ফ্যাসিবাদী আমলে আগস্ট এলেই শেখের কন্যা শেখ হাসিনার ছত্রছায়ায় যেন বদলে যেত দেশের আবহ। উত্তপ্ত তাপদাহে ঝিম ধরা বাতাসেও ভেসে উঠত এক অদ্ভুত বৈপরীত্যের সুর, যেখানে জন্ম নিত শোক আর আয়োজনের মিশেলে গড়ে ওঠা এক বিস্তৃত নাট্যমঞ্চ। সমালোচকরা বলছে, অনেক ক্ষেত্রে এসব আয়োজন শোকের চেয়ে বেশি হয়ে উঠেছিল প্রদর্শনের প্রতিযোগিতা, যেখানে বাজেট, প্রচার আর প্রভাব বিস্তারই ছিল মুখ্য বিষয়।
অভিযোগ রয়েছে, শেখ মুজিবুর রহমানের মৃত্যু দিবসকে ঘিরে দেশজুড়ে তৈরি হতো এক ভিন্ন প্রেক্ষাপট, যেখানে শোক আয়োজনের অন্তরালে চলত অর্থব্যয়, দুর্নীতি, লুটপাট ও অতিরঞ্জনের এক কালো উৎসব। যে উৎসবে সৃষ্টি হতো এক জটিল ও বিতর্কিত সময়ের প্রতিচ্ছবি।
মিলাদ মাহফিল ও খাবার বিতরণে সংঘর্ষ
সমালোচনা রয়েছে, ফ্যাসিবাদী আমলে শেখ মুজিবুর রহমানের মৃত্যুদিবস উপলক্ষে সারা দেশে আয়োজন করা হতো কথিত মিলাদ ও দোয়া মাহফিলের। আর সেই দোয়া মাহফিলকে কেন্দ্র করেই দেশের নানা স্থানে খিচুড়ি ও বিরিয়ানি বিতরণ নিয়ে সৃষ্টি হতো তুমুল সংঘর্ষ। এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন সময়ে জন্ম নিয়েছে আলোচনা-সমালোচনার ঝড়।
এ ছাড়া শেখ মুজিবুর রহমানের এই মৃত্যুদিবসে শোকের পরিবর্তে বিভিন্ন সময়ে দেখা যেত ভাড়া করে আনা বটবাহিনীর নগ্ন উন্মাদনা। আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের সামনেই চলত তাদের এই শোকের নামে উগ্র মাতামাতি। শোকের আবহে তাদের এই বেপরোয়া উন্মাদনাকে ঘিরে অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন, এটা কি সত্যিই শোক দিবস ছিল, নাকি আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের এক বানোয়াট নাট্যাঙ্গন?
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিতর্কিত আয়োজন
জানা যায়, শোক দিবস নিয়ে আওয়ামী লীগের এসব নাট্যকাহিনীর হাত থেকে রক্ষা পায়নি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোও। তৎকালীন সময়ে শোক দিবস এলেই দেখা যেত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে ঘিরে এক নতুন বিতর্কিত রূপ। শিক্ষার্থীদেরকে নিয়ে স্কুলের শ্রেণিকক্ষেই আয়োজন করা হতো শোক দিবসের নানা বিতর্কিত অনুষ্ঠান।
অপরদিকে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের দিয়ে শেখ মুজিবুর রহমানের ছবিতে চুম্বন করে সম্মান প্রদর্শনের বিষয়টিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন সময়ে বিতর্কিত হয়েছে। ভিডিওতে দেখা যায়, শিক্ষার্থীদের শেখ মুজিবুর রহমানের ছবির সামনে মাথা ঝুঁকিয়ে তার প্রতিকৃতিতে চুম্বন করানো হচ্ছে। অনেকেই এটিকে ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে শিরকের সাথে তুলনা করে সমালোচনা করেছে।
সমালোচনার তীর যেন কেন্দ্রীভূত ছিল আওয়ামী লীগের আমলের এই শোক দিবসকে ঘিরেই। শুধু মিলাদ মাহফিলে খাবার বিতরণ নয়, শেখ মুজিবুর রহমানের ছবিতে ফুল দেয়া নিয়েও সৃষ্টি হয়েছে সংঘর্ষ। জানা যায়, ২০২১ সালে নোয়াখালীতে এই দিবস উপলক্ষে ফুল দেয়া নিয়ে সংঘটিত হয় তুমুল মারামারি ও সংঘাত।
বাজেট বরাদ্দ ও দুর্নীতির অভিযোগ
শেখ মুজিবুর রহমানের মৃত্যু দিবসের বাজেট নিয়েও বিভিন্ন সময়ে জন্ম নিয়েছে নানা বিতর্ক। তথ্য বলছে, ২০২১ সালে শুধু সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতেই এ দিবস উপলক্ষে ১৩ কোটি ১১ লাখ ২৮ হাজার টাকা বাজেট বরাদ্দ ও মঞ্জুরি দেয়া হয়েছিল। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতর থেকে তৎকালীন সময়ে এই বরাদ্দ অনুমোদন করা হয়।
এ ছাড়া সমালোচনা রয়েছে, সরকারি কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, জেলা-উপজেলা প্রশাসন এবং গণমাধ্যমসহ বিভিন্ন খাতে এ দিবস উপলক্ষে প্রায় অর্ধশত কোটি টাকার বাজেট বরাদ্দ করা হতো। জানা যায়, ২০১৯ সালে ক্রাউন এন্টারটেইনমেন্টের প্রযোজনায় শেখ মুজিবুর রহমানের মৃত্যুদিবস উপলক্ষে প্রায় ৩০টি নাটক নির্মাণের ঘোষণা দেয়া হয়েছিল, যেগুলো বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেলে বিনামূল্যে সম্প্রচারের কথাও বলা হয়।
কিন্তু, প্রশ্ন রয়ে যায়, ক্রাউন এন্টারটেইনমেন্ট কি সম্পূর্ণ নিজস্ব অর্থায়নেই এই আয়োজনের ঘোষণা দিয়েছিল, নাকি তৎকালীন সরকারের পক্ষ থেকে ছিল পরোক্ষ সহায়তা? বিশ্লেষকদের মতে, শেখ মুজিবুর রহমানকে কেন্দ্র করে ডকুমেন্টারি, সংবাদ প্রতিবেদন ও নাট্যনির্মাণে মিডিয়া খাতে ব্যয় হতো কোটি কোটি টাকা। আর এই বিশাল বাজেটের আড়ালেই চলত কেন্দ্রীয় থেকে শুরু করে তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীদের মধ্যে দুর্নীতি, লুটপাট ও লুটতরাজের মতো নানা জঘন্য কর্মকাণ্ড।
মুজিবের চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন
কিন্তু যাকে যুগের পর যুগ বাঙালির মহানায়ক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করা হয়েছে, সেই শেখ মুজিবুর রহমান কি সত্যিই মহানায়ক ছিলেন, নাকি মহানায়কের আড়ালে লুকিয়ে ছিলেন খলনায়কের এক বিতর্কিত চরিত্র? এ প্রশ্নও উঠেছে বিভিন্ন সময়ে।
বিশ্লেষকদের মতে, শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন একজন স্বৈরাচারী শাসক, যিনি ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের পর দেশে বাকশাল কায়েমের উদ্যোগ নেন। অভিযোগ রয়েছে, তার শাসনামলে দুর্নীতি, লুটপাট, চাঁদাবাজি ও টেন্ডারবাজিসহ নানা অনিয়ম-অপরাধ বিস্তার লাভ করে।
এছাড়াও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গণমাধ্যমে উঠে এসেছে, শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার দিন দেশের পরিস্থিতি তুলনামূলক স্বাভাবিক ছিল। কোথাও বড় ধরনের ভাঙচুর বা সহিংসতা দেখা যায়নি। উল্টো আনন্দে রাস্তায় নেমে এসেছিলো মানুষ।
ফ্যাসিবাদী আমলে শেখ মুজিবকে জাতির জনক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে তাকে এক মহানায়ক হিসেবে তুলে ধরা হয়েছিল। তবে সংশ্লিষ্টদের মতে, তিনি মহানায়ক নন বরং খলনায়কই ছিলেন। আওয়ামী লীগের শাসনামলের দীর্ঘ সময়ে তাকে ঘিরে অতিরঞ্জন ও বাড়াবাড়ির অভিযোগও রয়েছে। যার প্রতিবাদ, সোশ্যাল মিডিয়ায় কথিত শোকের মাস আগস্টে নানা সময়ে নেচে গেয়েই করেছে অনেকেই।
বিশ্লেষকদের মতে, এই অতিরঞ্জনের প্রতিক্রিয়াতেই ২০২৪ সালের জুলাইয়ে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর শেখ মুজিবকে ঘিরে জনমনে জন্ম নেয় তীব্র বিতৃষ্ণা ও ক্ষোভ। যার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে (১৫ আগস্ট) রাতে ধানমন্ডিতে ছাত্র-জনতার এক বিতর্কিত উচ্ছ্বাসের দৃশ্যও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
সব মিলিয়ে বিশ্লেষকরা বলছে, ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি যে ক্ষোভের বীজ রোপিত হয়েছিল, পরবর্তী সময়ে তাকে জাতির পিতা হিসেবে প্রতিষ্ঠা এবং প্রতি বছর তার জন্ম ও মৃত্যু দিবসে রাষ্ট্রীয়ভাবে ব্যাপক আয়োজন, এসবের মধ্য দিয়ে সেই ইতিহাসকে ভিন্নভাবে উপস্থাপনের চেষ্টা করা হয়েছে।
আরও পড়ুন:








