শনিবার

১ আগস্ট, ২০২৬ ১৭ শ্রাবণ, ১৪৩৩

হাসিনাকে ছুড়ে ফেলছে পরম বন্ধু ভারতও

নিউজ ডেস্ক: বাংলা এডিশন

প্রকাশিত: ১ আগস্ট, ২০২৬ ১৯:৪২

শেয়ার

হাসিনাকে ছুড়ে ফেলছে পরম বন্ধু ভারতও
ছবি বাংলা এডিশন

কথায় আছে, আন্তর্জাতিক কূটনীতির টেবিলে কোনো চিরস্থায়ী বন্ধু থাকে না, থাকে কেবল নিঃসঙ্গ স্বার্থের নির্মম হিসেব-নিকেশ। টানা ১৭ বছর যে শেখ হাসিনাকে দিল্লির মসনদ থেকে ঢাল হয়ে রক্ষা করা হয়েছে, ক্ষমতার পটপরিবর্তনের পর সেই পরম বন্ধু ভারতই এখন তার সব দরজা একে একে বন্ধ করে দিচ্ছে। বিশ্লেষকদের ভাষায়, বিগত দেড় দশকে হাসিনাকে ব্যবহার করে নিজেদের ষোলো আনা স্বার্থ উসুল করে নিয়েছে নয়াদিল্লি। আর কাজ শেষে এখন তাকে যেন টিস্যু পেপারের মতোই ছুড়ে ফেলার নির্মম পথে হাঁটছে মোদি সরকার।

একতরফা শোষণের খতিয়ান

কিন্তু, কেন ১৭ বছর একটি অগণতান্ত্রিক সরকারকে অন্ধ সমর্থন দিয়েছিল দিল্লি? উত্তরটা লুকিয়ে আছে একতরফা শোষণের খতিয়ানে। বাংলাদেশের বুক চিরে বিনামূল্যে ট্রানজিট করিডোর, তিস্তার ন্যায্য হিস্যা বছরের পর বছর আটকে রাখা, আর দেশের মানুষকে বঞ্চিত করে জলের দরে পদ্মার ইলিশ ভারতে পাচার। কী নেয়নি তারা?

বাস্তবতা এতটাই পরিহাসের ছিল যে, বাংলাদেশের বাজারে যখন ইলিশের দামে আগুন, তখন ভারতের বাজারে সেই ইলিশ বিক্রি হয়েছে অর্ধেকেরও কম দামে। এমন অসংখ্য অসম সুবিধার পাহাড় গড়তেই হাসিনাকে ক্ষমতায় রাখা হয়েছিল। অথচ সেই হাসিনাই আজ দিল্লির কাছে এক অপ্রয়োজনীয় বোঝা।

ভারতের আনুষ্ঠানিক অবস্থান

দিল্লির এই মুখ ফিরিয়ে নেয়ার আনুষ্ঠানিক প্রমাণ মিলেছে ভারতের লোকসভা ও রাজ্যসভায় উপস্থাপিত এক ঐতিহাসিক প্রতিবেদনে। কংগ্রেস সাংসদ শশী থারুরের নেতৃত্বাধীন ভারতের পররাষ্ট্র বিষয়ক সংসদীয় স্থায়ী কমিটিকে মোদি সরকার সাফ জানিয়ে দিয়েছে, মানবিক ঐতিহ্য ও সংকটাপন্ন ব্যক্তিদের আশ্রয় দেয়ার দীর্ঘদিনের নীতির আলোকে শেখ হাসিনাকে সাময়িক আশ্রয় দেয়া হলেও, ভারতের মাটি ব্যবহার করে কোনো দেশের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে দেয়া হচ্ছে না। অর্থাৎ, দিল্লির আশ্রয়ে থেকে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের যে রঙিন স্বপ্ন আওয়ামী লীগাররা দেখছে, সাউথ ব্লক নিজেই সেই স্বপ্নে পেরেক ঠুকে দিয়েছে।

সম্প্রতি, এএফপি-কে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যেই দেশে ফেরার দাম্ভিক ঘোষণা দিয়েছিলেন শেখ হাসিনা। কিন্তু সেই ঘোষণা এখন বুমেরাং। বাংলাদেশের সরকারের আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, ভারত থেকে দেশে পা রাখা মাত্রই সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে গ্রেপ্তার করা হবে।

এরই মধ্যে ঢাকার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে শেখ হাসিনাকে ফেরত চেয়ে পাঠানো হয়েছে আনুষ্ঠানিক প্রত্যর্পণ অনুরোধ। ভারতের সংসদীয় কমিটিও জানিয়েছে, প্রচলিত আইনি কাঠামো, দ্বিপাক্ষিক চুক্তি ও প্রতিষ্ঠিত নীতির ভিত্তিতে ঢাকার অনুরোধ তারা গভীর পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছে। মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলা আর ঢাকার তীব্র কূটনৈতিক চাপে শেখ হাসিনাকে নিয়ে সাউথ ব্লক এখন চরম আইনি সংকটে।

আওয়ামী লীগারদের দিবাস্বপ্ন

দেশে যখন পায়ের নিচে মাটি নেই, তখন ভারতে পলাতক ও বিদেশে অবস্থানরত আওয়ামী লীগের ষড়যন্ত্রকারীরা এখনো দিল্লি আর মোদির করুণা পেতে রঙিন দিবাস্বপ্নে বিভোর। সুদূর আমেরিকায় বসে মোদি ও হাসিনার পক্ষে স্লোগান দিচ্ছে পলাতক আওয়ামী সমর্থকরা।

অথচ, একই সময়ে আমেরিকার রাজপথে দেখা গেছে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক চিত্র। ভারতে গণতান্ত্রিক অধিকার হরণ, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা খর্ব এবং নীতিকৌশলগত ব্যর্থতার অভিযোগে নরেন্দ্র মোদির পদত্যাগের দাবিতে তীব্র বিক্ষোভ প্রদর্শন করেছে প্রবাসীদের বিরাট একটি অংশ।

বিদেশের মাটিতে দাঁড়িয়ে মোদির পক্ষে আওয়ামী লীগের এই অযাচিত স্লোগান দিল্লির জন্য সুবিধার চেয়ে এখন অস্বস্তি ও বিব্রতকর পরিস্থিতিই বেশি তৈরি করছে।

হাসিনাকে বাঁচাতে গিয়ে মোদি সরকার নিজেই এখন ঘরের আগুনে পুড়ছে। ভারতের অভ্যন্তরে শিক্ষাব্যবস্থা সংস্কার এবং মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষার ভয়াবহ অনিয়মকে কেন্দ্র করে তরুণদের যে তীব্র আন্দোলন শুরু হয়েছে, তা এখন রূপ নিয়েছে এক বিশাল নাগরিক অভ্যুত্থানে। জনগণের তোপের মুখে এরই মধ্যে পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন ভারতের কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী। একদিকে বিদেশের মাটিতে পদত্যাগের বিক্ষোভ, অন্যদিকে দেশের ভেতরে তরুণদের দাবানল, সবমিলিয়ে বিজেপি সরকার এখন তাদের ইতিহাসের অন্যতম কঠিন রাজনৈতিক চাপের মুখে। হাসিনাকে নিয়ে ভাবার মতো সময় বা রাজনৈতিক পুঁজি, কোনোটাই এখন আর মোদির হাতে নেই।

চীনের ক্রমবর্ধমান উপস্থিতি

সাউথ ব্লকের ঘুম হারাম হওয়ার পেছনে রয়েছে আরও এক বড় ভূ-রাজনৈতিক কারণ, বাংলাদেশে চীনের ক্রমবর্ধমান কৌশলগত ও অর্থনৈতিক উপস্থিতি। ভারতের পররাষ্ট্র বিষয়ক সংসদীয় স্থায়ী কমিটির প্রতিবেদনে গভীর উদ্বেগ জানিয়ে বলা হয়েছে, ভারতীয় সীমান্ত থেকে মাত্র ১৫ কিলোমিটার দূরে চীনের সহায়তায় লালমনিরহাট বিমানঘাঁটির যে আধুনিকায়ন হচ্ছে, তা ভারতের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য এক বড় সতর্কবার্তা। কমিটি স্পষ্ট পরামর্শ দিয়েছে, বাংলাদেশে বিদেশি শক্তির তৎপরতা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করতে হবে। আর নিজেদের সীমান্ত ও কৌশলগত স্বার্থ বাঁচাতে হলে হাসিনাকে আঁকড়ে ধরে রাখার চেয়ে বর্তমান বাংলাদেশের বাস্তবতাকে মেনে নেয়া ছাড়া দিল্লির সামনে আর কোনো বিকল্প নেই।

এই কঠিন বাস্তবতার মুখে দাঁড়িয়ে বিগত দিনের হস্তক্ষেপ নীতি থেকে সরে এসে এবার বাস্তববাদী চাল চালছে নয়াদিল্লি। সংসদীয় কমিটির প্রতিবেদনে নির্বাচনে বিএনপির বিজয় এবং তারেক রহমানের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সম্ভাবনাকে ইতিবাচক দৃষ্টিতে দেখার কথা বলা হয়েছে। শুধু তাই নয়, দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক এগিয়ে নিতে তারেক রহমানকে ভারত সফরে আমন্ত্রণের বিষয়টিকেও সাধুবাদ জানিয়েছে কমিটি। তবে বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলছে, ভারত হঠাৎ এই বন্ধুত্ব দেখাচ্ছে কেবল নিজেদের স্বার্থ বাঁচাতে। কারণ, পরিবর্তিত বাংলাদেশ এখন আর দিল্লির মুখাপেক্ষী নয়, চীন, মালয়েশিয়া, পাকিস্তান, তুরস্ক ও যুক্তরাষ্ট্রের মতো পরাশক্তিগুলোর সাথে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলছে ঢাকা। তাই দিল্লির কোনো পদক্ষেপকেই অন্ধভাবে বিশ্বাস না করে, তাদের মূল উদ্দেশ্য বিশ্লেষণ করেই এগোতে হবে নতুন সরকারকে।

গঙ্গা পানিচুক্তি ও অন্যান্য সুপারিশ

সংসদীয় কমিটির প্রতিবেদনে আরও বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে এসেছে। ১৯৯৬ সালে স্বাক্ষরিত গঙ্গা পানিচুক্তির মেয়াদ চলতি ২০২৬ সালেই শেষ হতে যাওয়ায়, অনতিবিলম্বে চুক্তি নবায়নের প্রাথমিক কাজ শুরুর তাগিদ দেয়া হয়েছে। একইসঙ্গে, টানা দুই বছর বন্ধ থাকার পর রবিবার (২৮ জুন) থেকে পর্যটন ভিসা চালু হলেও, সাধারণ বাংলাদেশিদের ভিসা প্রদানে গতি আনার সুপারিশ করা হয়েছে যাতে দুই দেশের জনগণের মনোভাবে ফাটল না ধরে। এছাড়া, বাংলাদেশের রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজ ও অংশীজনদের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ এবং সংখ্যালঘুদের সুরক্ষার বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে কূটনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার পরামর্শ দিয়েছে কমিটি।

সব সমীকরণের শেষ কথা একটাই, দিল্লির হিসাবের খাতা থেকে শেখ হাসিনা এখন এক বাতিল অধ্যায়। ভারতে কোণঠাসা হাসিনা আর দেশের ভেতরে আওয়ামী লীগারদের রঙিন দিবাস্বপ্ন এখন কেবলই হতাশার প্রলাপ। তবে শত্রুর ষড়যন্ত্র এখনো পুরোপুরি শেষ হয়নি বলেই মতামত রয়েছে। তাই এই মুহূর্তে দেশের ভেতরে ফ্যাসিবাদবিরোধী সকল শক্তি, বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, এনসিপি থেকে শুরু করে গণঅভ্যুত্থানের পক্ষের প্রতিটি দল ও মানুষকে যেকোনো ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে থাকতে হবে ইস্পাতদৃঢ় ও ঐক্যবদ্ধ। কারণ, বিশ্লেষকদের মতে, নতজানু পররাষ্ট্রনীতির যুগ শেষ, বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ এখন নির্ধারিত হবে কেবলই এই দেশের মানুষের চাওয়ায়, দিল্লির আঙুলের হেলনে নয়।



banner close
banner close