মুসলিম পরিচয়েই পরিচিতি পেয়েছে বলে উল্লেখ রয়েছে।
এনআইডি জালিয়াতির অভিযোগ
মন্দির কর্তৃপক্ষের ভাষ্যমতে, তাসনুভা আনানের ব্যবহৃত এনআইডি নম্বরটির প্রকৃত মালিক মো. জাহিদুল ইসলাম, যার বাবার নাম আব্দুল লতিফ, মায়ের নাম সাফিয়া বেগম এবং বাড়ি ভোলা জেলায় বলে উল্লেখ রয়েছে। মন্দিরে জমা দেওয়া নথিতে অবশ্য এই নম্বরের বিপরীতে পিতার নাম ক্ষিতিশ চন্দ্র বিশ্বাস, মাতার নাম দিপালী রানী বিশ্বাস, জন্মতারিখ ২৫ এপ্রিল ১৯৯৮ এবং ঠিকানা গ্রাম-ভাটামাথা, পোস্ট-ছাতুয়া শরীফ, উপজেলা-আখাউড়া, জেলা-ব্রাহ্মণবাড়িয়া উল্লেখ করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
মন্দির কর্তৃপক্ষের বক্তব্য
ঢাকেশ্বরী মন্দিরের পুরোহিত ও মন্দির কমিটির সাধারণ সম্পাদক ডি এন চ্যাটার্জি রবিবার (২ আগস্ট) জানান, বর-কনে কাকুতি-মিনতি করে আবেদন করার পর মাত্র দুই হাজার টাকা দক্ষিণায় হিন্দু শাস্ত্রমতে বিয়ের অনুষ্ঠান সম্পন্ন হয়, যাতে দেড় থেকে দুই ঘণ্টা সময় লাগে। পাত্রী মুসলিম হওয়ার বিষয়টি তারা জানতেন না বলে দাবি করে তিনি বলেন, নির্ধারিত ফরম পূরণ করে পাত্রী নিজেই এনআইডি সরবরাহ করেছিলেন এবং তার বাবা-মা ও সাক্ষীরা সবাই নিজেদের সনাতন ধর্মাবলম্বী হিসেবে পরিচয় দিয়েছিলেন। তিনি আরও জানান, পাত্রী যে ট্রান্সজেন্ডার তা বিয়ের সময় বোঝা যায়নি, বিষয়টি পরে জানতে পারেন তারা। মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে বিয়ে পড়ানোর অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে তিনি বলেন, পাত্র-পাত্রী মিথ্যা তথ্য দিয়ে তাদের সঙ্গে প্রতারণা করেছেন এবং বিয়ের পর থেকে গোয়েন্দা সংস্থা ও থানা থেকে ফোন আসছে। তিনি জানান, সব নথি সরবরাহ করে দায়ীদের শাস্তির আওতায় আনার আবেদন করেছেন তারা।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিক্রিয়া
এই বিয়েকে ঘিরে ফেসবুকে বিভিন্ন প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। পাঠকদের জন্য হুবহু তুলে ধরা হলো:
এক ব্যক্তি ফেসবুকে এক পোস্টে লেখেন: "ঢাকেশ্বরী মন্দিরে একটি মুসলিম ছেলের সঙ্গে একটি হিন্দু ছেলের বিয়ে সম্পন্ন হলো। এটি 'সমকামী' বিয়ে; এর শাস্তি চাই।"
রাজনৈতিক দল নাগরিক অধিকারের নেতা ফারুক হাসান ফেসবুকে পোস্টে লেখেন: "সমকামিতা বাংলাদেশ দণ্ডবিধির ৩৭৭ ধারা অনুযায়ী নিষিদ্ধ এবং একটি দণ্ডনীয় অপরাধ। এই আইন থাকার পরও জাতীয় মন্দির ঢাকেশ্বরীতে একটি সমকামী বিয়ে মহাধুমধামে অনুষ্ঠিত হয়েছে। এ নিয়ে মন্দির কর্তৃপক্ষ ও সরকারের পক্ষ থেকে কোনো বক্তব্য বা প্রশাসনিক অ্যাকশন দেখছি না।" তিনি আরও লেখেন: "এরকম নিষিদ্ধ একটি কাজ জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমে অনুষ্ঠিত হলে সেক্যুলাররা সমাজ ও দেশে যুদ্ধ লাগিয়ে দিতেন।" সমকামী বিয়ে বন্ধে এবং জড়িতদের শাস্তি নিশ্চিতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
শাহিনুর ইসলাম প্রান্ত নামে আরেকজন ফেসবুকে লেখেন: "দেশে সমকামী বিয়ে দিন দিন বাড়তে কেন? কেউ বলতে পারবেন?"
আইনি বিশ্লেষণ
বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৭৭ ধারা মতে সমকামী বিয়ে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ, তবে ট্রান্সজেন্ডার বিয়ের বিষয়ে কোনো উল্লেখ নেই। এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী ব্যারিস্টার শফিকুল ইসলাম সোহেল জানান, ঘটনায় দুটি অপরাধ সংঘটিত হয়েছে বলে মনে হয়—একটি ট্রান্সজেন্ডার বিয়ে, যদিও এ বিষয়ে বাংলাদেশে কোনো আইন থাকার কথা জানা নেই তার, এবং অন্যটি এনআইডি জালিয়াতি। এক্ষেত্রে প্রশাসন চাইলে ব্যবস্থা নিতে পারে অথবা কেউ সংক্ষুব্ধ হয়ে মামলা করে আইনি প্রতিকার চাইতে পারেন বলে তিনি জানান।
সাক্ষীদের বক্তব্য
বিয়েতে সাক্ষী করা তিনজনের মধ্যে দুজনের মোবাইল নম্বর বন্ধ পাওয়া গেছে—রুম্পা দাস ও সুদীপ্ত সরকার নামে উল্লেখিত সাক্ষীদ্বয়ের। তৃতীয় সাক্ষী রেখা রাণী রায়কে বিয়ে সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন, এসব বিষয়ে তিনি কিছুই জানেন না এবং কিছু বলতে পারছেন না। পাত্রী তাসনুভা আনান ওরফে শিশির বিশ্বাস এবং পাত্র লিটন চন্দ্র বিশ্বাসের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
পুলিশ ও প্রশাসনের বক্তব্য
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) চকবাজার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শেখ আশরাফুজ্জামান মামুন বলেন, বিষয়টি স্পর্শকাতর হওয়ায় এ নিয়ে মিডিয়া সেল বা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন তিনি এবং এ বিষয়ে কিছু বলতে অপারগতা প্রকাশ করেন। তবে ডিএমপির লালবাগ বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) মো. তালেবুর রহমান বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সংশ্লিষ্ট বিয়ের খবর দেখার পর মন্দির কর্তৃপক্ষ পুলিশকে কিছু কাগজপত্র সরবরাহ করেছে, যা তারা পর্যালোচনা করেছেন। তবে পাত্রী মুসলিম কি না তা তাদের জানা নেই এবং কেউ অভিযোগ করলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।
হেফাজতে ইসলামের নায়েবে আমির মহিউদ্দিন রাব্বানি বলেন, দেশের রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম এবং এ ধরনের বিয়ে দেশে নিষিদ্ধ ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ বলে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এরপরও ঢাকেশ্বরী মন্দিরে প্রকাশ্যে এমন বিয়ে হওয়া সত্ত্বেও প্রশাসন ও সরকার বিষয়টি আমলে নিচ্ছে না, যা মোটেই ভালো লক্ষণ নয়। বিষয়টি নিয়ে তারা নিজেদের মধ্যে আলোচনা করেছেন এবং সংগঠনের পরবর্তী বৈঠকে এ নিয়ে আলোচনা করে করণীয় নির্ধারণ করা হবে বলে জানান তিনি।
আরও পড়ুন:








