২০২৪ সালের রবিবার ৪ আগস্ট। জুলাই আন্দোলনের সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী দিনগুলোর একটি। একদিকে সারাদেশে চলছিল বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ঘোষিত সর্বাত্মক অসহযোগ কর্মসূচি, অন্যদিকে সংঘর্ষ, গুলিবর্ষণ ও প্রাণহানিতে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। দিনশেষে আন্দোলনের গতিপথই বদলে যায়। মঙ্গলবার ৬ আগস্টের জন্য ঘোষিত মার্চ টু ঢাকা কর্মসূচি একদিন এগিয়ে এনে সোমবার ৫ আগস্ট নির্ধারণ করে আন্দোলনের সমন্বয়করা।
সারাদেশে সংঘটিত সহিংসতা ও প্রাণহানির প্রেক্ষাপটে বিকেলে রাজধানীর শাহবাগে আন্দোলনকারীদের উদ্দেশে বক্তব্য দেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ সরকার গৃহযুদ্ধের পরিস্থিতি তৈরির উদ্দেশ্যে দলীয় সন্ত্রাসীদের মাঠে নামিয়েছে। তিনি জানান, আন্দোলনের লক্ষ্য একটাই, জনগণের বিজয়। সরকার যদি দমন-পীড়ন অব্যাহত রাখে, তাহলে গণভবনের দিকেই অগ্রসর হবে ছাত্র-জনতা। পাশাপাশি তিনি দেশজুড়ে প্রতিটি পাড়া-মহল্লায় প্রতিরোধ সংগ্রাম কমিটি গঠনের আহ্বান জানান এবং সরকারের পতন না হওয়া পর্যন্ত শাহবাগে অবস্থান কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন।
সন্ধ্যা ছয়টার দিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে নিহতদের মরদেহ নিয়ে মিছিল বের করে আন্দোলনকারীরা। মিছিলটি টিএসসি হয়ে শাহবাগে পৌঁছায়। পথে তারা আমার ভাই মরলো কেন, শেখ হাসিনা জবাব চাই, দফা এক, দাবি এক, শেখ হাসিনার পদত্যাগসহ বিভিন্ন স্লোগান দেন।
শাহবাগ থানার সামনে পৌঁছালে পুলিশ অভিযোগ করে, মিছিল থেকে থানাকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করা হয়েছে। এরপর টিয়ার গ্যাস ও সাউন্ড গ্রেনেড ছুড়ে মিছিল ছত্রভঙ্গ করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এর আগের দিন এক দফা দাবির পাশাপাশি অসহযোগ আন্দোলন সফল করতে ১৫ দফা নির্দেশনা দিয়েছিলেন আন্দোলনের সমন্বয়করা।
রবিবার ৪ আগস্ট সকাল তুলনামূলক শান্ত থাকলেও দুপুরের পর পরিস্থিতি দ্রুত সহিংস হয়ে ওঠে। সরকারপন্থী সন্ত্রাসী, পুলিশ ও আন্দোলনকারীদের সংঘর্ষে অন্তত ২০টি জেলায় প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। একদিনেই অন্তত ৯৩ জন নিহত হন। সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জে পাঁচজন এবং রাজধানী ঢাকায় অন্তত ১২ জন নিহত হওয়ার খবর পাওয়া যায়। তাদের অধিকাংশকেই ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আনা হয়।
সহিংসতার মধ্যে দেশের বিভিন্ন স্থানে আওয়ামী লীগের কার্যালয় ও নেতাদের বাড়িতে প্রতিবাদের আগুন জ্বালিয়ে দেয় ছাত্র-জনতা। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকার সন্ধ্যা ছয়টা থেকে দেশব্যাপী অনির্দিষ্টকালের কারফিউ জারি করে, বন্ধ করে দেয়া হয় ফোর-জি মোবাইল ইন্টারনেট। একইসঙ্গে সোমবার ৫ আগস্ট থেকে টানা তিন দিনের সরকারি ছুটিও ঘোষণা করা হয়।
মঙ্গলবার ১৬ জুলাই আন্দোলন সহিংস রূপ নেয়ার পর থেকে রবিবার ৪ আগস্ট পর্যন্ত বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, প্রাণহানির সংখ্যা দাঁড়ায় অন্তত ৩১১ জনে। তবে প্রকৃত সংখ্যা ছিলো ততদিনে আরও বেশি।
রবিবার ৪ আগস্ট রাজধানীর শাহবাগ, সায়েন্সল্যাব, যাত্রাবাড়ী, মহাখালী, ধানমন্ডি-২৭, মিরপুর-১০, উত্তরা, রামপুরা ও বাড্ডাসহ বিভিন্ন এলাকায় হাজার হাজার মানুষ বিক্ষোভে অংশ নেন। শিক্ষার্থী, শিক্ষক, অভিভাবক, দিনমজুর, সমাজকর্মী ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ এতে যোগ দেন। বাংলামোটর, কারওয়ান বাজার, শাহবাগ, সায়েন্সল্যাব, মিরপুর, যাত্রাবাড়ী ও মোহাম্মদপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় আন্দোলনকারীদের সঙ্গে সরকারপন্থী সন্ত্রাসী ও পুলিশের ত্রিমুখী সংঘর্ষ হয়।
শাহবাগে আন্দোলনকারীদের বাঁধা দিতে আসলে, ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীদের রুখে দেয় ছাত্র-জনতা। একপর্যায়ে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা তৎকালীন শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, বর্তমানে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে পালিয়ে আশ্রয় নেয়। পরে, হাসপাতাল এলাকায় অন্তত ২৪টি যানবাহনে আগুন দেয়ার ঘটনা ঘটে।
মিরপুর-১০-ও পরিণত হয় প্রতিবাদের অন্যতম কেন্দ্রে। সেখানে পুলিশ ও অস্ত্রধারী সরকারপন্থী সন্ত্রাসীদের অবস্থানের মধ্যে গুলির শব্দে পুরো এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
এছাড়া, ঢাকার বাইরে লক্ষ্মীপুরে অন্তত আটজন, ফেনীতে আটজন, রংপুরে চারজন, বগুড়ায় পাঁচজন, সিলেটে চারজন, পাবনায় তিনজন, মুন্সিগঞ্জে তিনজন, মাগুরায় চারজন, কিশোরগঞ্জে তিনজন এবং কুমিল্লায় তিনজন নিহত হওয়ার খবর পাওয়া যায় তাৎক্ষণিকভাবে।
ফরিদপুরে আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের কার্যালয় গুড়িয়ে দেয় আন্দোলনকারীরা। পরে কোতোয়ালী থানায় হামলার অভিযোগে পুলিশ গুলি, টিয়ারশেল ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চালায়।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ঘোষণায় রাজধানী, বিভাগীয় শহর, জেলা সদর, উপজেলা সদর, পৌরসভা, সিটি করপোরেশন ও শিল্পাঞ্চলে সন্ধ্যা ছয়টা থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য কারফিউ কার্যকর করা হয়। তবে কারফিউ জারির পরও চট্টগ্রাম, সিলেট, রাজশাহী, খুলনা, বরিশাল, কুমিল্লা, লক্ষ্মীপুর, মুন্সিগঞ্জ, পাবনা, সিরাজগঞ্জ, ফেনী, রংপুর, ময়মনসিংহ, জয়পুরহাট ও ভোলাসহ বিভিন্ন এলাকায় বিক্ষোভ অব্যাহত ছিল। মূলত, এদিনই সারাদেশের আওয়ামী সন্ত্রাসী বাহিনীকে কঠোর জবাব দেয় ছাত্র-জনতা। দেশের প্রায় সব জেলা এদিন, স্বৈরাচার মুক্ত করে আন্দোলনকারীরা।
এর আগে, শুক্রবার ১৯ জুলাই প্রথম দফায় দেশব্যাপী অনির্দিষ্টকালের কারফিউ জারি করেছিল সরকার, যা পরে ধাপে ধাপে শিথিল করা হয়। রবিবার ৪ আগস্ট ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ বা টিআইবি এক বিবৃতিতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ ও প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের নিন্দা জানায়।
বিবৃতিতে টিআইবি দাবি করে, একটি শান্তিপূর্ণ ছাত্র আন্দোলনকে পরিকল্পিতভাবে সহিংসতার দিকে ঠেলে দেয়া হয়েছে এবং যারা এই দমন-পীড়নের নির্দেশ ও অনুমোদন দিয়েছেন, তাদের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।
একই দিনে বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্ক একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের প্রস্তাব তুলে ধরে। ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ জানান, শিক্ষক, বিচারক, আইনজীবী ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণে একটি গণতান্ত্রিক রূপান্তর প্রক্রিয়া শুরু হওয়া প্রয়োজন।
প্রস্তাবে বলা হয়, আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সদস্য নির্বাচনে মুখ্য ভূমিকা পালন করবে এবং শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার স্বেচ্ছায় ক্ষমতা হস্তান্তর করবে। একই দিন আন্দোলনকারীদের ওপর গুলি চালানো বন্ধে করা একটি রিট আবেদন খারিজ করে দেয় হাইকোর্ট। তৎকালীন স্বৈরাচারী সরকারের আজ্ঞাবহ আদালত পর্যবেক্ষণে বলে, দায়িত্ব পালনের জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনী প্রয়োজনীয় বলপ্রয়োগ করতে পারে।
রবিবার ৪ আগস্টের ভয়াবহ প্রাণহানি, দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়া সংঘর্ষ, কারফিউ এবং কঠোর দমন-পীড়নের মধ্যেও আন্দোলন থামেনি। বরং এই রক্তাক্ত দিনই আন্দোলনের কৌশল ও গন্তব্য বদলে দেয়। এক দফার দাবিতে সরকারের পদত্যাগকে সামনে রেখে আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে মার্চ টু ঢাকা। এরই ধাবাবাহিকতায় পরদিন, সোমবার ৫ আগস্ট, বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে আসে এক নাটকীয় মোড়।
আরও পড়ুন:








