২৪-এর জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শিশু শহীদ জাবির ইব্রাহীম এবং রিয়া গোপের হত্যায় পরিবার মর্মাহত অবস্থায় বিচার কার্যকরের অপেক্ষায় রয়েছে। ২৪-এর জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে রক্তের তুলিতে আঁকা ছাত্র-জনতার অদম্য সাহস আর আত্মত্যাগে রচিত এক মহাকাব্যিক বিপ্লবগাথা ও জীবন্ত ইতিহাস হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, যেখানে অগণিত তরুণ প্রাণ জীবন উৎসর্গ করেছে এবং নিষ্পাপ শিশুদের রক্তও মিশে এক নির্মম অধ্যায়ের জন্ম দিয়েছে।
উত্তরায় বিজয় মিছিলে গুলিতে শিশু জাবির নিহত
প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে উত্তরায় যে শিশুরা শাহাদাত বরণ করেছে, তাদের মধ্যে সর্বকনিষ্ঠ হিসেবে আলোচিত শিশু শহীদ জাবির ইব্রাহীম। ছয় বছরের জাবির শেখ হাসিনা পালিয়ে যাওয়ার খবর শুনে ঘরে থাকতে পারেনি এবং বাবার সঙ্গে আনন্দ মিছিলে বের হয়।
ঘটনাটি ঘটে সোমবার (৫ আগস্ট) ২০২৪ সালে, বিকেল ৪টার দিকে। উত্তরা এপিবিএন সদর দপ্তরের উত্তর গেট থেকে ছোঁড়া গুলিতে শিশু জাবির ইব্রাহীমের প্রাণপ্রদীপ নিভে যায় বলে তথ্যে উল্লেখ করা হয়েছে। বলা হয়েছে, যে ফুলটি ফোটার আগেই ঝরে যায়, শেখ হাসিনার পালিত পুলিশ বাহিনীর গুলিতে।
জাবিরের পরিবার সূত্রে জানা যায়, আন্দোলন দেখা কিংবা যাওয়ার প্রতি জাবির ইব্রাহীমের তীব্র ইচ্ছা, আকাঙ্ক্ষা ও কামনা ছিল চোখে পড়ার মতো। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রতি তার এই উচ্ছ্বাস দেখে তার মা-ই তাকে আন্দোলনে নিয়ে যেতে বাধ্য হন। জাবিরের বড় ভাই তার জন্য একটি প্ল্যাকার্ড লিখে দেয়, যাতে লেখা ছিল ডব্লিউই ওয়ান্ট জাস্টিস।
শহীদ জাবির ইব্রাহীমের মা রোকেয়া বেগম, যিনি সংরক্ষিত নারী আসনের এমপি। সন্তানের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি।
পরিবারের স্মৃতিচারণে জাবির
জাবিরের বাবা জানান, শহীদ জাবির ছিল অত্যন্ত মেধাবী এক শিশু। তারা তাকে কেজিতে ভর্তি করাতে চাইলেও, শিক্ষকেরা তার মেধা বিবেচনায় তাকে নার্সারিতে ভর্তি করেন। তিনি আরও জানান, কোনো কিছুর প্রতি তার অতিরিক্ত চাহিদা ছিল না, হাতের কাছে যা পেত, তাই নিয়েই মেতে থাকত নিজের জগতে।
জাবিরের বাবা স্মৃতিচারণ করে বলেন, দোকানে গেলে যদি কিছু কিনতে ইচ্ছে হতো, সে সরাসরি কিছু চাইত না, বরং জিজ্ঞেস করত, বাবা, তোমার কাছে কি টাকা আছে।
মৃত্যুর ঠিক এক মাস আগে জাবিরের চাচা তাকে একটি সাইকেল কিনে দেন। সেই সাইকেল সে ঘরেই চালাত, আর পুরো ঘরকে মাতিয়ে রাখত। ছোট্ট জাবির তখনও নিজে ঠিকমতো সাইকেল চালাতে পারত না, তাকে সাইকেল চালাতে সাহায্য করেছেন তার বড় ভাই আব্দুল্লাহ।
তথ্যে বলা হয়েছে, এখন জাবির নেই, পুরো বাড়িজুড়ে শুধুই তার স্মৃতির ছড়াছড়ি। শহীদ জাবির ইব্রাহীমের হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ফ্যাসিস্ট প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা-সহ সকল আসামির ফাঁসি দাবি করেছে জাবিরের পরিবার। শহীদ জাবিরের সম্মানে তার মা রোকেয়া বেগমকে, জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত নারী আসনের এমপি পদ দিয়েছে জামায়াতে ইসলামী। নিজের সন্তানের কথা বলতে গিয়ে, ত্রয়োদশ সংসদের দ্বিতীয় অধিবেশনে আবেগঘন বক্তব্য দেন রোকেয়া বেগম।
নারায়ণগঞ্জে ছাদে খেলতে গিয়ে গুলিবিদ্ধ রিয়া
অন্যদিকে, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নারায়ণগঞ্জের আরেক শিশু রিয়া গোপের হত্যাকাণ্ডও দেশবাসীকে গভীরভাবে নাড়িয়ে দিয়েছিল বলে তথ্যে উল্লেখ করা হয়েছে। ২০২৪ সালের শুক্রবার (১৯ জুলাই), কোটা সংস্কার আন্দোলন চলাকালে নারায়ণগঞ্জ শহরের মোল্লাপাড়া থেকে ২ নম্বর রেলগেট এলাকায় ব্যাপক সংঘর্ষ ও গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটে।
ওই সময় নয়ামাটিতে নিজ বাসার পাঁচতলার ছাদে খেলছিল শিশু রিয়া। বাইরে গোলাগুলির শব্দ শুনে তাকে নিচে নামিয়ে আনা হলেও, কৌতূহলবশত আবারও ছাদে ছুটে যায় সে। আর তখনই, তার বাবার কোলে থাকা অবস্থায় বুলেটের আঘাতে ঝাঁঝরা হয়ে যায় শিশুটির মাথা। সেদিনের সেই বিভীষিকাময় মুহূর্তের বর্ণনা দেন রিয়ার চাচি শ্রেয়া ঘোষ।
সন্তান হারানোর শোকের সাগরে এখনও হাবুডুবু খাচ্ছেন ছোট্ট রিয়া গোপের মা বিউটি ঘোষ। অনেক কষ্টে পাওয়া একমাত্র সন্তানের মা ডাক আর কোনোদিন শুনতে পারবেন না, এই শূন্যতা কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছেন না তিনি। মেয়ের অসংখ্য স্মৃতি আঁকড়ে ধরেই কাটছে তার প্রতিটি দিন। মেয়ের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি।
বিচারের অপেক্ষায় দুই পরিবার
প্রদত্ত তথ্যে বলা হয়েছে, ২৪-এর জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দুই বছর পেরিয়ে গেছে। নতুন সরকার গঠিত হয়েছে, প্রশাসনিক অবস্থানও হয়েছে দৃঢ়। কিন্তু, আক্ষেপ রয়েছে এখনও নেই জাবির কিংবা রিয়ার মামলার কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি। সময়ের আবর্তে হারিয়ে যাওয়া নয়, বরং অবুঝ এই দুই শিশু হত্যার বিচার দ্রুত দেখার অপেক্ষায় দুই পরিবার।
আরও পড়ুন:








