সোমবার

৩ আগস্ট, ২০২৬ ১৯ শ্রাবণ, ১৪৩৩

৫৩৭ জনের দৃষ্টি কেড়ে নিয়েছে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী সরকার

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ৩ আগস্ট, ২০২৬ ০৯:৪৪

শেয়ার

৫৩৭ জনের দৃষ্টি কেড়ে নিয়েছে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী সরকার
ছবি সংগৃহীত

জুলাই বিপ্লবে ২০২৪ সালের বুধবার (১৭ জুলাই) থেকে সোমবার (৫ আগস্ট) পর্যন্ত ২০ দিনে গুলিবিদ্ধ হয়ে অন্তত ৫৩৭ জন দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছেন। তাদের মধ্যে ৪৪ জন দুই চোখের আলো হারিয়েছেন এবং ৪৯৩ জন এক চোখের দৃষ্টি হারিয়েছেন। জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশন ও জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, আহতদের অনেকেই এখনো চিকিৎসাধীন, অনেকের মাথায় গুলি রয়ে গেছে এবং অনেকে পুনর্বাসন ও রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির দাবিতে অপেক্ষা করছেন।

দৃষ্টিহীনদের চিত্র ও হাসপাতালের তথ্য

জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশন ও জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, দুই চোখের দৃষ্টি হারানো ৪৪ জনের মধ্যে ১৩ জন শিক্ষার্থী, পাঁচজন ব্যবসায়ী, চারজন গাড়িচালক, চারজন চাকরিজীবী, দুজন শ্রমিক, একজন গৃহিণী এবং ১৫ জনের পেশাগত পরিচয় জানা যায়নি। তাদের অনেকের মাথায় এখনো গুলি রয়ে গেছে। কাউকে আবার লাশ ভেবে ফেলে রাখা হয়েছিল।

চোখে আঘাত পাওয়া এসব ব্যক্তির অনেকেই ছিলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম সদস্য। বর্তমানে তাদের অধিকাংশই অন্যের সহায়তার ওপর নির্ভরশীল। সরকারি ভাতায় কোনোমতে জীবনযাপন করলেও অনেকের দাবি, তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। তাদের অভিযোগ, পুনর্বাসন ও রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির ক্ষেত্রেও এখনো উল্লেখযোগ্য ঘাটতি রয়েছে।

গত বছরের আগস্টে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ সাক্ষ্য দেন জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট হাসপাতালের রেটিনা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. জাকিয়া সুলতানা নীলা। তিনি ট্রাইব্যুনালকে জানান, আন্দোলনের সময় চোখে গুলিবিদ্ধ ৮৬৪ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন। তাদের মধ্যে ৪৯৩ জন স্থায়ীভাবে এক চোখের দৃষ্টিশক্তি হারান।

তিনি আরও জানান, অপারেশন থিয়েটারে দায়িত্ব পালনের সময় জরুরি বিভাগে গিয়ে শতাধিক আহত ব্যক্তিকে চিকিৎসার অপেক্ষায় দেখতে পান। অধিকাংশের বয়স ছিল ১৪ থেকে ২৫ বছরের মধ্যে। অনেকের কর্নিয়া, স্ক্লেরা ও চোখের অন্যান্য অংশ গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। তিনি বলেন, সব আহতের তালিকা করা সম্ভব হয়নি, কারণ হয়রানির আশঙ্কায় অনেকেই হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার সময় ভুল নাম ও ফোন নম্বর দিয়েছিলেন।

আমাকে লাশের সঙ্গে ফেলে রাখা হয়েছিল

সাব্বির আহমাদ জানান, রবিবার (৪ আগস্ট) ২০২৪ কারওয়ান বাজারে গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে তাকে লাশের সঙ্গে ফেলে রাখা হয়েছিল বলে তিনি দাবি করেন। পরে তিনি বেঁচে ফেরেন।

তিনি বলেন, দৃষ্টি হারালেও দেশের প্রতি তার ভালোবাসা কমেনি। ব্যক্তিগত জীবনের বেদনাও তুলে ধরে তিনি জানান, আড়াই মাস বয়সী একমাত্র সন্তানকে তিনি কখনো চোখে দেখেননি; স্পর্শ করেই সন্তানকে অনুভব করেন। সরকারি ভাতা দিয়ে সংসার চালানো কঠিন উল্লেখ করে তিনি যোগ্যতা অনুযায়ী কর্মসংস্থানের দাবি জানান।

গুলিটা এখনো মাথার ভেতরেই আছে

শনিবার (২০ জুলাই) ২০২৪ বাড্ডায় গুলিবিদ্ধ হয়ে দৃষ্টিশক্তি হারান দুর্জয় আহমেদ। তিনি বলেন, গুলিটি তার চোখে লাগার আগে আরও দুজনের মাথা ভেদ করে তার চোখে প্রবেশ করে এবং সেটি এখনো তার মাথার ভেতরেই রয়েছে।

তার দাবি, দুই চোখের আলো হারানো ব্যক্তিরা সমাজে অবহেলিত। তাদের চিকিৎসা, চলাফেরা ও দৈনন্দিন জীবন অত্যন্ত কষ্টকর হয়ে পড়েছে। তিনি পুনর্বাসন ও রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির দাবি জানান।

মৃত্যুর অপেক্ষাই বেশি

সোমবার (৫ আগস্ট) ২০২৪ মিরপুরে গুলিবিদ্ধ হয়ে দৃষ্টিশক্তি হারান মিজানুর রহমান। দুই চোখে পাঁচটি অস্ত্রোপচার হলেও তার দৃষ্টি ফেরেনি। আগে একজন প্রকৌশলীর গাড়িচালক হিসেবে মাসে ৩২ হাজার টাকা আয় করলেও বর্তমানে সরকারি ২০ হাজার টাকার ভাতায় চিকিৎসা, ওষুধ ও সংসারের ব্যয় মেটাতে হিমশিম খাচ্ছেন। তিনি বলেন, এখন তাদের কাছে চোখের আলো ফেরার চেয়ে মৃত্যুর অপেক্ষাই বেশি মনে হয়।

পরিবারের লড়াই আরও বেড়েছে

মোহাম্মদপুর বেড়িবাঁধ এলাকায় গুলিবিদ্ধ হয়ে দুই চোখের দৃষ্টি হারান নিলু পারভিন। আরবি পড়িয়ে বাড়ি ফেরার পথে তিনি আহত হন। তিনি জানান, এখন রান্নাঘরেও যেতে পারেন না। তার স্বামী দিনভর রিকশা চালানোর পাশাপাশি সংসারের কাজও করেন। দুই সন্তানকে ঠিকভাবে দেখাশোনা করতে না পারার কষ্টের কথাও তুলে ধরেন তিনি।

পুনর্বাসনের দাবি

দৃষ্টিশক্তি হারানো ব্যক্তিরা জুলাই সনদ বাস্তবায়ন, পুনর্বাসন এবং রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির দাবি জানিয়েছেন। তাদের মতে, জুলাইয়ের ঘোষিত আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে দল-মত নির্বিশেষে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে এবং রাষ্ট্রকে জুলাইয়ের শহীদ, যোদ্ধা ও তাদের পরিবারকে যথাযথ মর্যাদা দিতে হবে।

জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা লে. কর্নেল (অব.) কামাল আকবর বলেন, জুলাইয়ে চোখে গুলিবিদ্ধ মানুষের সংখ্যা হাজার হাজার। জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় এক হাজার আহতের মধ্যে ৪৪ জন দুই চোখের দৃষ্টি হারিয়েছেন।

তিনি জানান, অধিকাংশ আহত ব্যক্তি ৭.৬২ বুলেটে এবং বাকিরা প্যালেট (ছররা) গুলিতে আহত হয়েছেন। শত শত আহত ব্যক্তি এখনো চোখের ভেতরে প্যালেট নিয়ে অসহনীয় যন্ত্রণা সহ্য করছেন। তিনি আরও বলেন, আহতদের মনোবল ভাঙেনি এবং তাদের পুনর্বাসন ও সম্মান নিশ্চিত করাই এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।



banner close
banner close