রবিবার

২ আগস্ট, ২০২৬ ১৮ শ্রাবণ, ১৪৩৩

বাতাসে উড়ছে গ্যাস মাটির নিচে মৃত্যুফাঁদ

নিউজ ডেস্ক: বাংলা এডিশন

প্রকাশিত: ২ আগস্ট, ২০২৬ ১৮:৪১

শেয়ার

বাতাসে উড়ছে গ্যাস মাটির নিচে মৃত্যুফাঁদ
ছবি এআই মাধ্যমে তৈরি

গ্যাসের চরম সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়েও মিলছে না কাঙ্ক্ষিত গ্যাস। বাসাবাড়ির চুলায় আগুন জ্বলছে না, গ্যাসের অভাবে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে কলকারখানায়। অথচ ঠিক তখনই শূন্যে আকাশে উড়ে যাচ্ছে হাজার হাজার ঘনফুট মূল্যবান গ্যাস।

মাটির নিচের পাইপলাইন লিকেজ হয়ে এভাবেই প্রতিদিন ঘটছে সম্পদের এক অবিশ্বাস্য অপচয়। শুষ্ক দিনে যা সহজে চোখে পড়ে না। এক পশলা বৃষ্টি নামলেই ঢাকা, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন অলিগলির জমে থাকা পানিতে বুদবুদ কেটে ভেসে ওঠে গ্যাস বেরিয়ে যাওয়ার এই ভয়াবহ দৃশ্য।

বৃষ্টির পানিতে ভেসে ওঠা এই বুদবুদ কেবল পাইপলাইনের ছিদ্র নয়, এটি জাতীয় অর্থনীতির এক রক্তাক্ত ক্ষত। গ্যাস বেরিয়ে যাওয়ার এই ঘটনা থেকে মূলত দুটি বড় সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে, প্রথমত নিত্যদিনের বিপুল অপচয়, আর দ্বিতীয়ত যেকোনো মুহূর্তে মারাত্মক দুর্ঘটনার ঝুঁকি। তবে এর মধ্যে সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো অপচয়ের এই সীমাহীন মাত্রা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রতিদিন পাইপলাইনের লিকেজ ও সিস্টেম লসের মাধ্যমে যে পরিমাণ গ্যাস বাতাসে মিশে যাচ্ছে, তা যদি কার্যকরভাবে রোধ করা যেত, তাহলে বাংলাদেশে কোনো গ্যাসের সংকটই থাকত না।

অপচয় আর আতঙ্কের এই ভয়াবহ বাস্তবতা সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান শিল্পনগরী নারায়ণগঞ্জে। ১৯৬৪ সাল থেকে এই অঞ্চলে তিতাসের গ্যাস সরবরাহ শুরু হলেও, গত কয়েক দশকে গোয়ালপাড়া, গোয়ালাচিপা, কলেজ রোড, জামতলা, দেওভোগ কিংবা ফতুল্লার সস্তাপুর, জালকুড়ি ও পাগলার মতো জনবহুল এলাকাগুলোতে পাইপলাইনের কোনো আধুনিকীকরণ হয়নি। ৩০ থেকে ৪০ বছরের পুরোনো জরাজীর্ণ লাইন এবং বৈধ প্রায় ১ লাখ ৪৮ হাজার গ্রাহকের পাশাপাশি গড়ে ওঠা লক্ষাধিক অবৈধ সংযোগে ব্যবহৃত নিম্নমানের পাইপ ও রাইজার এখন পরিণত হয়েছে একেকটি উন্মুক্ত মৃত্যুফাঁদে।

লিকেজের এই ভয়াবহতা শুধু সম্পদের অপচয়েই থেমে নেই, তা প্রতিনিয়ত ডেকে আনছে মৃত্যু। বিভিন্ন সূত্র ও গণমাধ্যমের তথ্য অনুসারে, চলতি বছরের প্রথম পাঁচ মাসেই জেলায় পৌনে তিনশর বেশি অগ্নিকাণ্ড ও বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। গত তিন মাসেই অন্তত ৩০ জন দগ্ধ হয়েছেন, আর চিকিৎসাধীন অবস্থায় প্রাণ হারিয়েছেন ৭ জন।

২০২০ সাল থেকে হিসাব কষলে, শুধু গ্যাস বিস্ফোরণেই নারায়ণগঞ্জে ঝরে গেছে প্রায় ১০০ তাজা প্রাণ। গত (১০ মে) ও (১১ মে) ফতুল্লার উত্তর ভুঁইঘর ও লাকিবাজারে গ্যাস লিকেজ থেকে ঘটা পরপর দুটি বিস্ফোরণে একই পরিবারের সদস্যসহ বেশ কয়েকজনের প্রাণহানি ঘটে।

বাদ যায়নি শিল্পাঞ্চলও। গত (১৩ মে) সোনারগাঁয়ে একটি কারখানার ক্যান্টিনে জমে থাকা গ্যাসের বিস্ফোরণে দগ্ধ হন ১২ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী, যার মধ্যে দুজনের মৃত্যু হয়। এমনকি (১৪ জুলাই) কুতুবপুরে লাইন মেরামতের সময় স্বয়ং তিতাসের চারজন শ্রমিক বিস্ফোরণে দগ্ধ হন।

গ্যাস বিস্ফোরণে হতাহতের সুনির্দিষ্ট কোনো পরিসংখ্যান না থাকলেও, জেলায় প্রতিনিয়তই এ ধরনের দুর্ঘটনা ঘটছে বলে জানিয়েছেন নারায়ণগঞ্জ ফায়ার সার্ভিসের উপসহকারী পরিচালক আব্দুল্লাহ আল আরেফীন। আব্দুল্লাহ আল আরেফীন বাংলা এডিশনকে বলেন, ফায়ার সার্ভিস ও নগর পরিকল্পনাবিদদের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, অপরিকল্পিতভাবে লাইন স্থাপন, জরাজীর্ণ পাইপ এবং বাসাবাড়ির রান্নাঘরে পর্যাপ্ত ভেন্টিলেশন বা বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা না থাকাই এসব দুর্ঘটনার মূল কারণ। অনেক সময় চুলা ঠিকমতো বন্ধ না করায় অথবা পাইপের ছিদ্র দিয়ে ঘরে গ্যাস জমে থাকে। পরবর্তীতে সামান্য স্পার্ক বা বৈদ্যুতিক সুইচের আগুন পেলেই তা ভয়ংকর বোমার মতো বিস্ফোরিত হয়।

সচেতনতামূলক প্রচার বাড়ানোর পাশাপাশি ব্যবহারকারী ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে সতর্ক হওয়ার আহ্বান জানান ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের এই কর্মকর্তা।

বছরের পর বছর ধরে অলিগলিতে গ্যাসের এমন ভয়াবহ অপচয় এবং একের পর এক প্রাণঘাতী বিস্ফোরণ ঘটলেও নির্বিকার দায়িত্বশীল সংস্থাগুলো। স্থানীয় বাসিন্দারা বারবার অভিযোগ জানালেও স্থায়ী সংস্কারের বদলে খবর পেলে কেবল জরুরি দল পাঠিয়ে সাময়িক জোড়াতালি দিয়েই দায় সারার অভিযোগ রয়েছে কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে।

পাইপলাইনের এই সীমাহীন অপচয় এবং লিকেজ থেকে ঘটা দুর্ঘটনার বিষয়ে জানতে চাওয়া হলেও, তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষের কোনো কর্মকর্তা ক্যামেরার সামনে কথা বলতে রাজি হননি।

দায় এড়ানো আর নীরবতার এই সংস্কৃতিতে একদিকে যেমন শূন্যে উড়ে যাচ্ছে জাতীয় সম্পদ, অন্যদিকে চরম ঝুঁকিতে দিন কাটাচ্ছে দেশের মানুষ।

দেশের মূল্যবান খনিজ সম্পদ যখন ঘাটতির কারণে বিদেশ থেকে চড়া মূল্যে আমদানি করতে হচ্ছে, তখন মাটির নিচে পাইপলাইনের হাজারো ছিদ্র দিয়ে তা বাতাসে উড়িয়ে দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। ঢাকা, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জসহ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার পুরোনো সঞ্চালন লাইনগুলো আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে চিহ্নিত করে স্থায়ী সংস্কার করা না হলে, গ্যাসের সংকট যেমন কাটবে না, তেমনই থামানো যাবে না লিকেজের এই মৃত্যুর মিছিল।

বাতাসে উড়ে যাওয়া এই গ্যাস শুধু জ্বালানি নয়, এটি দেশের অর্থনীতি ও সাধারণ মানুষের নিরাপত্তার সরাসরি চালিকাশক্তি। কর্তৃপক্ষের নীরবতা ভেঙে কবে নাগাদ এই অপচয় ও মৃত্যুফাঁদের স্থায়ী সমাধান হবে, সেটাই এখন দেখার বিষয়।



banner close
banner close