সোমবার

২৭ জুলাই, ২০২৬ ১২ শ্রাবণ, ১৪৩৩

কাজ শুরুর আগেই ঠিকাদারকে ২১৭ কোটি

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ২৭ জুলাই, ২০২৬ ০৯:৪০

শেয়ার

কাজ শুরুর আগেই ঠিকাদারকে ২১৭ কোটি
ছবি এআই মাধ্যমে তৈরি

কাজ শুরুর আগেই যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান এল থ্রি হ্যারিসকে ২১৭ কোটি ২৮ লাখ ৭৬ হাজার ২৯৭ টাকা অগ্রিম পরিশোধ করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। ১ হাজার ১১৭ কোটি ২৫ লাখ টাকার বেশি ব্যয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর জন্য রেডিও ডিভাইস উৎপাদন কারখানা স্থাপনের এ প্রকল্পে ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে অর্থটি বিদেশের অ্যাকাউন্টে পাঠানো হয়েছে। প্রকল্প প্রস্তাব ও সংশ্লিষ্ট নথি বিশ্লেষণ করে বিশেষজ্ঞরা চুক্তির একাধিক শর্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন এবং অর্থ লোপাট ও এলসির আড়ালে অর্থ পাচারের শঙ্কার কথা উল্লেখ করেছেন।

প্রযুক্তি হস্তান্তর নিয়েই বড় প্রশ্ন

জানা গেছে, বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে এগ্রিমেন্ট অন রিসেপ্রোকাল ট্রেড শীর্ষক চুক্তির আওতায় নিরাপত্তা বাহিনীর জন্য বিভিন্ন ধরনের রেডিও ডিভাইস উৎপাদনের কারখানা স্থাপন করা হবে। প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে ১ হাজার ১১৭ কোটি ২৫ লাখ ৭৭ হাজার ২৬৫ টাকা। কাজটি পেয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের এল থ্রি হ্যারিসের দেশীয় প্রতিনিধি অঙ্গীকার ইন্টারন্যাশনাল প্রাইভেট লিমিটেড।

বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রযুক্তি স্থানান্তর চুক্তির আওতায় সাধারণত প্রযুক্তি পণ্যের নকশা, সোর্স কোড, কাঠামোগত নকশা ও বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদ হস্তান্তর করা হয়। কিন্তু এ প্রকল্পে সেসবের কোনো নিশ্চয়তা নেই। তাদের ভাষ্য, এল থ্রি হ্যারিস যত দেশে এ ধরনের কারখানা স্থাপন করেছে, কোথাও সম্পূর্ণ প্রযুক্তি স্থানান্তর করেনি। ১২টি মূল অনুষঙ্গের মধ্যে সাতটি উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এবং বাকি অংশ মাঝারি ঝুঁকির বলে বিশেষজ্ঞ দলের লিখিত মতামতে উল্লেখ করা হয়েছে।

অগ্রিম অর্থ পরিশোধ ও ব্যয় নিয়ে প্রশ্ন

নথি অনুযায়ী, কাজ শুরুর আগেই প্রথম কিস্তি হিসেবে ২১৭ কোটি ২৮ লাখ ৭৬ হাজার ২৯৭ টাকা পরিশোধ করা হয়েছে। সোমবার (২৩ জুন) বাংলাদেশ ব্যাংকের এলসি শাখা থেকে অর্থটি এল থ্রি হ্যারিসের নিউইয়র্ক সিটি ব্যাংকের একটি অ্যাকাউন্টে পাঠানো হয়। বাকি অর্থ ২০৩২ সালের মধ্যে আরও ছয় কিস্তিতে পরিশোধের কথা রয়েছে।

প্রকল্পে ৩ হাজার ৮২৪ বর্গফুট অবকাঠামোর মধ্যে প্রযুক্তি হস্তান্তরের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে মাত্র ৮১০ বর্গফুট। সেখানে আটটি বিশেষ টেবিল স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে, যার মোট মূল্য ধরা হয়েছে প্রায় ৪৮ কোটি টাকা। অর্থাৎ প্রতিটি টেবিলের দাম প্রায় ৬ কোটি টাকা। একটি নেটওয়ার্ক র‌্যাক সিস্টেমের দামও ধরা হয়েছে ৬ কোটি টাকা। প্রকল্পে জনবল মাত্র সাতজন হলেও বিদেশে প্রশিক্ষণের জন্য আটজনকে পাঠানোর পরিকল্পনা রয়েছে এবং এ খাতে ব্যয় ধরা হয়েছে সাড়ে ৩ কোটি টাকা।

এ ছাড়া প্রকল্প প্রস্তাবে উৎপাদিত প্রতিটি রেডিও ডিভাইসের সম্ভাব্য মূল্য, কারখানার ভবিষ্যৎ আয়-ব্যয়ের হিসাব, যন্ত্রাংশের বাজারদর যাচাইয়ের পদ্ধতি কিংবা রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়ের স্পষ্ট বিবরণ নেই।

দরপত্র ও অর্থায়ন নিয়ে বিতর্ক

জানা গেছে, বুধবার (১৯ ফেব্রুয়ারি) ছয় ক্যাটাগরির চার হাজার রেডিও ডিভাইস অ্যাসেম্বলিংয়ের জন্য দরপত্র আহ্বান করা হয়। মঙ্গলবার (৪ মার্চ) থেকে সোমবার (৩১ মার্চ) পর্যন্ত দরপত্র বিক্রি করা হয় এবং শেষ দিন সাড়ে ১১টায় দরপত্র খোলা হয়। আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রে সাধারণত ৪৮ দিনের সময়সীমা থাকলেও এ প্রক্রিয়া ২৮ দিনের মধ্যে সম্পন্ন করা হয়েছে। এর মধ্যে ঈদের ছুটিও ছিল।

বুধবার (২১ মে) প্রস্তুত করা একটি পর্যালোচনা নথিতে উল্লেখ করা হয়, ২০২৫-২৬ ও ২০২৬-২৭ অর্থবছরে প্রকল্পটির জন্য অনুমোদন দেওয়া হলেও প্রশাসনিক অনুমোদন বা আর্থিক সম্মতিপত্রে সংশ্লিষ্ট বাজেট খাতে ৮৪৩ কোটি ৭৩ লাখ টাকা অবশিষ্ট রয়েছে। পাশাপাশি একাধিক অর্থবছরে মূল্য পরিশোধের ক্ষেত্রে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের প্রয়োজন রয়েছে বলেও নথিতে উল্লেখ করা হয়।

টিআইবির মন্তব্য

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, সরকারি প্রকল্পে ঠিকাদারকে অগ্রিম অর্থ পরিশোধের কোনো নজির তার জানা নেই। চুক্তিতে এমন শর্ত থাকলেও তা প্রশ্নবিদ্ধ। সাধারণত কাজ সম্পন্ন না হলে ঠিকাদারের কাছ থেকে আর্নেস্ট মানি কেটে নেওয়ার বিধান থাকে, কিন্তু এখানে উল্টোটি হয়েছে। বিষয়টি অবশ্যই খতিয়ে দেখা প্রয়োজন, কারণ এটি জনগণের অর্থ এবং অনিয়মের সম্ভাবনা প্রকট বলে মনে হচ্ছে।

ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বক্তব্য

অঙ্গীকার ইন্টারন্যাশনালের চেয়ারম্যান সালাউদ্দিন মুরাদ বলেন, প্রকল্পের চুক্তি হয়েছে এবং কাজ এগোচ্ছে। প্রথম কিস্তির অর্থ পরিশোধ হয়েছে কি না, সে বিষয়ে তিনি নিশ্চিত নন, কারণ তিনি দেশের বাইরে ছিলেন। প্রকল্পে আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কার বিষয়ে তিনি বলেন, এ বক্তব্য সঠিক নয়। বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান এল থ্রি হ্যারিস থেকে সরঞ্জাম কেনা হচ্ছে। একটি টেবিলের দাম প্রায় ৬ কোটি টাকা এবং ডিভাইসের মূল্য প্রস্তাবে উল্লেখ না থাকার বিষয়ে তিনি বলেন, এ বিষয়ে এল থ্রি হ্যারিসের ব্যাখ্যা থাকতে পারে। তিনি পুরো প্রকল্প প্রস্তাব পড়ে দেখেননি, তবে সরঞ্জাম বুঝে নেওয়ার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্টদের শতভাগ যাচাই করে ন্যায্য মূল্য পরিশোধের আহ্বান জানিয়েছেন।

বিশেষজ্ঞদের পর্যবেক্ষণ

বিশেষজ্ঞ দলের লিখিত মতামতে বলা হয়েছে, কারখানার ওয়ারেন্টি মাত্র এক বছর হলেও প্রকল্পের মেয়াদ ছয় বছর। রক্ষণাবেক্ষণ, মেরামত ও কারিগরি সহায়তার সুস্পষ্ট পরিকল্পনা নেই। প্রকল্পে ১০ শতাংশ অর্থ সাশ্রয় ও ২০ শতাংশ বিনিয়োগ ফেরতের দাবি করা হলেও তার কোনো ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি। তাদের মতে, এল থ্রি হ্যারিস ছাড়াও ফ্রান্স, জার্মানি, ফিনল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়ার একাধিক প্রতিষ্ঠান তুলনামূলক কম ব্যয়ে একই ধরনের কাজ করতে সক্ষম।



banner close
banner close