বুধবার

২৯ জুলাই, ২০২৬ ১৪ শ্রাবণ, ১৪৩৩

যেভাবে নিরাপত্তা বলয় ভেঙে জিয়ার কক্ষে পৌঁছায় হত্যাকারীরা

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ২৯ জুলাই, ২০২৬ ১৩:৪৩

শেয়ার

যেভাবে নিরাপত্তা বলয় ভেঙে জিয়ার কক্ষে পৌঁছায় হত্যাকারীরা
ছবি সংগৃহীত

আজ থেকে ৪৫ বছর আগে, ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের তদন্তে গঠিত কমিশনের প্রতিবেদন দীর্ঘদিন জনসমক্ষে প্রকাশ করা হয়নি। সম্প্রতি সেই প্রতিবেদনের একটি মুদ্রিত কপি হাতে পাওয়ার দাবি করেছে দ্য ডেইলি স্টার। প্রতিবেদনে রাষ্ট্রপতির নিরাপত্তা ব্যবস্থার গুরুতর দুর্বলতা, ব্যক্তিগত নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট কয়েকজন কর্মকর্তার ভূমিকা এবং হত্যাকাণ্ডের সময়কার ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে বিস্তৃত পর্যবেক্ষণ তুলে ধরা হয়েছে।

তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সার্কিট হাউসে অবস্থানকালে রাষ্ট্রপতির ব্যক্তিগত স্টাফদের একজন বা একাধিক সদস্যের কারণে তার নিরাপত্তা বিঘ্নিত হয়েছিল বলে বিশ্বাস করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। কমিশন বিশেষভাবে রাষ্ট্রপতির ব্যক্তিগত সচিব লেফটেন্যান্ট কর্নেল আবু ইউসুফ মো. মাহফুজুর রহমানের ভূমিকার কঠোর সমালোচনা করে। একই সঙ্গে রাষ্ট্রপতির এডিসি ক্যাপ্টেন মাজহারুল হক এবং মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা মেজর মুজিবুর রহমানের ভূমিকা নিয়েও সন্দেহ প্রকাশ করা হয়।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, হত্যাকাণ্ডের রাতে লেফটেন্যান্ট কর্নেল মাহফুজ রাষ্ট্রপতির কক্ষের পূর্ব পাশের একটি কক্ষে অবস্থান করছিলেন। ক্যাপ্টেন মাজহারুল হক কমিশনকে জানান, গোলাগুলি থেমে যাওয়ার পর তিনি কক্ষ থেকে বের হয়ে রাষ্ট্রপতির কক্ষের দিকে যান। সেখানে তিনি মাহফুজকে অন্য পাশ থেকে আসতে দেখেন। মাহফুজ তাকে বলেন, সবকিছু শেষ হয়ে গেছে। এরপর তারা রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে রক্তাক্ত অবস্থায় মেঝেতে পড়ে থাকতে দেখেন। প্রতিবেদনে বলা হয়, কাছ থেকে গুলিবর্ষণের কারণে তার দেহ বুলেটে ঝাঁঝরা হয়ে গিয়েছিল এবং মুখের একাংশ বিকৃত হয়ে যায়।

ক্যাপ্টেন মাজহার কমিশনকে আরও জানান, রাষ্ট্রপতির প্রধান নিরাপত্তা কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কর্নেল এএফএম মইনুল আহসান এবং প্রেসিডেন্টস গার্ড রেজিমেন্টের ক্যাপ্টেন আশরাফুল হাফিজ খানের মরদেহও ঘটনাস্থলে পড়ে ছিল। আহসানের মরদেহ করিডোরে এবং হাফিজ খানের মরদেহ প্রথম তলার উত্তর বারান্দার পূর্ব পাশে পাওয়া যায়।

প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়, অভিযানের সময় লেফটেন্যান্ট কর্নেল মাহফুজ, লেফটেন্যান্ট কর্নেল মইনুল আহসান এবং ক্যাপ্টেন হাফিজ নিজেদের কক্ষের দরজা খুলে দিয়েছিলেন। হামলাকারীদের একজন মাহফুজকে লক্ষ্য করে গুলি চালিয়েছিল বলেও অভিযোগ রয়েছে। তবে অন্য দুই কর্মকর্তা নিহত হলেও মাহফুজ কীভাবে সম্পূর্ণ অক্ষত থাকলেন, সেটিকে কমিশন রহস্যজনক বলে উল্লেখ করে।

কমিশন মাহফুজের কক্ষের দেয়ালে থাকা গুলির চিহ্ন পরীক্ষা করে জানায়, সেগুলো বাইরে থেকে ছোড়া গুলির কারণে হয়েছে বলে যে দাবি করা হয়েছিল, তা অত্যন্ত অসম্ভব। পুলিশের বিশেষজ্ঞ মতামতের ভিত্তিতে কমিশনের পর্যবেক্ষণ ছিল, গুলির চিহ্নগুলোর অবস্থান ও ধরন এমন যে, পরে কৃত্রিমভাবে তৈরি করা হয়ে থাকতে পারে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, লেফটেন্যান্ট কর্নেল মাহফুজ ও ক্যাপ্টেন মাজহার কেউই দীর্ঘ সময় নিজেদের কক্ষ থেকে বের হননি। হত্যাকারীরা চলে যাওয়ার পর একজন ওয়্যারলেস অপারেটর দরজায় টোকা দিয়ে তাদের বাইরে আনেন। কমিশনের ভাষ্য অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতির প্রতি দায়িত্ব ও আনুগত্যের সঙ্গে এই আচরণের কোনো সামঞ্জস্য ছিল না।

ক্যাপ্টেন মাজহারের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলে কমিশন। রাষ্ট্রপতির কক্ষের সঙ্গে তার কক্ষের একটি সংযোগ দরজা থাকলেও গোলাগুলির সময় তিনি সেটি খোলার চেষ্টা করেননি। তিনি কমিশনকে জানান, এমন একটি দরজা ছিল, সেটিই তিনি জানতেন না। কমিশন মন্তব্য করে, রাষ্ট্রপতির কাছে পৌঁছানোর সবচেয়ে সহজ পথ ছিল ওই সংযোগ দরজা। অন্তত দরজায় জোরে আঘাত করে রাষ্ট্রপতিকে সতর্ক করার চেষ্টা করা হলেও তিনি সাময়িকভাবে প্রাণরক্ষার সুযোগ পেতে পারতেন।

মাহফুজকে সন্দেহ করার আরও কয়েকটি কারণও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ঘটনার দিন সকালে তিনি সার্কিট হাউসের দায়িত্বপ্রাপ্ত এনডিসি নাসিরউদ্দিনের কাছে কোন কক্ষে কে অবস্থান করছেন, তার টাইপ করা তালিকা চান। কমিশনের ভাষ্য অনুযায়ী, অতীতে রাষ্ট্রপতির সফরগুলোর সময় তিনি কখনও এমন তালিকা চাননি।

তদন্তে আরও উঠে আসে, রাত ১০টার দিকে মাহফুজ হাউস গার্ডের দায়িত্বে থাকা ইন্সপেক্টর বজলুর রশিদকে রাষ্ট্রপতির কক্ষের সামনে নিয়োজিত দুই প্রহরী সরিয়ে নিতে বলেন। কারণ হিসেবে তিনি জানান, তাদের উপস্থিতিতে রাষ্ট্রপতির অসুবিধা হবে। ফলে হত্যাকাণ্ডের সময় রাষ্ট্রপতির কক্ষের বাইরে কোনো প্রহরী ছিল না।

কমিশন আরও মনে করে, হত্যাকাণ্ডের পর রাষ্ট্রপতির মরদেহ সুরক্ষিত রাখার ক্ষেত্রেও মাহফুজের প্রয়োজনীয় উদ্যোগের অভাব ছিল। বিদ্রোহী সেনাদের একটি দল কিছুক্ষণ পর মরদেহ নিয়ে গিয়ে অজ্ঞাত স্থানে দাফন করে। পরে রাঙ্গুনিয়ায় সেই কবরের সন্ধান পাওয়া যায়। কমিশনের মতে, মরদেহ দীর্ঘ সময় কার্যত অরক্ষিত অবস্থায় পড়ে ছিল।

প্রতিবেদনে বলা হয়, মাহফুজ ভোরে সেনা সদর দপ্তরে একটি বার্তা পাঠিয়ে রাষ্ট্রপতির মরদেহ ঢাকায় নেওয়ার জন্য সেনাপ্রধান, রাষ্ট্রপতির সামরিক সচিব ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে বহনকারী একটি হেলিকপ্টার পাঠানোর অনুরোধ করেন। কমিশনের পর্যবেক্ষণ ছিল, স্থানীয় বিমান বাহিনীর সহায়তায় সহজেই হেলিকপ্টারের ব্যবস্থা করা সম্ভব ছিল এবং এত উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের উপস্থিতির প্রয়োজন ছিল না।

এ ছাড়া প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, মাহফুজ রাষ্ট্রপতির রোভার সেট নিয়ে ডিভিশনাল কমিশনারের বাসভবনে চলে যান এবং পরে ক্যান্টনমেন্টে নেওয়া পর্যন্ত সেটি সেখানেই ছিল। কমিশন এমন কোনো প্রমাণ পায়নি যে, ওই সময়ে তিনি সেনা সদর দপ্তরের সঙ্গে কার্যকর যোগাযোগ স্থাপন বা প্রয়োজনীয় নির্দেশনা চাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন।

তদন্তে আরও উঠে আসে, ঘটনার আগেই ফিল্ড ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের স্থানীয় কর্মকর্তা মেজর মুজিবুর রহমান সার্কিট হাউসে গিয়ে রাষ্ট্রপতির সামরিক কর্মকর্তাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। কমিশনের মতে, তার ওই সফরের কোনো যৌক্তিক কারণ ছিল না। বরং এটি সম্ভাব্য রেকি বা পূর্বপ্রস্তুতির অংশ হতে পারে বলে সন্দেহের যথেষ্ট অবকাশ ছিল। তবে উপস্থিত সামরিক কর্মকর্তা কিংবা গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর কেউই বিষয়টিকে গুরুত্ব দেননি।

১৯৮১ সালের ৩০ মে হত্যাকাণ্ডের এক সপ্তাহ পর, ৬ জুন তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আব্দুস সাত্তার একটি তদন্ত কমিশন গঠন করেন। সাবেক প্রধান বিচারপতি রুহুল ইসলামের নেতৃত্বাধীন ওই কমিশনের সদস্য ছিলেন বিচারপতি আবু তাহের মোহাম্মদ আফজাল এবং খুলনার জেলা ও দায়রা জজ সৈয়দ সিরাজউদ্দিন আহমেদ। কমিশন তৎকালীন সেনাপ্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদসহ মোট ৬২ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ করে।

প্রতিবেদনের সারসংক্ষেপে কমিশন উল্লেখ করে, রাষ্ট্রপতির নিরাপত্তাব্যবস্থা এতটাই দুর্বল ছিল যে সার্কিট হাউসে পর্যাপ্ত অস্ত্র ও নিরাপত্তা সদস্য থাকা সত্ত্বেও হামলাকারীরা প্রায় বিনা বাধায় তাদের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে সক্ষম হয়। হামলাকারীদের বিরুদ্ধে কার্যত কোনো কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে ওঠেনি। কমিশন এ পরিস্থিতিকে জুলিয়াস সিজারের বিখ্যাত উক্তি ভিনি, ভিডি, ভিচি দিয়ে তুলনা করে, যার অর্থ এলাম, দেখলাম, জয় করলাম।



banner close
banner close