মঙ্গলবার

৪ আগস্ট, ২০২৬ ২০ শ্রাবণ, ১৪৩৩

বিরোধী জোট ছাড়াই সংবিধান সংশোধন শুরু করছে সরকার

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ৪ আগস্ট, ২০২৬ ০৮:৩৩

শেয়ার

বিরোধী জোট ছাড়াই সংবিধান সংশোধন শুরু করছে সরকার
ছবি সংগৃহীত

সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত বিশেষ কমিটিতে নাম দেয়নি সংসদের বিরোধী জোট। ফলে বিরোধী দল ছাড়াই সংবিধান সংশোধনের প্রক্রিয়া শুরু করছে ক্ষমতাসীন জোট।

সংবিধান সংশোধনের লক্ষ্যে গঠিত ১২ সদস্যবিশিষ্ট বিশেষ কমিটি মঙ্গলবার (৪ আগস্ট) প্রথম বৈঠকে বসছে। সংসদ ভবনের কেবিনেট কক্ষে বেলা ১২টায় অনুষ্ঠিতব্য বৈঠকে সভাপতিত্ব করবেন কমিটির সভাপতি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।

সংসদ সচিবালয় সূত্রে জানা গেছে, প্রথম বৈঠকে সদস্যদের পরিচিতি, কমিটির কার্যপরিধি, কর্মকৌশল এবং সংবিধান সংশোধন প্রক্রিয়া নিয়ে প্রাথমিক আলোচনা হবে। মূলত দ্বিতীয় বৈঠক থেকে সংবিধান সংশোধন-সংক্রান্ত সুপারিশ প্রণয়নের কার্যকর আলোচনা শুরু হবে।

চলতি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় অধিবেশনে গত **রবিবার (১৩ জুলাই)** স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকে সভাপতি করে ১২ সদস্যের ‘সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত বিশেষ কমিটি’ গঠন করা হয়। কমিটির কার্যপরিধি নির্ধারণ করা হয়েছে, ‘সংবিধানের প্রয়োজনীয় সংশোধনের নিমিত্ত সুপারিশ প্রণয়নপূর্বক সংসদে রিপোর্ট পেশ’। তবে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার জন্য কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়নি।

সরকারি দল বিরোধী জোটের কাছ থেকে কমিটিতে পাঁচজন সদস্যের নাম চেয়েছিল। কিন্তু বিরোধী দল কোনো নাম দেয়নি। কমিটি গঠনের দিনই তারা সংসদ থেকে ওয়াকআউট করে এ কমিটি প্রত্যাখ্যান করে।

সেদিন বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বলেন, এ ধরনের কমিটি গঠনের বিষয়ে তাদের মৌলিক মতপার্থক্য রয়েছে। সংশোধন নয়, তারা সংবিধান সংস্কার চান।

সংসদ নেতা তারেক রহমানের পক্ষে চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি কমিটি গঠনের প্রস্তাব উত্থাপন করেন। তিনি জানান, বিরোধী দলের নেতাদের সঙ্গে একাধিক দফা আলোচনা হলেও তারা কোনো সদস্যের নাম দেননি। তাই আপাতত পাঁচটি সদস্যপদ শূন্য রেখে ১২ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে। পরে বিরোধী দল নাম দিলে তাদের অন্তর্ভুক্ত করে কমিটি পুনর্গঠন করা হবে। তবে এখন পর্যন্ত তারা কোনো নাম দেয়নি।

বিশেষ কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন, চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি, আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান, বিএনপির সংসদ সদস্য জয়নাল আবেদিন, মীর হেলাল উদ্দিন, ফারজানা শারমিন, শাকিলা ফারজানা, মাহমুদুল হক, গণসংহতি আন্দোলনের সংসদ সদস্য জুনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির (বিজেপি) সংসদ সদস্য আন্দালিব রহমান পার্থ, গণঅধিকার পরিষদের সংসদ সদস্য নুরুল হক এবং ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের সংসদ সদস্য মো. অলিউল্লাহ।

চিফ হুইপের বক্তব্যের জবাবে বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান বলেন, তারা কখনোই এই কমিটিতে সদস্য দেওয়ার কথা বলেননি। জাতির কাছে দেওয়া অঙ্গীকার অনুযায়ী তারা গণভোটের রায় বাস্তবায়নে সংসদ সদস্য এবং সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে দুটি শপথ নিয়েছেন। তিনি বলেন, “ওইটাকে যদি বাইপাস করার জন্য এই কমিটি গঠন করা হয় তাহলে আমরা এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করছি। আমরা আমাদের আগের অবস্থানেই আছি।”

বিরোধী দলের ওয়াকআউটের পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, বিরোধী দলের অবস্থান তাদের রাজনৈতিক বিবেচনা হতে পারে। তবে বর্তমান সংবিধানের কাঠামোর মধ্যেই প্রয়োজনীয় সংশোধন আনতে হবে। বর্তমান সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচন হয়েছে এবং জাতীয় সংসদ গঠিত হয়েছে। তাই সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা অস্বীকার করার সুযোগ নেই।

তিনি আরও বলেন, সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেওয়ার কোনো সাংবিধানিক ভিত্তি নেই। জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ অবৈধ এবং এটি ‘কালারেবল লেজিসলেশন’। আগে সংবিধান সংশোধন করতে হবে। পরে রাজনৈতিক ঐকমত্যের ভিত্তিতে প্রয়োজন হলে সংবিধানে সংস্কার পরিষদের বিধান যুক্ত করা যেতে পারে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, বিশেষ কমিটি বিচার বিভাগ, আইনজীবী, সংবিধান বিশেষজ্ঞ, বুদ্ধিজীবী, সংবাদপত্রের সম্পাদক, বিভিন্ন অংশীজন এবং জুলাই জাতীয় সনদে স্বাক্ষরকারী রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করবে। এরপর তাদের সুপারিশের ভিত্তিতে সংবিধানের ১৮তম সংশোধনী বিল সংসদে উত্থাপন করা হবে।

উল্লেখ্য, ড. মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন জুলাই জাতীয় সনদ প্রণয়ন করে। সনদের ৪৮টি প্রস্তাব সংবিধান-সংক্রান্ত। এর মধ্যে কয়েকটি মৌলিক সংস্কার প্রস্তাবে বিএনপির ভিন্নমত রয়েছে। বিএনপি নিজেদের অবস্থান অনুযায়ী সংবিধান সংশোধনের পক্ষে। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)সহ বিরোধী জোট সংবিধান সংস্কার পরিষদের মাধ্যমে জুলাই সনদের সংবিধান-সম্পর্কিত প্রস্তাব বাস্তবায়নের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।

জুলাই জাতীয় সনদের সংবিধান-সংক্রান্ত ৪৮টি প্রস্তাব বাস্তবায়নের লক্ষ্যে অনুষ্ঠিত গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট বিজয়ী হয়। এরপর সংসদ সদস্যদের নিয়মিত দায়িত্বের পাশাপাশি সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবেও কাজ করার কথা ছিল। তবে বিএনপি ও তাদের জোটের নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা এ পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ না নেওয়ায় পরিষদ গঠিত হয়নি। অন্যদিকে বিরোধী দলের সদস্যরা শপথ নিয়েছিলেন। জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশ অনুযায়ী, সংবিধান সংস্কার পরিষদের প্রথম অধিবেশন আহ্বানের নির্ধারিত সময় (১৫ মার্চ) শেষ হয়ে গেছে।



banner close
banner close