জাতীয় ও স্থানীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে নির্বাচন কমিশন (ইসি) সচিবালয়ের অতিরিক্ত সচিব পদে বিএনপির সংসদ নির্বাচনকালীন সংসদীয় আসন পুনর্বিন্যাস কমিটির সদস্য মো. সামসুল আলমকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়াকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক অঙ্গনে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। বিরোধী দলগুলো এই নিয়োগে নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। তবে সরকার বলছে, এ ধরনের নিয়োগ দেওয়ার আইনগত এখতিয়ার তাদের রয়েছে।
স্থানীয় নির্বাচনের আগে নিয়োগ
নির্বাচন ব্যবস্থা ও সাংবিধানিক সংস্কারের মাধ্যমে জাতীয় ও স্থানীয় সব ধরনের নির্বাচন গণতান্ত্রিক উপায়ে আয়োজনের অঙ্গীকার করে ক্ষমতায় আসে বিএনপি সরকার। এরই মধ্যে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার প্রস্তুতি চলাকালে মো. সামসুল আলমকে নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের অতিরিক্ত সচিব হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।
চাকরিজীবনে তিনি নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের নির্বাচন পরিচালনা শাখার কর্মকর্তা ছিলেন। ২০১৭ সালে অবসরে যাওয়ার পর বিএনপির রাজনীতিতে সক্রিয় হন এবং সংসদ নির্বাচনকালীন দলটির সংসদীয় আসন পুনর্বিন্যাস কমিটির সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
সংশ্লিষ্টদের মতে, স্থানীয় সরকার নির্বাচনের আগে তাকে নির্বাচন কমিশনের মতো সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ দেওয়াকে নির্বাচন প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বিরোধী দলগুলোর প্রতিক্রিয়া
সংসদের প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, নির্বাচন কমিশনের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক দিক থেকে দ্বিতীয় প্রধান পদে কোনো রাজনৈতিক নেতাকে বসানো সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য ও দায়িত্বহীন কাজ। তিনি আরও বলেন, এই নিয়োগ আগামী নির্বাচনকে কারসাজি করার কোনো অপপ্রয়াস কি না, তা নিয়ে তারা উদ্বিগ্ন।
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী ফেসবুকে লিখেছেন, স্থানীয় ও আগামী জাতীয় নির্বাচনকে ঘিরে সরকারি দলের ইঞ্জিনিয়ারিং শুরু হয়ে গেছে। একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে রাজনীতিতে যুক্ত ব্যক্তিকে কীভাবে অতিরিক্ত সচিব করা যায়, তা নিয়েও তিনি প্রশ্ন তোলেন। তিনি বলেন, সামনে স্থানীয় নির্বাচনে যিনি সরাসরি পরিচালনায় থাকবেন, তিনি কীভাবে নিরপেক্ষ নির্বাচন উপহার দেবেন?
এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ সংক্ষিপ্ত প্রতিক্রিয়ায় বলেন, সরকার নিয়োগ দিলে তাদের আর কিছু করার থাকে না।
অতিরিক্ত সচিবের দায়িত্ব নিয়ে উদ্বেগ
আগামী অক্টোবর থেকে পর্যায়ক্রমে ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা, উপজেলা, জেলা পরিষদ ও সিটি করপোরেশন নির্বাচন হওয়ার কথা রয়েছে। নির্বাচন কমিশনে অতিরিক্ত সচিবের অবস্থান সচিবের পরেই। কমিশন সচিবালয়ের সব ফাইল তার মাধ্যমে সচিবের কাছে যায়। প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকেও তিনি উপস্থিত থাকেন। এ ছাড়া তিনি প্রবাসীদের ভোটার করার প্রকল্পের পরিচালক এবং নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তাদের বদলির ক্ষেত্রেও তার সরাসরি ভূমিকা থাকে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে নির্বাচন কমিশনের এক কর্মকর্তা বলেন, অতিরিক্ত সচিব সব বৈঠকে উপস্থিত থাকায় কমিশনের তথ্য সহজে দলের কাছে পৌঁছে যেতে পারে। বদলির ক্ষমতা ব্যবহার করেও দলের অনুকূলে কাজ করার সুযোগ তৈরি হতে পারে, যা ভোটকে প্রভাবিত করতে পারে।
আরও ১২ সংস্থায় বিএনপি নেতাদের নিয়োগ
শুধু নির্বাচন কমিশন নয়, আরও ১২টি সরকারি সংস্থার শীর্ষ পদে অতিরিক্ত সচিব পদমর্যাদায় বিএনপির ১২ জন নেতাকে নিয়োগ দিয়েছে সরকার। এসব পদে এতদিন প্রশাসনের কর্মকর্তারাই দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন।
বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) সামসুল আলমের পাশাপাশি বাংলাদেশ ওভারসিজ এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড সার্ভিসেস লিমিটেডের (বোয়েসেল) ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদে বিএনপির আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক মোহাম্মদ রাশেদুল হক, বনশিল্প উন্নয়ন করপোরেশনের চেয়ারম্যান পদে বন ও পরিবেশবিষয়ক সম্পাদক মোহাম্মদ মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল, বিআইডব্লিউটিসির চেয়ারম্যান পদে সহ-ধর্মবিষয়ক সম্পাদক এ টি এম আবদুল বারী ড্যানী, জাতীয় সমাজকল্যাণ পরিষদের নির্বাহী সচিব পদে যুবদলের সাবেক সহসভাপতি কামরুজ্জামান দুলাল, বিসিকের চেয়ারম্যান পদে ঢাকা বিভাগীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক বেনজীর আহমেদ, বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্যশিল্প করপোরেশনের চেয়ারম্যান পদে জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য শামসুজ্জামান সুরুজ, জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদে সহ-বন ও পরিবেশবিষয়ক সম্পাদক কাজী রওনাকুল ইসলাম টিপু, তাঁত বোর্ডের চেয়ারম্যান পদে যুবদলের সাবেক কেন্দ্রীয় সহসভাপতি জাকির হোসেন সিদ্দিকী, বাংলাদেশ ইস্পাত ও প্রকৌশল করপোরেশনের চেয়ারম্যান পদে রংপুর বিভাগীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক আবদুল খালেক এবং বাংলাদেশ জুট করপোরেশনের চেয়ারম্যান পদে দলের জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য মামুন হাসানকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
এর আগে বুধবার (১০ জুন) দেশের আটটি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান পদেও বিএনপির নেতাদের নিয়োগ দেওয়া হয়। তাদের মধ্যে রয়েছেন খুলনা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান এস এম শফিকুল আলম মনা, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান বেলায়াত হোসেন, রাজশাহী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান আবুল কালাম আজাদ, নারায়ণগঞ্জ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান মাশুকুল ইসলাম রাজীব, সিলেট উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রেজাউল হাসান কয়েস লোদী, রংপুর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান সামসুজ্জামান সামু, ময়মনসিংহ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান মোতাহার হোসেন এবং কুমিল্লা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান উদবাতুল বারী।
প্রশাসনে দলীয়করণ নিয়ে মতভেদ
বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহারে মেধাভিত্তিক, দক্ষ ও স্বচ্ছ জনপ্রশাসন গড়ে তোলার অঙ্গীকার করা হয়েছিল। তবে প্রশাসনের অভিজ্ঞ ব্যক্তিরা বলছেন, এভাবে দলীয়করণ জনপ্রশাসনের মান কমাতে পারে এবং বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে পারে।
বর্তমানে অতিরিক্ত সচিব পদমর্যাদার ৭৪ জন কর্মকর্তা কোনো দায়িত্ব ছাড়াই রয়েছেন। এর মধ্যে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত অতিরিক্ত সচিব রয়েছেন ৬১ জন এবং জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওএসডি) হিসেবে রয়েছেন ১৩ জন।
প্রশাসনে ব্যাপক দলীয়করণের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী মো. আবদুল বারী বলেন, সরকার এই নিয়োগ নিয়ে কাউকেই কোনো জবাব দেবে না। সরকারের এ ধরনের নিয়োগ দেওয়ার আইনগত এখতিয়ার রয়েছে।
সাবেক সচিব এ কে এম আবদুল আওয়াল মজুমদার বলেন, প্রশাসনে আমলাদের নিজেদের মধ্যকার দলাদলি ও বিরোধে সরকার বিরক্ত হয়ে নিজস্ব লোক দিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনার পথ বেছে নিয়েছে। তবে নিয়োগপ্রাপ্তরা যদি নিয়ম-কানুন না মেনে প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করেন, তাহলে রাষ্ট্রের ক্ষতি হবে বলেও তিনি সতর্ক করেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক সাদিক হাসান বলেন, দীর্ঘ ২০ বছর ক্ষমতার বাইরে থাকায় প্রশাসনে কর্মরত কর্মকর্তাদের নিয়ে সরকারের মধ্যে একটি শঙ্কা কাজ করছে। সেই শঙ্কা থেকেই প্রশাসন নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে দলীয় ব্যক্তিদের নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে বলে তিনি মনে করেন।
আরও পড়ুন:








