রবিবার

২ আগস্ট, ২০২৬ ১৮ শ্রাবণ, ১৪৩৩

পিলখানায় ভারতের সম্পৃক্ততার রহস্য জেনে ফেলাই কাল হলো মেজর জাহিদের!

নিউজ ডেস্ক: বাংলা এডিশন

প্রকাশিত: ২ আগস্ট, ২০২৬ ০৮:৫৫

শেয়ার

পিলখানায় ভারতের সম্পৃক্ততার রহস্য জেনে ফেলাই কাল হলো মেজর জাহিদের!
ছবি বাংলা এডিশন

পিলখানা হত্যাকাণ্ডে ভারতের সম্পৃক্ততা ও অন্তরাল রহস্য জেনে ফেলাই কাল হয়েছিল সেনাবাহিনীর চৌকস কর্মকর্তা মেজর (অব.) জাহিদুল ইসলামের। অভিযোগ রয়েছে, সেই সত্য ধামাচাপা দিতেই ২০১৬ সালে রাজধানী মিরপুরের রূপনগরে ‘জঙ্গি নাটক’ সাজিয়ে তাকে নির্মমভাবে হত্যা করে বিগত আওয়ামী লীগ সরকার।

জঙ্গি নাটকে সহায়তা গণমাধ্যমের

৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৬। প্রতিটি টেলিভিশনের স্ক্রিন আর পত্রিকার পাতায় ব্রেকিং নিউজ, ঢাকার রূপনগরে পুলিশের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত দুর্ধর্ষ জঙ্গি কমান্ডার ‘মুরাদ’। তৎকালীন হাসিনার পুলিশ প্রশাসন দাবি করে, জাহিদুল ইসলাম নানা সময়ে বিভিন্ন নাম ব্যবহার করে জঙ্গি কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিলেন এবং নিজেকে বাঁচাতে প্রশাসনের ওপর হামলা করেছিলেন।

অভিযোগ রয়েছে, সেসময় স্বৈরাচার শেখ হাসিনা সরকারের পালিত প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারসহ একাধিক গণমাধ্যম সেদিন পুলিশের দেয়া স্ক্রিপ্ট বিন্দুমাত্র যাচাই করেনি। একতরফা ‘মিডিয়া ট্রায়াল’-এ একজন দেশপ্রেমিক সেনাকর্মকর্তার গায়ে সেঁটে দেয়া হয়েছিল উগ্রবাদের তকমা।

অথচ ২৪-এর গণঅভ্যুত্থানে ফ্যাসিবাদের পতনের পর বেরিয়ে আসে এক লোমহর্ষক রাষ্ট্রীয় ষড়যন্ত্রের ইতিহাস।

মেজর জাহিদের পরিচয় ও পিলখানার তথ্য

কুমিল্লার আদর্শ সদর উপজেলার পশ্চিম চানপুর গ্রামে জন্ম নেয়া জাহিদুল ইসলাম ২০০০ সালে ৪৩তম বিএমএ লং কোর্সে তৃতীয় স্থান অর্জন করে সেনাবাহিনীতে কমিশন পান। মেধার স্বাক্ষরে জেতেন ড. মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ গোল্ড মেডেল। কঙ্গোতে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশন, পাকিস্তানে মিড-ক্যারিয়ার কোর্স এবং কানাডায় উচ্চতর প্রশিক্ষণ শেষে সিলেট ও বগুড়া সেনানিবাসে সুনামের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। কিন্তু, সেনাবাহিনীতে অযোগ্যদের অনৈতিক পদোন্নতি, চাটুকারিতা ও বিশৃঙ্খলার বিরুদ্ধে সোচ্চার থাকায় রোষাণলে পড়েন এই সৎ অফিসার। বাধ্য হয়ে ২০১৫ সালে স্বেচ্ছায় অবসর নিয়ে পরিবারসহ ঢাকার উত্তরায় ভাড়া বাসায় ওঠেন তিনি।

২০০৯ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি। অভিযোগ রয়েছে, ভারতের নির্দেশে শেখ হাসিনা পিলখানায় হত্যাকাণ্ড চালান। সেদিন সেখানে কর্মরত তার কোর্সমেট শহীদ ক্যাপ্টেন মো. মাজহারুল হায়দার বগুড়া ক্যান্টনমেন্টে থাকা জাহিদকে ফোনে জানিয়েছিলেন, বিডিআরের পোশাকে কিছু অচেনা ‘হিন্দিভাষী ব্যক্তি’ অফিসারদের হত্যা করছে। পিলখানা বিদ্রোহে ভারতের সম্পৃক্ততা ও ভেতরের বিশ্বাসঘাতকদের স্পর্শকাতর তথ্য জেনে যাওয়ায় হাসিনা সরকারের সার্বক্ষণিক গোয়েন্দা নজরদারিতে ছিলেন তিনি। নজরদারি এড়াতে উত্তরা থেকে রূপনগরে বাসা বদলে সপরিবারে বিদেশে যাওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন জাহিদ। কিন্তু সেই সুযোগ দেয়নি স্বৈরাচার হাসিনার খুনি বাহিনী।

রূপনগরে নির্মম হত্যা ও পরিবারের ওপর নির্যাতন

২০১৬ সালের ২ সেপ্টেম্বর রাত ১১টার দিকে মিরপুর রূপনগরের বাসা থেকে জাহিদকে হাত বেঁধে নিচে এনে সরাসরি গুলি করে হত্যা করে রূপনগর থানা পুলিশ ও সিটিটিসি। তৎকালীন সিটিটিসি প্রধান মনিরুল ইসলামের তত্ত্বাবধানে মামলার এজাহারে পুলিশের ওপর চাকু ও পিস্তল নিয়ে হামলার নাটক সাজিয়ে ২৯ রাউন্ড গুলির কথা বলা হয়। অথচ প্রত্যক্ষদর্শী ও ফরেনসিক প্রমাণ বলছে, মৃত্যুর আগে মধ্যযুগীয় বর্বরতায় তার দুই হাত কাঁধ থেকে মুচড়ে ভেঙে চামড়ার সঙ্গে ঝুলিয়ে দেয়া হয়েছিল, প্রচণ্ড টর্চার ও শ্বাসরোধের পর নির্দয়ভাবে চোখ উঠিয়ে ফেলা হয় তার। সমালোচনা রয়েছে, এটি কোনো ক্রসফায়ার ছিল না, ছিল পিলখানার সাক্ষীকে স্তব্ধ করার ঠাণ্ডা মাথার খুন।

বর্বরতা এখানেই থামেনি। জাহিদকে হত্যার এক ঘণ্টা আগে রাত ১০টার দিকে তার স্ত্রী জেবুন্নাহার শিলা এবং ৫ বছর ও ১ বছরের দুই অবুঝ শিশুকে চোখ বেঁধে তুলে নেয়া হয় ডিবির অন্ধকার ‘আয়নাঘরে’। জাহিদকে ‘জঙ্গি’ বলে আদালতে জবানবন্দি দিতে জেবুন্নাহারের ওপর চলে অমানসিক নির্যাতন, অস্বীকৃতি জানালে দেয়া হয়, তার স্বামীকে হত্যার মতো পরিণতির হুমকি।

সাত দিন পর ৫ বছরের বড় মেয়ে জুনাইরা বিনতে জাহিদকে নানার বাড়ি পাঠানোর কথা বলে নিয়ে যায় তৎকালীন ডিবি পুলিশ। অথচ, ১০ সেপ্টেম্বর আজিমপুরে সাজানো অভিযান চালিয়ে অবুঝ শিশু জুনাইরাকেও ‘জঙ্গি’ হিসেবে উদ্ধারের নাটক প্রচার করা হয়।

ছোট মেয়েকে নিয়ে দীর্ঘ ৪ মাস ৭ দিন আয়নাঘরে গুম থাকার পর, ২০১৬ সালের ২৪ ডিসেম্বর আশকোনার একটি বাসা থেকে জেবুন্নাহারকে উদ্ধারের নতুন গল্প ফাঁদে পুলিশ। ডিবি কার্যালয়ে ১৬ দিনের টর্চার শেষে জাহিদের বিরুদ্ধে ১টি এবং তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে ২টি মিথ্যা জঙ্গি মামলা দিয়ে পাঠানো হয় কাশিমপুর কারাগারে। আর বিনা বিচারে ৪ বছর বন্দি থাকার পর ২০২০ সালে জামিন পান জেবুন্নাহার।

কিন্তু স্বামী হত্যার বিচার চাইতে পারেন, স্বৈরাচারের মনে এমন ভীতি থাকায় ২০২২ সালের ৩১ আগস্ট শেখ হাসিনার নির্দেশে জামিন বাতিল করে ফের জেবুন্নাহার অন্ধকার কারাগারে পাঠানো হয়।

গণঅভ্যুত্থানের পর মুক্তি ও আইনি লড়াই

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র জনতার গণঅভ্যুত্থান ফ্যাসিস্ট সরকারের পতনের পর, সেবছরেরই ৩১ আগস্ট অবশেষে জেল থেকে মুক্ত হন জেবুন্নাহার শিলা। দীর্ঘ আট বছর সমাজের বুকে ‘জঙ্গির পরিবার’ হিসেবে লাঞ্ছিত হওয়ার পর এখন স্বামীর হত্যার বিচার ও উচ্চপর্যায়ের স্বাধীন বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিশন গঠনের দাবি জানিয়েছেন তিনি।

অন্যদিকে, সেনাবাহিনীর চৌকস কর্মকর্তা মেজর (অব.) জাহিদুল ইসলামের মরদেহ দীর্ঘদিন ঢাকা মেডিকেল কলেজ মর্গে পড়ে থাকলেও পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়নি। আড়াই বছর পর আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের মাধ্যমে ‘বেওয়ারিশ’ হিসেবে তাকে জুরাইন কবরস্থানে দাফন করা হয়, যা আজ পর্যন্ত খুঁজে পায়নি তার পরিবার।

গুম কমিশন ও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে জেবুন্নাহারের পৃথক অভিযোগের প্রেক্ষিতে অবশেষে শুরু হয়েছে আইনি লড়াই। (৩০ জুলাই), এ মামলার প্রধান আসামি সাবেক আইজিপি একেএম শহীদুল হককে গ্রেপ্তার দেখিয়ে একদিনের জিজ্ঞাসাবাদের নির্দেশ দিয়েছে ট্রাইব্যুনাল-২-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর বিচারিক প্যানেল। এছাড়া, আসামির তালিকায় রয়েছেন তৎকালীন ডিএমপি কমিশনার আসাদুজ্জামান মিয়া, ডিবি প্রধান মনিরুল ইসলাম, সিটিটিসি প্রধান আসাদুজ্জামান, ডিসি মাসুদ আহমেদ, ডিসি ডিবি কৃষ্ণপদ রায় ও রূপনগর থানার ওসি শাহীদ আলমসহ তৎকালীন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অনেক কর্মকর্তা।

প্রথম আলো-ডেইলি স্টারের বিরুদ্ধে অভিযোগ

এই অবস্থায়, হাসিনা সরকারের এমন জঘন্য ঘটনা সামনে আসার পর প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারের সাংবাদিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অনেকেই।

এ নিয়ে প্রবাসী লেখক ও অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট পিনাকী ভট্টাচার্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেয়া এক পোস্টে উল্লেখ করেন, মেজর জাহিদকে মিথ্যা অপবাদ দিয়ে হত্যা করা হয়েছিল। এটি বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি কলঙ্কিত অধ্যায়। রাষ্ট্রের একজন প্রতিভাবান সেনা কর্মকর্তাকে উগ্রবাদী সাজিয়ে হত্যার মিথ্যা বয়ান তৈরি করেছিল প্রথম আলো। এ ঘটনায় প্রথম আলো ও পত্রিকাটির সম্পাদক মতিউর রহমানের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়ে পিনাকী ভট্টাচার্য বলেন, আন্তর্জাতিক সব সংস্থার কাছে এই গণমাধ্যমের ভণ্ডামি ও দ্বৈত ভূমিকা তুলে ধরা হবে। একইসঙ্গে জাহিদুল ইসলামের পরিবারের প্রতি সার্বভৌমত্ববিরোধী ভূমিকার অভিযোগে প্রথম আলোর বিরুদ্ধে দ্রুত মামলা করার আহ্বান জানান তিনি।

অন্যদিকে, হেফাজত নেতা মুফতি হারুন ইজহার প্রশ্ন তুলেছেন, এখন প্রথম আলোর কী বিচার হবে? তাঁর অভিযোগ, তৎকালীন পুলিশ কর্মকর্তা মনিরুল ইসলাম যদি সরাসরি খুনি হন, তবে প্রথম আলো ছিল সেই হত্যাকাণ্ডের বৈধতা উৎপাদনকারী। কেবল মেজর জাহিদই নন, তার মতো অনেকের হত্যার কারিগর প্রথম আলো চক্র, বলেও দাবি করেন তিনি।

এদিকে, দেশে হাসিনা তার পুশিলদের এমন অমানবিক কর্মকাণ্ড যখন আলোচনায়, তখন হাসিনার পালিত সাবেক কাউন্টার টেররিজম প্রধান ও মেজর জাহিদ হত্যার সাথে সারসরি জড়িত থাকা পুলিশ কর্মকর্তা, পলাতক মনিরুল ইসলামের, সাম্প্রতিক একটি ফেসবুক পোস্টকে কেন্দ্র করে নতুন বিতর্কের জন্ম হয়েছে। বিডিআর বিদ্রোহের পটভূমি এবং মেজর জাহিদের উগ্রবাদে জড়ানোর দাবি প্রমাণ করতে তিনি দৈনিক 'প্রথম আলো'র একটি পুরোনো প্রতিবেদনের লিংক শেয়ার করেছেন। এর ফলে জনমনে প্রশ্ন উঠেছে, অতীতে জঙ্গিবিরোধী অভিযানের নামে সাজানো নাটকের বৈধতা দিতে প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারকে মূল হাতিয়ার করা হয়েছিল।

অভিযোগ রয়েছে, এভাবেই হাসিনা সরকারের একের পর এক গুম, খুন, হত্যা ও জঙ্গি নাটক সাজিয়ে তার বৈধতা দিতো প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার। স্বৈরাচারের দোসর ও মিডিয়া ট্রায়ালের মাধ্যমে নির্দোষ মানুষকে ‘জঙ্গি’ বানানোর এই কারিগরদের বিচার কবে হবে, সেই প্রশ্নই এখন পুরো জাতির।



banner close
banner close