সোমবার

৩ আগস্ট, ২০২৬ ১৯ শ্রাবণ, ১৪৩৩

পাঁচ আগস্টকে পুলিশ হত্যা দিবস হিসবে প্রচার আওয়ামী লীগের

নিউজ ডেস্ক: বাংলা এডিশন

প্রকাশিত: ৩ আগস্ট, ২০২৬ ২০:২৭

শেয়ার

পাঁচ আগস্টকে পুলিশ হত্যা দিবস হিসবে প্রচার আওয়ামী লীগের
ছবি বাংলা এডিশন

২৪-এর জুলাই গণঅভ্যুত্থান। বাংলার ইতিহাসে এক রক্তস্নাত অধ্যায়। সেই উত্তাল সময় আজও মানুষের স্মৃতিপটে রয়ে গেছে অমোচনীয় ক্ষত হয়ে; কখনো এক বিভীষিকাময় কালরাত্রি, কখনো মৃত্যুমিছিলের হৃদয়বিদারক উপাখ্যান, আবার কখনো অগ্নিগর্ভ প্রতিরোধের এক চিরজাগ্রত প্রতীক। সময়ের স্রোত বহুদূর গড়িয়ে গেলেও সেই রক্তঝরা দিনগুলোর আর্তনাদ আজও যেন বাতাসের প্রতিটি প্রতিধ্বনিতে ফিরে ফিরে আসে।

বিশেষজ্ঞদের দৃষ্টিতে সেই আন্দোলন ছিল দীর্ঘদিনের অন্যায়, নিপীড়ন, বঞ্চনা ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে জনতার পুঞ্জীভূত ক্ষোভের এক বিস্ফোরণ। বছরের পর বছর জমে থাকা অপমান, ক্ষোভ ও বঞ্চনার বারুদের স্তূপে যেন এক মুহূর্তে জ্বলে ওঠে প্রতিরোধের অগ্নিস্ফুলিঙ্গ। ছাত্র-জনতার বুকের তাজা রক্তস্রোত, অসংখ্য আত্মত্যাগ এবং সাধারণ মানুষের অদম্য প্রত্যয়ের মধ্য দিয়েই রোপিত হয় সেই আন্দোলনের বীজ, যা পরবর্তীতে রূপ নেয় গণঅভ্যুত্থানের অপ্রতিরোধ্য মহাপ্লাবনে, যে প্লাবন ভাসিয়ে নিয়ে যায় ভয়, নিপীড়ন ও নতজানু নীরবতার এক দীর্ঘ অধ্যায়।

তবে, সেই আন্দোলনের চেতনা ও ভিত্তিকে ঘিরেই ষড়যন্ত্রের কালো নকশা বুনছে পতিত আওয়ামী লীগ। ৫ আগস্টকে পুলিশ হত্যা দিবস হিসেবে আখ্যায়িত করা, দেয়াল থেকে জুলাই মুছে আওয়ামী লীগের তৈরি বিষাক্ত স্লোগান প্রতিস্থাপন, এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ফ্যাসিস্ট সম্রাজ্ঞি শেখ হাসিনার বক্তব্য ও প্রচারণাকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে সৃষ্টি হয়েছে উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠার ঘন কালোমেঘ।

২৪-এর জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ৫ আগস্ট ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা পালিয়ে যাওয়ার পর হাসিনার ভাড়াটে পুলিশ বাহিনী হিংস্র নেকড়ের ন্যায় ক্ষমতাউন্মত্ত হয়ে ছাত্র-জনতার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। উত্তরা, যাত্রাবাড়ী, বাড্ডা ও রামপুরায় সেদিন শেখ হাসিনার পালিয়ে যাওয়ার খবর শুনে পুলিশ লীগ খ্যাত প্রশাসনের একটি অংশ বিজয়োল্লাসে মেতে থাকা শিক্ষার্থীদের ওপর নির্বিচারে হামলা চালায়; মুহুর্মুহু গুলিতে রক্তাক্ত করে তোলে রাজপথ। সেই বুলেটের ঝড়ে রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে শহিদ হন নানা পেশার মানুষ; বিজয়ের উল্লাস মুহূর্তেই রূপ নেয় শোকের জনপদে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, ছাত্র-জনতার ওপর পুলিশের সেই নির্মম হত্যাযজ্ঞের পরই ক্ষোভ ও আক্রোশ দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে। এবং তারই ধারাবাহিকতায় ৫ আগস্ট দেশের বিভিন্ন স্থানে হাসিনার দালালখ্যাত পুলিশদের প্রতিহত করে ছাত্র-জনতা। উত্তরা, যাত্রাবাড়ী, ভাটারাসহ বিভিন্ন থানায় প্রতিবাদের আগুন জ্বালিয়ে দেয় বিপ্লবীরা। এমন প্রতিরোধে, কয়েকজন পুলিশের মৃত্যুর সংবাদও সামনে আসে।

৫ আগস্টের এই বিচ্ছিন্ন ঘটনাকে কেন্দ্র করেই সম্প্রতি আওয়ামী লীগ তার অফিসিয়াল ফেসবুক পেজ থেকে শুরু করে বিভিন্ন মহলে অপপ্রচার চালিয়ে যাচ্ছে। ছাত্র-জনতার ওপর চালানো নির্মম হত্যাযজ্ঞকে আড়াল এবং স্বাভাবিক প্রমাণ করার উদ্দেশ্যেই ৫ আগস্ট পুলিশের একাংশের সঙ্গে ঘটে যাওয়া সেই বিচ্ছিন্ন ঘটনাকে পুঁজি করে নতুন ষড়যন্ত্রের নীলনকশা বোনা হচ্ছে।

তবে, রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, ৫ আগস্ট পুলিশের ওপর হামলার সেই ঘটনা পুরো জুলাই গণঅভ্যুত্থানে পুলিশ বাহিনী কর্তৃক ছাত্র-জনতার ওপর নির্মম হত্যাযজ্ঞেরই বহিঃপ্রকাশ। তাদের মতে, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে কিছু পুলিশ জনতার তোপের মুখে পড়ে নিহত হয়েছেন। এ কারণে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে যদি জুলাই যোদ্ধাদের বিরুদ্ধে পুলিশ হত্যার বিচার করতে হয়, তবে যুগে যুগে সব বিপ্লবীদেরই আইনের আওতায় আনার কথা।

অপরদিকে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পেজ থেকে করা বিভিন্ন পোস্টকে কেন্দ্র করেও রাজনৈতিক অঙ্গন ও নেটদুনিয়া জুড়ে তৈরি হয়েছে নানা আলোচনা-সমালোচনা। সম্প্রতি আওয়ামীলীগের অঙ্গসংগঠন স্বেচ্ছাসেবক লীগের পেজ থেকে শেখ মুজিবুর রহমানের মৃত্যু নিয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে জুলাইয়ের বিভিন্ন জাগরণী স্লোগান মুছে দিয়ে আওয়ামী লীগের প্ররোচনামূলক স্লোগান লিখতে দেখা যায়। এতে করে জুলাইকে অবমাননা করে ফ্যাসিবাদী শক্তির পুনর্জাগরণ ঘটছে, বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ফ্যাসিস্ট সম্রাজ্ঞি শেখ হাসিনার বক্তব্য ও প্রচারণাকে কেন্দ্র করেও জন্ম নিচ্ছে উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা। দলটির অফিসিয়াল ফেসবুক পেজ থেকে দেশের ভেতরে থাকা আওয়ামী লীগের তৃণমূলের নেতাকর্মীদের উদ্দেশে বিভিন্ন প্ররোচনামূলক বক্তব্য দেয়া হচ্ছে, যার মাধ্যমে দেশে অরাজকতা সৃষ্টির অভিযোগ উঠছে তাদের বিরুদ্ধে। সমালোচকদের মতে, এসব বক্তব্য আরো উসকে দিচ্ছে আওয়ামী সন্ত্রাসীদের।

এই অবস্থায়, আসছে পাঁচ আগস্ট প্রকাশ্যে আসার ঘোষণা দিয়ে, পরিস্থিতি গরম করেছে পলাতক হাসিনা।

এছাড়াও, বর্তমান সরকারের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পেজ থেকে নানা স্ট্যাটাসের মাধ্যমে উঠে আসছে বিভিন্ন অপপ্রচার। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, বাজারমূল্য সাধারণ মানুষের সাধ্যের বাইরে চলে যাওয়া, এমন নানা বিষয়কে অতিরঞ্জিতভাবে সামনে এনে বিভিন্ন প্রচারণায় সরব কার্যক্রম নিষিদ্ধ সংগঠন আওয়ামী লীগ। সংশ্লিষ্টদের দাবি, এসব প্রচারণার মাধ্যমে দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি এবং জনমনে বিভ্রান্তি ছড়ানোর অপপ্রয়াস চালানো হচ্ছে।

সব মিলিয়ে, এক বছর পেরিয়েও ২৪-এর জুলাই গণঅভ্যুত্থান শুধু ইতিহাসের একটি অধ্যায় হয়েই থেমে নেই; বরং তার চেতনা, ব্যাখ্যা ও উত্তরাধিকারকে ঘিরে এখনো বোনা হচ্ছে কালো নকশা। বিশ্লেষকদের ভাষায়, জুলাই সংরক্ষণ এবং জুলাই যোদ্ধাদের নিরাপত্তার জন্য আওয়ামী লীগের এসব অপপ্রচার ও অরাজকতার বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে। না হলে জুলাইকে ঘিরে এই ষড়যন্ত্রের কালো মেঘ একদিন, প্রশ্নের মুখে ফেলবে জুলাইয়ের সব চেতনা।



banner close
banner close