দীর্ঘ ১৭ বছরের কূটনৈতিক স্থবিরতা কাটিয়ে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে সূচিত হয়েছে এক নতুন অধ্যায়। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের একমুখী পররাষ্ট্রনীতির ফলে দুই দেশের সম্পর্কে যে দূরত্ব তৈরি হয়েছিল চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী প্রেক্ষাপটে তা পারস্পরিক সহযোগিতায় রূপ নিয়েছে।
দক্ষিণ এশিয়ার এই দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে পাকিস্তান থেকে গাড়ি আমদানির ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ। পাকিস্তানের নির্মাতা প্রতিষ্ঠান এমজিজেডব্লিউ মোবাইল পাকিস্তান এবং বাংলাদেশের রেনকন গ্রুপের মধ্যে সম্প্রতি একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে। চুক্তি অনুযায়ী চলতি বছরই স্থানীয়ভাবে সংযোজিত ব্রিটিশ উৎসের ১০০টি এমজি ব্র্যান্ডের সেডান ও স্পোর্টস ইউটিলিটি ভেহিক্যাল বা এসইউভি বাংলাদেশে আসবে যা আগামী চার বছরে পর্যায়ক্রমে ৫ হাজার ৮০০টিতে উন্নীত করা হবে।
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর শিল্প ও উৎপাদন বিষয়ক বিশেষ সহকারী হারুন আখতার খান এটিকে রপ্তানি বাণিজ্যের মাইলফলক হিসেবে উল্লেখ করেছেন। রেনকন গ্রুপের নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ মুস্তাফিজুর রশিদ ভূঁইয়ার মতে এই উদ্যোগের ফলে জাপানি রিকন্ডিশন ও ভারতীয় ছোট গাড়ির একচ্ছত্র আধিপত্যের বাজারে ভারসাম্যপূর্ণ প্রতিযোগিতা তৈরি হবে এবং ক্রেতারা মানসম্মত গাড়ি পাবে।
এর আগেও সাম্প্রতিক সময়ে নানাভাবে বাংলাদেশ এবং পাকিস্তানের মধ্যে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক লক্ষ করা গেছে। দীর্ঘ ১৪ বছর বন্ধ থাকার পর বৃহস্পতিবার ২৯ জানুয়ারি ২০২৬ থেকে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের মাধ্যমে ঢাকা ও করাচির মধ্যে সরাসরি ফ্লাইট পুনরায় চালু হয়েছে। উদ্বোধনী ফ্লাইটটি করাচির জিন্নাহ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করে এবং সেখানে উষ্ণ সংবর্ধনা জানানো হয়। এসময় সেখানে যাত্রীদের রাজসিক অভ্যর্থনা জানানো হয় যা পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন পিটিভি ও ডন নিউজসহ আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে গুরুত্বের সঙ্গে প্রচারিত হয়েছে। দুবাই বা কাতার হয়ে যাত্রার ভোগান্তি কমায় এই রুট নিয়ে এমিরেটসসহ বিদেশি এয়ারলাইন্সগুলোও আগ্রহ দেখাচ্ছে। এর ফলে পর্যটন ও চিকিৎসার পাশাপাশি পোশাক প্রসাধনী জুয়েলারি এবং কৃষিপণ্য বাণিজ্যে নতুন গতি আসবে।
১৯৭১ সালের পর ২০২৪ সালে প্রথমবারের মতো পানামা পতাকাবাহী জাহাজ ইউয়ান জিয়াংফাং সরাসরি চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছানোর মাধ্যমে দুই দেশের নৌ-বাণিজ্যের সূচনা হয়। এতে একদিকে বাঁচবে সময় আরেক দিকে অর্থ।
অন্যদিকে কৌশলগত সম্পর্ক জোরদারে সোমবার ১৩ জানুয়ারি ২০২৫ সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার লেফটেন্যান্ট জেনারেল এস এম কামরুল হাসানের নেতৃত্বে ৬ সদস্যের একটি সামরিক প্রতিনিধি দল পাকিস্তান সফর করে। তারা দেশটির তিন বাহিনীর প্রধানসহ ঊর্ধ্বতন সামরিক কর্মকর্তাদের সঙ্গে প্রশিক্ষণ ও পেশাগত সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা করে।
এছাড়াও সম্প্রতি বাংলাদেশের উত্তর ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলে ভয়াবহ পাহাড়ি ঢল ও বন্যায় অর্ধশতাধিক মানুষের প্রাণহানি এবং ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির ঘটনায় পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরীফ তার ভেরিফায়েড এক্স হ্যান্ডেলে গভীর শোক ও সংহতি প্রকাশ করেছেন।
কূটনৈতিক সম্পর্কের এই উষ্ণতা ছড়িয়ে পড়েছে শিক্ষা ও ক্রীড়াঙ্গনেও। গত ২১ জুন শিক্ষামন্ত্রীর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎকালে ঢাকায় নিযুক্ত পাকিস্তানের হাইকমিশনার ইমরান হায়দার বাংলাদেশের সরকারি স্কুলগুলোর জন্য ১ হাজার ফুটবল উপহার দেয়ার কথা জানান। একইভাবে পাকিস্তানের উচ্চশিক্ষা কমিশন এবং শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যদের সমন্বয়ে একটি প্রতিনিধি দল ঢাকা সফর করে বাংলাদেশের ৫০০ শিক্ষার্থীর জন্য শতভাগ পর্যন্ত স্কলারশিপের ঘোষণা দিয়েছে। এর ফলে দেশের শিক্ষার্থীদের প্রকৌশল চিকিৎসাবিজ্ঞান এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে উচ্চশিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারিত হবে।
এসবের পাশাপাশি বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় সভাপতির পাকিস্তান সফরকালে তাকে দেয়া উষ্ণ অভ্যর্থনা দুই দেশের রাজনৈতিক সম্প্রীতির ইঙ্গিত দেয়।
বিশ্লেষকদের মতে কারো একচ্ছত্র প্রভাব এড়িয়ে সমমর্যাদা এবং গিভ অ্যান্ড টেক নীতির ভিত্তিতে বাংলাদেশ-পাকিস্তানের এই সমীকরণ আগামী দিনে দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে পাকিস্তানের সঙ্গে যে সম্ভাবনাময় সম্পর্ক তৈরি হয়েছে সেই সম্পর্ককে বর্তমান বিএনপি সরকার আরো বন্ধুত্বপূর্ণ ও সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্কে রূপ দিচ্ছে বলেই মনে করছে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
আরও পড়ুন:








