রাজধানীর যাত্রাবাড়ী থানা এলাকায় এক ব্যবসায়ী দম্পতির বাসায় জোরপূর্বক প্রবেশ করে নির্যাতন, ইলেকট্রিক শক দেওয়া, লুটপাট, জোরপূর্বক ফাঁকা চেকে স্বাক্ষর নেওয়া এবং সংঘবদ্ধ ধর্ষণের অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় জড়িত ব্যক্তি ও তাদের আশ্রয়দাতাদের দ্রুত গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী নারী।
মঙ্গলবার (২৮ জুলাই) দুপুরে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির (ডিআরইউ) সাগর-রুনি মিলনায়তনে নারী নির্যাতন, সংঘবদ্ধ ধর্ষণ, হত্যা চেষ্টার প্রতিবাদ এবং আসামিদের দ্রুত গ্রেপ্তারের দাবিতে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব অভিযোগ করেন ৩৭ বছর বয়সী ওই নারী। প্রতিবেদনে উল্লেখিত তারিখের বার ক্যালেন্ডার অনুযায়ী যাচাই করা হয়েছে।
চার লাখ টাকা নিয়ে বিরোধের অভিযোগ
লিখিত বক্তব্যে ভুক্তভোগী জানান, তিনি যাত্রাবাড়ীর মাতুয়াইল উত্তরপাড়া এলাকার বাসিন্দা এবং একজন ব্যবসায়ী।
তার দাবি, প্রায় চার বছর আগে জাহিদুল ইসলাম অনিক নামে এক ব্যক্তি নির্দিষ্ট শর্তে জামানত হিসেবে নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্প ও ব্যাংক চেক দিয়ে তার কাছ থেকে চার লাখ টাকা নেন। পরে পাওনা টাকা ফেরত চাইলে অনিক বিভিন্ন ধরনের তালবাহানা শুরু করেন। খোঁজ নিয়ে তিনি জানতে পারেন, অনিক নিজেকে বিএনপির স্থানীয় দুই নেতার লোক হিসেবে পরিচয় দেন। পাওনা টাকার বিষয়ে ওই দুই নেতার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা উল্টো তাকে হুমকি দেন এবং বিষয়টি নিয়ে চুপ থাকতে বলেন বলে অভিযোগ করেন তিনি।
বাসায় ঢুকে নির্যাতন ও লুটপাটের অভিযোগ
ভুক্তভোগীর অভিযোগ, গত ৪ মে রাত আনুমানিক ১১টার দিকে রাকিব, জহিরুল ইসলাম জনি, জাহিদুল ইসলাম অনিক, ফরহাদ মিয়া, নজরুল শরীফ এবং আরও কয়েকজন অপরিচিত ব্যক্তি ওই দুই বিএনপি নেতার নির্দেশে তাদের বাসায় জোরপূর্বক প্রবেশ করেন। ঘরে ঢুকেই তারা তাকে ও তার স্বামীকে এলোপাতাড়ি মারধর করে আহত করেন।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, একপর্যায়ে আসামিরা তার শরীরে ইলেকট্রিক শক দিয়ে গুরুতর আহত করে এবং তার স্বামীকে পাশের একটি কক্ষে আটকে রাখে। পরে রাকিব হোসেনের নির্দেশে ঘরে ব্যাপক ভাঙচুর চালানো হয়। হামলাকারীরা বাসা থেকে নগদ প্রায় ৭ থেকে ৮ লাখ টাকা, প্রায় সাড়ে ৭ লাখ টাকা মূল্যের স্বর্ণালঙ্কার, ২০ হাজার সৌদি রিয়ালসহ মূল্যবান জিনিসপত্র নিয়ে যায়। এছাড়া আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংকের চারটি ফাঁকা চেকে জোরপূর্বক স্বাক্ষর করিয়ে নেয় এবং দুটি পাসপোর্টসহ গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র নিয়ে যায় বলে অভিযোগ করেন তিনি।
সংঘবদ্ধ ধর্ষণের অভিযোগ
সংবাদ সম্মেলনে ভুক্তভোগী অভিযোগ করেন, তার স্বামীকে পাশের কক্ষে আটকে রেখে তাকে ইলেকট্রিক শক দেওয়ার যন্ত্র দিয়ে শরীরের বিভিন্ন স্থানে শক দেওয়া হয় এবং অমানবিক নির্যাতন চালানো হয়। পরে রাকিব, জনিসহ ৪ থেকে ৫ জন তাকে জোরপূর্বক সংঘবদ্ধ ধর্ষণ করেন। নির্যাতনের একপর্যায়ে তিনি অজ্ঞান হয়ে পড়েন। এ সময় ইলেকট্রিক শকের ভয় দেখিয়ে মোবাইল ফোনে ভিডিও ধারণ করা হয় এবং তার কাছ থেকে জোরপূর্বক মিথ্যা জবানবন্দি নেওয়া হয় বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
ভুক্তভোগী জানান, পরে তাকে মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে চিকিৎসকেরা তার শরীর ও গোপনাঙ্গে নির্যাতনের চিহ্ন এবং জখম দেখতে পান বলে তিনি দাবি করেন। ঘটনার পরদিন থেকেই মামলা না করার জন্য এবং এলাকা ছেড়ে যাওয়ার হুমকি দেওয়া হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
তদন্তে গাফিলতির অভিযোগ
ভুক্তভোগীর অভিযোগ, এ ঘটনায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০ (সংশোধনী ২০০৩) এবং দণ্ডবিধির সংশ্লিষ্ট ধারায় যাত্রাবাড়ী থানায় মামলা দায়ের করা হলেও পুলিশ ও তদন্তকারী কর্মকর্তা আসামিদের গ্রেপ্তারে উদাসীনতা দেখাচ্ছেন। তিনি আরও অভিযোগ করেন, তদন্তকারী কর্মকর্তা আসামিদের রিমান্ডে এনে সঠিকভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করেননি এবং আসামিদের পক্ষ অবলম্বন করে তার সঙ্গে আপত্তিকর আচরণ করেছেন।
দ্রুত গ্রেপ্তার ও বিচারের দাবি
বর্তমানে চরম নিরাপত্তাহীনতায় রয়েছেন উল্লেখ করে ভুক্তভোগী বলেন, এক বিএনপি নেতার লোকদের কারণে প্রায় তিন মাস ধরে তিনি নিজের বাসায় যেতে পারছেন না। তাকে মুখে অ্যাসিড নিক্ষেপেরও হুমকি দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। এ ঘটনার সুষ্ঠু বিচার, আসামিদের দ্রুত গ্রেপ্তার এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে তিনি আরও জানান, ঘটনার সুষ্ঠু বিচার চেয়ে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি), স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা, বিএনপির সিনিয়র নেতা এবং নারী ও শিশু অধিকার ফোরামের কাছে অনুলিপি পাঠানো হয়েছে।
আরও পড়ুন:








