বৃহস্পতিবার

৩০ জুলাই, ২০২৬ ১৫ শ্রাবণ, ১৪৩৩

৩০ জুলাই: ফেসবুক প্রোফাইল লাল; আন্তর্জাতিক মহলেরও চাপে পড়ে হাসিনা

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ৩০ জুলাই, ২০২৬ ০৭:০১

শেয়ার

৩০ জুলাই: ফেসবুক প্রোফাইল লাল; আন্তর্জাতিক মহলেরও চাপে পড়ে হাসিনা
ছবি সংগৃহীত

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ধারাবাহিক কর্মসূচির অংশ হিসেবে মঙ্গলবার (৩০ জুলাই) নতুন কর্মসূচি ‘মার্চ ফর জাস্টিস’ ঘোষণা করা হয়। একই দিনে দেশজুড়ে লাল রঙের প্রতীকী প্রতিবাদ, গণগ্রেপ্তার, রাষ্ট্রীয় শোক পালন এবং আন্তর্জাতিক মহলের উদ্বেগের মধ্য দিয়ে জুলাইয়ের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিন পার হয়।

মার্চ ফর জাস্টিস কর্মসূচির ঘোষণা

২০২৪ সালের মঙ্গলবার (৩০ জুলাই) বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন নতুন কর্মসূচি হিসেবে ‘মার্চ ফর জাস্টিস’ ঘোষণা করে। অনলাইন বার্তা আদান-প্রদানের অ্যাপ টেলিগ্রামের মাধ্যমে রাতে এ কর্মসূচির ঘোষণা দেওয়া হয়। আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক আব্দুল কাদের জানান, বুধবার (৩১ জুলাই) দুপুর সাড়ে ১২টায় দেশের সব আদালত, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও রাজপথে একযোগে ‘মার্চ ফর জাস্টিস’ কর্মসূচি পালিত হবে।

ঘোষণায় বলা হয়, ছাত্র-জনতার ওপর গণহত্যা, গণগ্রেপ্তার, হামলা, মামলা, গুম-খুনের প্রতিবাদ, জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে নিরপেক্ষ তদন্ত এবং ঘোষিত ৯ দফা দাবির সমর্থনে এ কর্মসূচি পালন করা হবে। একই সঙ্গে শিক্ষক, আইনজীবী, মানবাধিকারকর্মী, পেশাজীবী, শ্রমজীবীসহ সর্বস্তরের মানুষকে কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়।

লাল রঙে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিবাদ

পূর্বঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী এদিন দেশজুড়ে মুখে ও চোখে লাল কাপড় বেঁধে ছবি তুলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার চালান আন্দোলনকারীরা। আন্দোলনের সমন্বয়কদের আহ্বানে শিক্ষক, সাংবাদিক, লেখক, সংস্কৃতিকর্মী, শিক্ষার্থীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ লাল রঙের ফ্রেম ব্যবহার করে প্রতিবাদ জানায়। একইভাবে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমও সয়লাব হয়ে যায় লাল রঙে। ফ্যাসিবাদীবিরোধীরা লাল রঙের বৃত্ত ফেসবুক প্রোফাইলে দিয়ে প্রতিবাদ করে হাসিনার দমন-পীড়নের।

অন্যদিকে, স্বৈরাচারী সরকার সমর্থকদের অনেকেই রাষ্ট্রীয় শোকের অংশ হিসেবে কালো রঙের ফ্রেম ব্যবহার করে।

রাষ্ট্রীয় শোক ও প্রতিবাদ

এদিকে, কোটা আন্দোলন ঘিরে নিহতদের স্মরণে সরকার ঘোষিত নাটকীয় এক দিনের রাষ্ট্রীয় শোক পালিত হয়। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা কালো ব্যাজ ধারণ করে ফ্যাসিস্ট হাসিনার নির্দেশে। দেশের মসজিদে দোয়া এবং মন্দির, গির্জা ও প্যাগোডায় বিশেষ প্রার্থনার আয়োজন করা হয়। বিভিন্ন স্থানে দোয়া ও মিলাদ মাহফিলও অনুষ্ঠিত হয়। ছাত্র-জনতা বিষয়টিকে শহীদদের রক্তের সঙ্গে একধরনের তামাশা হিসেবে আখ্যা দেয়।

অপরদিকে, রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণার আগের রাতেই শিক্ষার্থীদের একটি অংশ ৯ দফা দাবির সমর্থনে রাষ্ট্রীয় শোক প্রত্যাখ্যান করে লাল কাপড় বেঁধে প্রতিবাদের কর্মসূচি ঘোষণা করেছিল।

কোটা আন্দোলন ঘিরে হত্যাকাণ্ড ও গণগ্রেপ্তারের প্রতিবাদে মুখে লাল কাপড় বেঁধে মৌন মিছিল করে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা।

এ ছাড়া, রাজধানীর গুলিস্তানে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর উদ্যোগে প্রতিবাদী গানের মিছিল অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে পুলিশ বাধা দিলে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে বাকবিতণ্ডা ও ধাক্কাধাক্কির ঘটনা ঘটে। একই দিন পুরানা পল্টনে বাম গণতান্ত্রিক জোট সরকারের পদত্যাগের দাবিতে সমাবেশ ও বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করে।

সরকারের পদক্ষেপ ও বক্তব্য

সন্ধ্যায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত বৈঠক শেষে, ফ্যাসিস্ট সরকারের তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী জানান, পরিস্থিতি বিবেচনায় ধাপে ধাপে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়া হবে। একই সঙ্গে জামায়াতে ইসলামীকে নিষিদ্ধ করার বিষয়টিও সরকার গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে বলে জানান তিনি।

এদিকে, তৎকালীন ফ্যাসিস্ট প্রধানমন্ত্রী ও গণহত্যাকারী শেখ হাসিনা বলেন, কোটা আন্দোলন ঘিরে সংঘটিত সহিংসতার সুষ্ঠু তদন্তে সরকার জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সহযোগিতা চেয়েছে। তিনি নাটক সাজিয়ে বলেন, ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দোষীদের শাস্তি নিশ্চিত করতে সরকার আন্তর্জাতিক সহযোগিতাকে স্বাগত জানায়।

এদিকে, মঙ্গলবার (৩০ জুলাই) পর্যন্ত রাজধানীতে কোটা আন্দোলন ঘিরে সংঘর্ষ, ভাঙচুর ও সহিংসতার ঘটনায় মোট ২৬৪টি মামলা হয়। এর মধ্যে ৫৩টি হত্যা মামলা। আরও কয়েকটি মামলা প্রক্রিয়াধীন ছিল। ঢাকায় গ্রেপ্তার করা হয় ২ হাজার ৮৫০ জনকে। আর সারাদেশে গ্রেপ্তারের সংখ্যা ১০ হাজার ছাড়িয়ে যায়। যা ছাত্র-জনতাকে আরো প্রতিবাদী করে তোলে।

আন্তর্জাতিক মহলের উদ্বেগ

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের মহাসচিব অ্যাগনেস ক্যালামার্ড, শেখ হাসিনার উদ্দেশে এক খোলা চিঠিতে আন্দোলন দমনে সহিংসতা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন এবং নিরপেক্ষ তদন্তের আহ্বান জানান।

এদিন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে মহানগর, জেলা, উপজেলা, পৌরসভা, ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ে ‘সন্ত্রাস ও নাশকতা প্রতিরোধ কমিটি’ গঠনের নির্দেশনা দিয়ে সংশ্লিষ্টদের কাছে চিঠি পাঠায় মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। ফ্যাসিস্ট সরকারের এই উদ্যোগকে উল্টো সন্ত্রাসী সিদ্ধান্ত বলে প্রতিবাদ জোরালো করে ছাত্র-জনতা।

এই অবস্থায়, জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস জানান, শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে অতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগ ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিশ্বাসযোগ্য তথ্য জাতিসংঘের কাছে এসেছে। এ ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত থাকার কথাও জানান তিনি।

একইভাবে, বাংলাদেশে কোটা আন্দোলন ঘিরে ‘দেখামাত্র গুলির নির্দেশ’ এবং আইনবহির্ভূত হত্যার অভিযোগে উদ্বেগ প্রকাশ করে ইউরোপীয় ইউনিয়ন। এক বিবৃতিতে ইইউর পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক প্রধান জোসেপ বোরেল মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ জানান।

এদিকে, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ছয় সমন্বয়ক টানা পঞ্চম দিনের মতো ডিবি হেফাজতে ছিলেন। একই দিন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সামনে নিহতদের স্মরণে অভিভাবকদের মৌন অবস্থান কর্মসূচিতে পুলিশ বাধা দেয়।

অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামীকে নিষিদ্ধের উদ্যোগ প্রসঙ্গে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, চলমান সংকট ও হত্যাকাণ্ড থেকে জনদৃষ্টি সরাতেই সরকার এ বিষয়টি সামনে আনছে।

দেশে ও দেশের বাইরে, তীব্র প্রতিবাদের মাঝেই পার হয় জুলাইয়ের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিন। দেশের গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক মহল থেকেও চাপে পড়ে ফ্যাসিস্ট হাসিনা।



banner close
banner close