শনিবার (৩ আগস্ট), আন্দোলনকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী ‘৩৪ জুলাই’, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন নতুন রাজনৈতিক মোড়ে পৌঁছে। রাজধানীর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে আয়োজিত বিশাল সমাবেশ থেকে আন্দোলনের অন্যতম প্রধান সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম এক দফা দাবি ঘোষণা করেন। বিকেল ৫টার দিকে সর্বস্তরের লাখ লাখ মানুষের উপস্থিতিতে তিনি তৎকালীন স্বৈরাচার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের পদত্যাগকে আন্দোলনের একমাত্র দাবি হিসেবে ঘোষণা করেন এবং সরকারের সংলাপের আহ্বান প্রত্যাখ্যান করেন।
গণভবনে বৈঠক ও সমাবেশে প্রতিক্রিয়া
এর আগে সকালে গণভবনে পেশাজীবী সমন্বয় পরিষদের নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে শেখ হাসিনা আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের আলোচনায় বসার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, গণভবনের দরজা খোলা এবং তিনি আর কোনো সংঘাত চান না। তবে, শহীদ মিনারের সমাবেশে নাহিদ ইসলাম স্পষ্ট করে জানান, শুধু প্রধানমন্ত্রীর নয়, পুরো স্বৈরাচারী মন্ত্রিসভার পদত্যাগই এখন আন্দোলনের দাবি। একইসঙ্গে আন্দোলনের সময় সংঘটিত হত্যা ও গুমের ঘটনার বিচারও দাবি করেন তিনি।
নাহিদ ইসলাম বলেন, এমন একটি রাজনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে যেখানে আর কখনও স্বৈরাচারের পুনরাবৃত্তি হবে না। তিনি দেশব্যাপী ছাত্র-জনতার গণজাগরণে অংশ নেয়ার আহ্বান জানান। পাশাপাশি সব শ্রেণি-পেশার মানুষের সমন্বয়ে একটি জাতীয় সংগ্রাম পরিষদ গঠনের ঘোষণা দেন এবং রবিবার (৪ আগস্ট) থেকে পূর্বঘোষিত সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলনে অংশ নিতে জনগণের প্রতি আহ্বান জানান।
সমাবেশে জনসমাগম ও স্লোগান
এদিন, সমাবেশ শুরুর অনেক আগে থেকেই বৃষ্টি উপেক্ষা করে হাজারো মানুষ জাতীয় পতাকা, ব্যানার ও প্ল্যাকার্ড নিয়ে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে জড়ো হতে থাকে। দোয়েল চত্বর, জগন্নাথ হল এলাকা, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সামনের সড়ক এবং শিববাড়ী মোড় পর্যন্ত লাখো মানুষের ঢল ছড়িয়ে পড়ে।
পুরো এলাকা মুখর হয়ে ওঠে, ’দফা এক, দাবি এক, শেখ হাসিনার পদত্যাগ’ স্লোগানে।
সমাবেশ পরবর্তী কর্মসূচি
সন্ধ্যা ৬টার দিকে শহীদ মিনারের সমাবেশ শেষ হলে আন্দোলনকারীরা টিএসসি এলাকায় গিয়ে রাজু ভাস্কর্যের চোখে লাল কাপড় বেঁধে প্রতীকী প্রতিবাদ জানায়। পরে সন্ধ্যা ৭টার দিকে তারা শাহবাগ মোড় অবরোধ করে। একই সমাবেশে আন্দোলনের আরেক সমন্বয়ক আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া অসহযোগ আন্দোলন সফল করতে জনগণের উদ্দেশে ১৫ দফা নির্দেশনা ঘোষণা করেন।
এই নির্দেশনায় কর ও ইউটিলিটি বিল পরিশোধ বন্ধ, সরকারি-বেসরকারি অফিস, আদালত, কল-কারখানা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখা, ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স না পাঠানো, সরকারি অনুষ্ঠান বর্জন, গণপরিবহন ও শিল্পকারখানা বন্ধ রাখা, পুলিশকে বিক্ষোভ দমনে অংশ না নেয়া এবং প্রশাসনকে অসহযোগিতার আহ্বানসহ বিভিন্ন কর্মসূচি তুলে ধরা হয়।
এছাড়া, রাজধানীর বাড্ডা, রামপুরা, বনশ্রী, সায়েন্সল্যাব, মিরপুর-১০সহ বিভিন্ন এলাকায়ও আন্দোলনকারীরা সড়ক অবরোধ করে। একই সময়ে কোটা আন্দোলনে নিহতদের বিচারের দাবিতে বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়।
অন্যদিকে অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তাদের পরিবারের সদস্যরা মিরপুর ডিওএইচএস এলাকায় সমাবেশ করে, আন্দোলনের সময় সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের বিচার দাবি করে।
দিনভর রাজধানীতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা সতর্ক অবস্থানে থাকলেও, অধিকাংশ স্থানে তারা সরাসরি বাধা দেয়নি।
সেনাপ্রধানের ব্রিফিং
এদিকে, সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান সেনা সদরদপ্তরের হেলমেট অডিটোরিয়ামে কর্মকর্তাদের উদ্দেশে নিয়মিত ব্রিফিংয়ে বলেন, যেকোনো পরিস্থিতিতে জনগণের জীবন, সম্পদ ও গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় স্থাপনার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। তিনি সেনা সদস্যদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া গুজব সম্পর্কে সতর্ক থাকার এবং পেশাদারিত্বের সঙ্গে দায়িত্ব পালনের নির্দেশ দেন।
একই দিন বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন বা বিএফইউজে ও ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন বা ডিইউজে, জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে বিক্ষোভ করে। তারা কোটা আন্দোলনের সময় নিহত চার সাংবাদিকের হত্যার বিচার এবং সরকারের পদত্যাগ দাবি করে।
রাজধানীর বাইরে আন্দোলন
রাজধানীর বাইরেও আন্দোলন বিস্তৃত হতে থাকে। দেশের বিভিন্ন মহাসড়ক অবরোধের মাধ্যমে রাজধানীর সঙ্গে বিভিন্ন অঞ্চলের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। বিকেলে যাত্রাবাড়ীতে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ করে আন্দোলনকারীরা। অন্যদিকে, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা সাভারে ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক অবরোধ করলে, বিপিএটিসি স্কুল অ্যান্ড কলেজ ও সাভার মডেল কলেজের শিক্ষার্থীরাও তাদের সঙ্গে যোগ দেয়।
সেইসাথে, সিলেট, কুমিল্লা, ফরিদপুর, টাঙ্গাইল ও জামালপুরে আন্দোলনকারীদের ওপর পুলিশ এবং তৎকালীন আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের সন্ত্রাসী বাহিনী হামলা চালায়। গাজীপুরে, হামলায় নিহত হয় কয়েকজন শিক্ষার্থী।
চট্টগ্রামে তৎকালীন স্বৈরাচারী সরকারের শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরীর বাসভবনে প্রতিবাদের আগুন জ্বালায় আন্দোলনকারীরা। একই দিনে, লালখান বাজারে ওই সরকারের দলীয় সংসদ সদস্য মহিউদ্দিন বাচ্চুর কার্যালয়ও প্রতিহত করে বিক্ষোভকারীরা।
রংপুরে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদের মৃত্যুর ঘটনায় দায়িত্বে থাকা দুই পুলিশ কর্মকর্তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয় এদিন।
কুমিল্লার রেসকোর্স এলাকায় দুপুরের দিকে ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও স্বেচ্ছাসেবক লীগের সন্ত্রাসীরা আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা ও গুলি চালায়।
এছাড়া, বগুড়ায় আন্দোলনকারীদের সঙ্গে পুলিশের দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়। পুলিশ টিয়ার শেল, সাউন্ড গ্রেনেড, রাবার বুলেট ও শটগানের গুলি ছোড়ে। সাতমাথা, সার্কিট হাউজ মোড়, রোমেনা আফাজ রোড, কালীবাড়ি, রেজাউল বাকী রোড ও জেলখানা মোড় এলাকায় সংঘর্ষে অন্তত ছয়জন শিক্ষার্থী গুলিবিদ্ধ হয়।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য ও আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া
অন্যদিকে, তৎকালীন ফ্যাসিস্টের দোসর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান সংবাদ সম্মেলনে বলেন, আন্দোলনটি আর কেবল ছাত্রদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এটি রাজনৈতিক রূপ নিয়েছে।
এদিকে, ২২ জন মার্কিন সিনেটর ও কংগ্রেস সদস্য মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিঙ্কেনকে লেখা এক চিঠিতে বাংলাদেশের গণতন্ত্র ও মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে। তারা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে সমন্বয় করে পরিস্থিতির অবনতি রোধে কার্যকর উদ্যোগ নেয়ার আহ্বান জানায়। ২ আগস্ট লেখা ওই চিঠিতে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ উত্থাপন করা হয়।
শনিবার (৩ আগস্ট)-এর শহীদ মিনারের এই সমাবেশে ‘এক দফা’ ঘোষণার মধ্য দিয়ে আন্দোলনের লক্ষ্য আনুষ্ঠানিকভাবে কোটা সংস্কারের দাবি থেকে সরকারের পদত্যাগের দাবিতে রূপান্তরিত হয়। একই সঙ্গে রবিবার (৪ আগস্ট) থেকে সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলনের ঘোষণায় স্পষ্ট হয়ে ওঠে, পরদিন থেকে আন্দোলন আরও বৃহত্তর রাজনৈতিক সংঘাতে প্রবেশ করতে যাচ্ছে।
আরও পড়ুন:








