শুক্রবার

৩১ জুলাই, ২০২৬ ১৬ শ্রাবণ, ১৪৩৩

বিএনপির ক্ষমতায় আসাকে ইতিবাচক দেখছে ভারত

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ৩১ জুলাই, ২০২৬ ১৩:৫৬

শেয়ার

বিএনপির ক্ষমতায় আসাকে ইতিবাচক দেখছে ভারত
ছবি সংগৃহীত

নির্বাচনে বিএনপির বিজয় এবং তারেক রহমানের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের বিষয়টিকে ইতিবাচকভাবে দেখছে ভারত। দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ হিসেবে বিষয়টিকে বিবেচনা করছে নয়াদিল্লি। তবে বাংলাদেশে চীনের ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক, অবকাঠামোগত ও কৌশলগত উপস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে দেশটি।

ভারতের পররাষ্ট্রবিষয়ক সংসদীয় কমিটির ‘ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের ভবিষ্যৎ’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এসব মূল্যায়ন তুলে ধরা হয়েছে। বৃহস্পতিবার দেশটির লোকসভা ও রাজ্যসভায় প্রতিবেদনটি উপস্থাপন করা হয়।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ভারত পরিমিত ও হিসাব-নিকাশভিত্তিক অ-হস্তক্ষেপ নীতি অনুসরণ করেছে। তবে গত ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিএনপির নিরঙ্কুশ বিজয় এবং তারেক রহমানের সরকার গঠনের পর দিল্লি বিষয়টিকে ইতিবাচক দৃষ্টিতে দেখেছে।

কমিটির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, নির্বাচনে জয়ের পর ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি প্রথম বিদেশি রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে টেলিফোনে তারেক রহমানকে অভিনন্দন জানান। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমানের শপথ অনুষ্ঠানে ভারতের প্রতিনিধিত্ব করেন লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লা। তিনি মোদির পক্ষ থেকে ব্যক্তিগত শুভেচ্ছাবার্তা হস্তান্তর করেন এবং সুবিধাজনক সময়ে তারেক রহমানকে ভারত সফরের আমন্ত্রণ জানান।

কমিটি ভারত সরকারের এই কূটনৈতিক পদক্ষেপের প্রশংসা করে বলেছে, বাংলাদেশের নতুন গণতান্ত্রিক সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ করা এবং অমীমাংসিত বিষয়গুলো পারস্পরিক শ্রদ্ধার ভিত্তিতে সমাধানের জন্য এটি একটি সুযোগ।

প্রতিবেদনে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ভারতে আশ্রয় নেওয়া সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিষয়েও ভারতের অবস্থান তুলে ধরা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, তার ভারতে অবস্থান ‘মানবিক বিবেচনা ও ভারতের দীর্ঘদিনের আশ্রয়দান নীতির’ সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তবে ভারতের ভূখণ্ড ব্যবহার করে তাকে কোনো রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে না।

শেখ হাসিনাকে ফেরত পাঠানোর বিষয়ে বাংলাদেশ সরকারের অনুরোধ সম্পর্কে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কমিটিকে জানিয়েছে, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ প্রচলিত আইন ও প্রতিষ্ঠিত আইনি প্রক্রিয়া অনুযায়ী বিষয়টি পর্যালোচনা করছে।

বাংলাদেশে চীনের বাড়তে থাকা অর্থনৈতিক, অবকাঠামোগত ও কৌশলগত সম্পৃক্ততা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ভারতের সংসদীয় কমিটি।

প্রতিবেদনে তিনটি বিষয় বিশেষভাবে তুলে ধরা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ২০২৫ সালের মার্চে মোংলা বন্দরের উন্নয়নে ৩৭০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের প্রকল্পে চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের চুক্তি, ভারতের আন্তর্জাতিক সীমান্ত থেকে মাত্র ১৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত লালমনিরহাট বিমানঘাঁটির উন্নয়ন এবং পেকুয়ায় চীনের সহায়তায় নির্মিত সাবমেরিন ঘাঁটি।

কমিটি ভারত সরকারকে বাংলাদেশে বিদেশি শক্তির কার্যক্রম গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ এবং জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে। পাশাপাশি নির্ভরযোগ্য উন্নয়ন অংশীদার হিসেবে ভারতের অবস্থান আরও শক্তিশালী করার তাগিদ দেওয়া হয়েছে।

প্রতিবেদনে ১৯৯৬ সালে স্বাক্ষরিত গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করে চুক্তি নবায়নকে দুই দেশের অন্যতম অগ্রাধিকার হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এ ছাড়া দীর্ঘদিন ধরে অমীমাংসিত তিস্তা চুক্তির বিষয়ে সংশ্লিষ্ট রাজ্যগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে গ্রহণযোগ্য সমাধানের প্রত্যাশা জানানো হয়েছে।

সীমান্ত নিরাপত্তার বিষয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিএসএফ ও বিজিবির মধ্যে গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় এবং যৌথ টহল জোরদার করা হয়েছে। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি ও আগস্টে দুই বাহিনীর মহাপরিচালক পর্যায়ের বৈঠকেও বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে।

বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য ভিসা কার্যক্রমকে দুই দেশের সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে উল্লেখ করেছে কমিটি। ২০২৪ সালের আগস্টে নিরাপত্তাজনিত কারণে বাংলাদেশের ভিসা কেন্দ্রগুলো থেকে ভারতীয় কর্মীদের প্রত্যাহারের পর কার্যক্রমে বিঘ্ন ঘটে। বর্তমানে বাংলাদেশের পাঁচটি ভিসা কেন্দ্র থেকে প্রতিদিন প্রায় দেড় হাজার ভিসা দেওয়া হচ্ছে, যার ৮০ শতাংশই চিকিৎসাসংক্রান্ত।

ভারতের লাইন অব ক্রেডিটের আওতায় বাংলাদেশে বাস্তবায়নাধীন উন্নয়ন প্রকল্প নিয়েও পর্যবেক্ষণ দিয়েছে কমিটি। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের ৫ ও ৬ মার্চ ঢাকায় অনুষ্ঠিত ২৩তম এলওসি পর্যালোচনা বৈঠকে প্রাক-বাস্তবায়ন পর্যায়ে থাকা ১২টি প্রকল্প বাতিল করা হয়েছে। অন্যদিকে আটটি প্রকল্পকে অগ্রাধিকার দিয়ে নির্ধারিত সময়ে শেষ করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।

২০২৪ সালের আগস্টের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর বাংলাদেশে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলার ঘটনাকে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের একটি স্পর্শকাতর বিষয় হিসেবে উল্লেখ করেছে কমিটি। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের ১৮ মে পর্যন্ত সংখ্যালঘুদের ওপর ২ হাজার ৪৪৬টি হামলার তথ্য কমিটির নজরে এসেছে। এসব ঘটনায় নিরপেক্ষ তদন্ত ও দায়ীদের বিচারের আওতায় আনার প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়েছে।

বাণিজ্য বিষয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এলডিসি দেশ হিসেবে বাংলাদেশ সাফটার আওতায় ভারতে অধিকাংশ পণ্যে শুল্কমুক্ত ও কোটামুক্ত বাজার সুবিধা পাচ্ছে। তবে ২০২৬ সালে এলডিসি থেকে উত্তরণের পর এ সুবিধা শেষ হতে পারে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় দুই দেশের মধ্যে সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তির আলোচনা দ্রুত শেষ করার সুপারিশ করেছে কমিটি।

প্রতিবেদনে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের ঐতিহাসিক ভিত্তি হিসেবে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের প্রসঙ্গও উল্লেখ করা হয়েছে।



banner close
banner close