২৪-এর জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে ঘিরে মানুষের অন্তরে জেগে উঠেছিল এক স্বপ্নালোকিত ভোর, গড়ে উঠেছিল এক নতুন বাংলাদেশের আকাঙ্ক্ষা, জন্ম নিয়েছিল এক ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র বিনির্মাণের দীপ্ত প্রত্যাশা।
বিশ্লেষকরা বলছে, উত্তাল রাজপথে ছাত্র-জনতার রক্তস্রোত যেন বলছিলো এক আদর্শিক রূপান্তরের মন্ত্র; যার প্রতিবাদের প্রতিটি স্লোগান হয়ে উঠেছিল পরিবর্তনের অগ্নিস্ফুলিঙ্গ। দলমত নির্বিশেষে, মতভেদের সমস্ত প্রাচীর ভেঙে, মানুষ হাতে হাত রেখে একই ছাতার নিচে দাঁড়িয়ে নিয়েছিল নীতি-পুনর্বিন্যাসের এক অবিচল শপথ।
কিন্তু প্রশ্ন রয়েই যায়, যে বুকভরা প্রত্যাশা নিয়ে তারা পান করেছিল শাহাদাতের অমৃতসুধা, সেই স্বপ্ন কি আদৌ পূর্ণতার মুখ দেখেছে? নাকি সময়ের নির্মম আবর্তে, রাজনীতির অদৃশ্য গোলকধাঁধায়, তা নিঃশব্দে তলিয়ে যাচ্ছে কোনো এক গহিন স্বার্থের অতল অন্ধকারে? এই প্রশ্নই আজ প্রতিধ্বনিত হচ্ছে জনমনে, অপ্রাপ্তির এক দীর্ঘ ছায়া হয়ে।
সংশ্লিষ্টদের দাবি, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর গণমানুষের প্রধান প্রত্যাশাই ছিল, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে সংঘটিত গণহত্যার বিচার নিশ্চিত করা। কারণ ছাত্র-জনতার ওপর নির্বিচারে গুলি বর্ষণকারী ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ যেন কোনোভাবেই দেশের রাজনীতিতে সক্রিয় হতে না পারে, এই প্রত্যাশাই ছিল সবার।
কিন্তু বিপত্তি বাধে এখানেই। সমালোচনা রয়েছে, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দুই বছর পেরোলেও ছাত্র-জনতার প্রধান আকাঙ্ক্ষা আজও পূরণ হয়নি। সংশ্লিষ্টরা বলছে, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ছাত্র-জনতার প্রত্যাশার কেন্দ্রবিন্দু ছিল গণহত্যার বিচার এবং ফ্যাসিবাদী রাজনীতির বিলুপ্তি, কিন্তু এখনো তার কোনোটি বাস্তবায়িত হয়নি। এমনকি ফ্যাসিবাদের বিচার বাস্তবায়ন না হলে তা দেশের মানুষ এবং রাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্যই হুমকিস্বরূপ হয়ে উঠতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
অপরদিকে, শহীদ পরিবারের কণ্ঠে আজ হতাশার দীর্ঘশ্বাস, যে প্রত্যাশা বুকে ধারণ করে তারা ত্যাগ স্বীকার করেছিল, তার প্রতিফলন আজও অধরা। এ ছাড়া শহীদ পরিবার এবং আহতদের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়ন না করতে পারায় সরকারের প্রতি তীব্র ক্ষোভ ও সমালোচনা প্রকাশ করেছে জুলাই যোদ্ধারা।
এদিকে সংশ্লিষ্টদের একাংশের মধ্যে ভিন্ন সুরের অভিযোগও শোনা যাচ্ছে, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের হামলাকারী ফ্যাসিবাদের দোসররা আজও চোখের সামনে ঘুরে বেড়াচ্ছে। তাদের দাবি, এসব দোসর ভিন্ন ভিন্ন রূপে সমাজে প্রভাব বিস্তার করছে, কেউ কালচারাল ফ্যাসিস্ট হয়ে সামনে আসছে, কেউ আবার নারী কার্ড ব্যবহার করে অবস্থান নিচ্ছে। বর্তমান সরকার টিকে থাকার লড়াইয়ে এসব ফ্যাসিবাদী দোসরদের দ্রুত বিলুপ্ত করা জরুরি বলে মনে করছে তারা।
আবার অনেকে আশা করেছিল, জুলাই-পরবর্তী সময়ে বৈষম্যের অবসান ঘটবে। সিন্ডিকেট ও পরিবারতন্ত্রের যে নিয়মতান্ত্রিক ধারা দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছিল, তা বন্ধ করা হবে। কিন্তু এ ক্ষেত্রেও দেশের জনগণকে দায়িত্বশীলরা হতাশ করেছে বলে দাবি তাদের।
তথ্য বলছে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা যেমন ২৪-এর জুলাই গণঅভ্যুত্থানের হৃদপিণ্ড ছিল, তেমনি যাত্রাবাড়ীর মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা ছিল এই আন্দোলনের ডান হাত। সংশ্লিষ্টদের একাংশের অভিযোগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মতোই মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদেরও যথাযথ মূল্যায়ন করার কথা থাকলেও, মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদেরকে অবমূল্যায়ন করা হচ্ছে।
দেশের সর্বস্তরের মানুষ একত্রিত হয়েই স্বৈরাচারের পতন ঘটিয়েছে। তাই জুলাই গণঅভ্যুত্থান কারো একার ছিল না। এমনকি জুলাইয়ের কোনো একক মাস্টারমাইন্ডও নেই; বরং এটি ছিল ১৭ বছরের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের এক সম্মিলিত বিস্ফোরণ। এমনটাই বলছে, জুলাইয়ে মাঠে থাকা আন্দোলনকারীরা।
জুলাই আন্দোলনের পর অন্যতম প্রধান প্রত্যাশা ছিল, আহত ও শহীদ পরিবারের সুরক্ষা এবং পুনর্বাসন নিশ্চিত করা। কিন্তু পুনর্বাসন তো দূরের কথা, তাদের অনেকেরই যথাযথ চিকিৎসা ব্যবস্থাও নিশ্চিত করা হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। এমনকি সাংবিধানিক দোহাই দিয়ে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন না করার অভিযোগও তুলেছে তারা।
সব মিলিয়ে, সময়ের স্রোত বয়ে যায় তার নিজস্ব গতিতে, আর ইতিহাসও এগিয়ে চলে তার নিজস্ব ছন্দে, কিন্তু কিছু প্রশ্ন থেকে যায় অলিখিত কাব্য হয়ে। বিশ্লেষকদের মতে, জুলাই গণঅভ্যুত্থান কেবল একটি সময়ের বিস্ফোরণ ছিল না; এটি ছিল একটি জাতির বিবেকের জাগরণ। তাই জুলাইকে টিকিয়ে রাখতে হলে, দেশকে সুসংগঠিত করতে হলে প্রয়োজন জুলাই গণঅভ্যুত্থানে দেয়া প্রতিশ্রুতিগুলোর সঠিক বাস্তবায়ন।
আরও পড়ুন:








